ঢাকা, বাংলাদেশ ।
  সোমবার, ০২ নভেম্বর ২০২৬,  ১৮ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম :
তরুণদের জন্য ২০ লাখ টাকার সহজ ঋণ আবেদন শুরু মিরপুরে শ্রমিক-পুলিশ সংঘর্ষ: ৫ মামলায় গ্রেফতার ৩০ পুলিশের গাড়িতে আগুন ও হামলার ঘটনায় মিরপুরে ২৬ জন কারাগারে তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাসের দাম বৃদ্ধি করল বিইআরসি ডেঙ্গুতে ২৪ ঘণ্টায় আরও ৬ জনের মৃত্যু, হাসপাতালে ভর্তি ১৯৭০ ন্যূনতম মজুরি ও হামলার প্রতিবাদের দাবিতে উত্তাল নারায়ণগঞ্জ শিল্পাঞ্চল আজ থেকে ১৩ সিটি করপোরেশনে ই-রিকশার নিবন্ধন শুরু থ্রি-হুইলার নিষিদ্ধের দাবিতে বরিশালে ৬ রুটে বাস ধর্মঘট প্রকৃত শ্রমিকরা নয়, ফ্যাসিস্ট সমর্থকরা বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করছে: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী পাকিস্তানি পার্লামেন্টে প্রথম 'রাষ্ট্রভাষা বাংলা' দাবিকারী ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত

১৪০তম জন্মবার্ষিকীতে গভীর শ্রদ্ধা

পাকিস্তানি পার্লামেন্টে প্রথম 'রাষ্ট্রভাষা বাংলা' দাবিকারী ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত


  • আপলোড সময় : সোমবার ০২ নভেম্বর, ২০২৬ সময় : ৬:০৪ পিএম

জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তান, সৎ, সাহসী, নির্ভীক, নির্মোহ, নিঃস্বার্থ ও নিবেদিতপ্রাণ দেশপ্রেমিক শহীদ ধীরেন্দ্রনাথ দত্তের ১৪০তম জন্মবার্ষিকীতে তাঁর স্মৃতির প্রতি আমাদের সশ্রদ্ধ ও গভীর শ্রদ্ধাঞ্জলি জ্ঞাপন করছি। বাঙালি জাতির স্বাধিকার আন্দোলন, মাতৃভাষার অধিকার রক্ষা এবং অসাম্প্রদায়িক চেতনার রাজনীতিতে তাঁর ঐতিহাসিক ভূমিকা ও অবদান জাতি চিরদিন পরম শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করবে।


জন্ম, পারিবারিক পটভূমি ও শিক্ষাজীবন

শহীদ ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত ১৮৮৬ সালের ২ নভেম্বর তৎকালীন ব্রিটিশ ভারতের বাংলা প্রদেশের ত্রিপুরা জেলার (বর্তমান বাংলাদেশের ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার) কসবা উপজেলার রামরাইল গ্রামে এক সম্ভ্রান্ত কায়স্থ পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর বাবা জগবন্ধু দত্ত ছিলেন কসবা ও নবীনগর মুন্সেফ আদালতের সেরেস্তাদার (প্রধান মুন্সি)। তাঁর মাতা ছিলেন কুমিল্লার চাপিতলা গ্রামের সুরবালা রক্ষিত পরিবারের কন্যা।


ধীরেন্দ্রনাথ দত্তের শিক্ষাজীবন ছিল অত্যন্ত বর্ণাঢ্য ও মেধাদীপ্ত। তিনি নবীনগর হাই স্কুল থেকে ১৯০৪ সালে প্রবেশিকা (ম্যাট্রিকুলেশন) পাস করেন। এরপর উচ্চশিক্ষার জন্য কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া কলেজে ভর্তি হন এবং সেখান থেকে ১৯০৬ সালে এফ.এ. পাস করেন। পরবর্তীতে কলকাতার সুরেন্দ্রনাথ কলেজ ও বিখ্যাত রিপন কলেজে (বর্তমানে সুরেন্দ্রনাথ আইন কলেজ) পড়াশোনা চালিয়ে যান। তিনি ১৯০৮ সালে কোলকাতা রিপন কলেজ থেকে বি.এ. এবং ১৯১০ সালে একই কলেজ থেকে বি.এল. (আইন) পরীক্ষায় কৃতিত্বের সাথে উত্তীর্ণ হন।


