রাজধানীর স্বনামধন্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় অধিভুক্ত উদয়ন উচ্চ মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) প্রযুক্তি ব্যবহার করে সহপাঠী ছাত্রীদের অশ্লীল ছবি ও ভিডিও তৈরি, নানা ধরনের কুরুচিপূর্ণ কুপ্রস্তাব প্রদান এবং গুরুতর যৌন হয়রানির মতো ন্যক্কারজনক ঘটনা ঘটেছে। এই ঘটনার সুষ্ঠু বিচার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবিতে বিদ্যালয় ক্যাম্পাসে ফুঁসে উঠেছে সাধারণ শিক্ষার্থীরা। মঙ্গলবার সকাল থেকে বিদ্যালয় প্রাঙ্গণে শিক্ষার্থীরা সম্মিলিতভাবে জড়ো হয়ে তীব্র বিক্ষোভ ও আন্দোলন শুরু করেন। অভিযুক্ত ওই শিক্ষার্থী বিদ্যালয়ের নবম শ্রেণীতে অধ্যয়নরত এবং তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞান অনুষদের ভারপ্রাপ্ত ডিন অধ্যাপক ড. মো. মোফাজ্জল হোসেনের সন্তান বলে নিশ্চিত করা হয়েছে।
সরেজমিনে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের অবস্থান পর্যবেক্ষণকালে দেখা যায়, ‘মেয়েদের নিরাপত্তা চাই, হয়রানিমুক্ত স্কুল চাই’—এমন সুনির্দিষ্ট দাবি ও নানা প্রতিবাদী স্লোগানসংবলিত প্ল্যাকার্ড হাতে তারা বিদ্যালয় মাঠের ভেতর অবস্থান নিয়েছেন। এ সময় তারা অভিযুক্ত শিক্ষার্থীর কঠোর শাস্তির দাবিতে বিভিন্ন স্লোগানে আকাশ-বাতাস মুখরিত করে তোলেন। তবে শিক্ষার্থীদের এই শান্তিপূর্ণ ও ন্যায়সঙ্গত আন্দোলন চলাকালে বিদ্যালয় পরিচালনা পর্ষদ বা দায়িত্বশীল কোনো কর্তৃপক্ষকে ঘটনাস্থলে উপস্থিত থাকতে দেখা যায়নি। আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের পক্ষ থেকে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ করে জানানো হয় যে, অভিযুক্ত শিক্ষার্থীর এহেন অশালীন আচরণ, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ভুল ব্যবহার করে অশ্লীল ছবি তৈরি এবং কুপ্রস্তাবের প্রতিবাদ করার কারণে উল্টো ১০ থেকে ১২ জন শিক্ষার্থীর শ্রেণিকক্ষে উপস্থিতি ও ক্লাস করার সুযোগ স্থগিত করে দিয়েছে উদয়ন স্কুল কর্তৃপক্ষ।
শিক্ষার্থীরা আরও অভিযোগ করেন যে, অভিযুক্ত ছাত্রের উচ্চপদস্থ পারিবারিক পরিচয়ের কারণে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সংশ্লিষ্ট শিক্ষক মহল, বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর অফিস ও স্কুল কর্তৃপক্ষের উচ্চপর্যায় থেকে আন্দোলনরত সাধারণ শিক্ষার্থীদের ওপর নানামুখী চাপ সৃষ্টি করা হচ্ছে। ঘটনার সত্যতা উন্মোচন এবং একটি সুষ্ঠু নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে দোষীর বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা গ্রহণের পথ না বেছে নিয়ে পুরো বিষয়টি সম্