কলকাতার রিপন কলেজের ছাত্র থাকা অবস্থায় তিনি তৎকালীন কুমিল্লা মহকুমার মুরাদনগর থানার পূর্বধইর গ্রামের বিশিষ্ট আইনজীবী কৃষ্ণকমল দাসমুন্সীর কন্যা সুরবালা দাসকে বিয়ে করেন। কৃষ্ণকমল দাসমুন্সী পেশায় একজন খ্যাতনামা আইনজীবী ছিলেন। ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত ও সুরবালা দাসের সুখের দাম্পত্য জীবনে সাত মেয়ে ও দুই ছেলে জন্মগ্রহণ করে। দীর্ঘ ৪৩ বছরের সফল ও সুখের দাম্পত্য জীবনের অবসান ঘটে ১২ আগস্ট ১৯৪৯ সালে স্ত্রী সুরবালা দাসের প্রয়াণের মাধ্যমে।


রাজনৈতিক জীবন ও ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন

ধীরেন্দ্রনাথ দত্তের রাজনৈতিক ও সামাজিক জীবন ছিল আজীবন সংগ্রামের ইতিহাস। ছাত্রজীবন থেকেই তিনি ব্রিটিশবিরোধী বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সামাজিক কর্মকাণ্ডের সাথে যুক্ত হন।


বঙ্গভঙ্গ বিরোধী আন্দোলন: ১৯০৫ সালের ঐতিহাসিক বঙ্গভঙ্গ বিরোধী আন্দোলনে তিনি সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেন এবং দেশপ্রেমিক যুবকদের উজ্জীবিত করেন।


অসহযোগ আন্দোলন: ১৯১৯ সালে ময়মনসিংহ শহরে অনুষ্ঠিত বঙ্গীয় প্রাদেশিক কংগ্রেসের সম্মেলনে তিনি সক্রিয় অংশগ্রহণ করেন। পরবর্তীতে দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশের উদাত্ত আহ্বানে সাড়া দিয়ে তিনি তাঁর আইন পেশা তিন মাসের জন্য সম্পূর্ণ স্থগিত রাখেন এবং ব্রিটিশবিরোধী অসহযোগ আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়েন।


আইনসভায় জনকল্যাণমূলক ভূমিকা: ১৯৩৭ সালে তিনি বঙ্গীয় ব্যবস্থাপক সভার সদস্য নির্বাচিত হন। আইনসভায় তিনি সাধারণ মানুষের অধিকার আদায়ে সোচ্চার ছিলেন। বঙ্গীয় প্রজাস্বত্ব আইন সংশোধন, বঙ্গীয় কৃষিঋণ গ্রহীতা ও বঙ্গীয় মহাজনি আইন পাসের সাথে ধীরেন দত্ত অত্যন্ত ঘনিষ্ঠভাবে সংশ্লিষ্ট ছিলেন।


ভারত ছাড় আন্দোলন: ব্রিটিশ শাসনের ভিত কাঁপিয়ে দিতে ১৯৪২ সালে ঐতিহাসিক “ভারত ছাড়” আন্দোলনে নেতৃত্ব দেওয়ায় তাঁকে একাধিকবার ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক সরকার গ্রেপ্তার করে। তিনি বিভিন্ন কারাগারে বিনাশ্রম ও সশ্রম কারাদণ্ড ভোগ করেন। তাঁর আপসহীন মনোভাব ও সততা তাঁকে সাধারণ মানুষের অবিসংবাদিত নেতায় পরিণত করেছিল।


পাকিস্তানের রাজনীতি ও ভাষা আন্দোলনের সূচনা

১৯৪৬ সালের নির্বাচনে তিনি কংগ্রেস দলের টিকিটে পুনরায় বঙ্গীয় ব্যবস্থাপক সভার সদস্য নির্বাচিত হন। ব্রিটিশ ভারত বিভক্তির প্রাক্কালে পাকিস্তানের সংবিধান রচনার জন্য ঐ বছর ডিসেম্বরে পূর্ববঙ্গ থেকে তিনি পাকিস্তান গণপরিষদের সদস্য নির্বাচিত হন। ১৯৪৭ সালের আগস্ট মাসে দেশভাগের পর নতুন রাষ্ট্র পাকিস্তানে একজন আপসহীন ও অসাম্প্রদায়িক রাজনীতিক হিসেবে তিনি পাকিস্তানের রাজনীতির গতিপ্রকৃতি গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করেন এবং তৎকালীন রাষ্ট্রীয় অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রথম বাধার প্রাচীর গড়ে তোলেন।


তিনিই ছিলেন নতুন রাষ্ট্র পাকিস্তানে ভাষা আন্দোলনের প্রথম ও প্রধান ভাষা সৈনিক। সেই ঐতিহাসিক দিনটি ছিল ১৯৪৮ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি। বলা যেতে পারে, সেদিনই পাকিস্তানে বাংলা ভাষা আন্দোলনের আনুষ্ঠানিক ও আইনগত সূত্রপাত ঘটেছিল। করাচিতে পাকিস্তান গণপরিষদের অধিবেশনের শুরুতে আলোচনার সূত্রপাত করে তৎকালীন সংসদ সদস্য ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত পার্লামেন্টে দাঁড়িয়ে ঐতিহাসিক প্রস্তাব উত্থাপন করে বলেন:


"Mr. President, Sir, I move: “That in sub-rule (1) of rule 29, after the word ‘English’ in line 2, the words ‘or Bengalee’ be inserted.”"


এই বক্তব্যের মাধ্যমেই তিনি পাকিস্তান পার্লামেন্টে বাংলা ভাষার সাংবিধানিক স্বীকৃতি ও রাষ্ট্রীয় মর্যাদার দাবি প্রথম উত্থাপন করেন। তিনি যুক্তিসহকারে তুলে ধরেছিলেন যে, বাংলা একটি প্রাদেশিক ভাষা নয়; তৎকালীন পাকিস্তানের মোট ৬ কোটি ৯০ লক্ষ মানুষের মধ্যে ৪ কোটি ৪০ লক্ষ মানুষই বাংলা ভাষায় কথা বলত—অর্থাৎ সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগোষ্ঠী ছিল বাঙালি। অথচ পাকিস্তানের শাসকগোষ্ঠী সুপরিকল্পিতভাবে বাংলাকে অবহেলা করছিল।


ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত সেদিন সপ্রমাণ তুলে ধরেছিলেন যে—পোস্ট অফিসের মাধ্যমে টাকা পাঠাতে গেলে যে ফর্ম পূরণ করতে হয় সেটি মুদ্রিত উর্দু ভাষায়; খাম ও পোস্টকার্ডের ওপরে ছাপানো ভাষা উর্দু; এমনকি জমি বেচাকেনার জন্য ভেন্ডারের কাছ থেকে যে স্ট্যাম্প কিনতে হয়, সেটাও মুদ্রিত উর্দু ভাষায়। সেইদিন আবেগতাড়িত কণ্ঠে শহীদ ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত জনসংখ্যার অনুপাতে বাংলার সপক্ষে জোরালো যুক্তি উপস্থাপন করে বলেন:


"Sir, what should be the State Language of the State? The State Language of the State should be the Language which is used by the majority of the people of the State."


শহীদ ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত সেদিন দ্ব্যর্থহীন ভাষায় আরও বলেছিলেন:


"So, Sir, I know I am voicing the sentiments of the vast millions of our State and therefore Bengalee should not be treated as a Provincial Language. It should be treated as the language of the State."


ইতিহাস সাক্ষী, সময় এবং সঠিক সত্যই শেষ পর্যন্ত জয়ী হয়। তাঁর বলা শেষ বাক্য—"It should be treated as the language of the state"—ই সর্বপ্রথম ঘোষণা দিয়েছিল যে, 'রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই'। এই অকুতোভয় দাবিই ঠিক চার বছর পর ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারিতে ছাত্র-জনতার রক্তে রাঙা হয়ে বাঙালি জাতির প্রাণের দাবিতে পরিণত হয়।


এরই দীর্ঘ ধারাবাহিকতায় ১৯৫৬ সালের তথাকথিত ইসলামিক রিপাবলিক অব পাকিস্তানের সংবিধানে বাংলাকে অন্যতম রাষ্ট্রভাষা হিসেবে স্বীকৃতি দিতে বাধ্য হয় শাসকগোষ্ঠী। বাঙালি জাতি বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা হিসেবে পেলেও, পাকিস্তানের পার্লামেন্টে প্রথম এই অমর দাবি তোলার জন্য শহীদ ধীরেন্দ্রনাথ দত্তকে পরবর্তীকালে চরম মূল্য পরিশোধ করতে হয়েছিল।


আইয়ুব খানের সামরিক শাসন ও নির্যাতনের দিনগুলি

পাকিস্তানে সামরিক শাসন জারির পর ১৯৬০ সালে ধীরেন্দ্রনাথ দত্তের রাজনৈতিক কণ্ঠরোধ করতে তাঁর উপর ‘এবডো’ (EBDO - Elective Bodies Disqualification Order) প্রয়োগ করা হয়। এর মাধ্যমে তাঁর রাজনৈতিক তৎপরতা নিষিদ্ধ করার অপচেষ্টা চালানো হয়। পরবর্তীতে ১৯৬৫ সালের ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধের সময় তাঁকে গৃহবন্দি করে রাখা হয়। এতদসত্ত্বেও বাঙালি জাতীয়তাবাদ ও ধর্মনিরপেক্ষ রাজনীতিতে অবিচল বিশ্বাসী ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত পূর্ব বাংলার গুরুত্বপূর্ণ বাঙালি নেতৃবৃন্দের সঙ্গে গোপনে ও প্রকাশ্যে গভীর যোগাযোগ বজায় রাখতেন এবং জাতিকে মুক্তির পথ দেখাতেন।


একাত্তরের কালরাত্রি ও নির্মম martyrdom (শাহাদাত)

১৯৭১ সালের উত্তাল মার্চ মাসে যখন পুরো বাঙালি জাতি স্বাধীনতার জন্য প্রস্তুত হচ্ছিল, তখন পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর প্রধান লক্ষ্যবস্তু হয়েছিলেন এই বয়োজ্যেষ্ঠ বুদ্ধিজীবী ও রাজনীতিবিদ।


একাত্তরের ২৯ মার্চ রাত দেড়টায় কুমিল্লা শহরের ধর্মসাগর পাড়ের (বর্তমান শহীদ ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত সড়ক) নিজ বাসভবন থেকে ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত এবং তাঁর ছোট ছেলে দিলীপ কুমার দত্তকে ধরে নিয়ে যায় পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর কুখ্যাত ক্যাপ্টেন বোখারি। ওই সময় দিলীপ দত্তকে পালানোর চেষ্টা করার অজুহাতে বা ত্রাস সৃষ্টি করতে পায়ে গুলি করা হয়েছিল। একটি জিপ, পাঁচটি ট্রাক ও একটি অ্যাম্বুল্যান্সের একটি বিশাল লশকরী বহর এসে তাঁদের ধরে কুমিল্লা সেনানিবাসে নিয়ে যায়। কুমিল্লার কুখ্যাত যুদ্ধাপরাধী ও দালাল অ্যাডভোকেট আবদুল করিমের সরাসরি তত্ত্বাবধানে এই নৃশংস আটক অভিযান পরিচালিত হয়।


তারপর পাকিস্তানি সেনানিবাসে হত্যার আগে বৃদ্ধ শহীদ ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত এবং তাঁর পুত্র দিলীপ কুমার দত্তের ওপর অমানবিক ও পৈশাচিক নির্যাতন চালানো হয়। তাঁদের শরীর ক্ষতবিক্ষত করে ক্ষতস্থানে আয়োডিন লাগিয়ে এবং বৈদ্যুতিক শক (কারেন্টের শক) দিয়ে টানা কয়েকদিন ধরে অবর্ণনীয় শারীরিক নির্যাতন করা হয়। পরিশেষে এই মহান পিতাপুত্রকে নিষ্ঠুর ও নির্মমভাবে হত্যা করা হয়।


সবচেয়ে মর্মান্তিক বিষয় হলো—এই মহান পিতাপুত্রের পবিত্র শবদেহের সন্ধান আজও আর মেলেনি!


শহীদ ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত শুধু একজন ব্যক্তি নন, তিনি ছিলেন বাঙালি জাতির স্বাধিকার চেতনা ও ভাষার অধিকার অর্চনার আলোকবর্তিকা। এই মহৎপ্রাণ গুণী মানুষটির আত্মত্যাগ ও স্মরণে কোনো ধরনের হীনমন্যতা বা কৃপণতা করা উচিত নয়। তাঁর আদর্শ ও দেশপ্রেম চিরকাল আমাদের পথ দেখাবে।


এ সম্পর্কিত আরো খবর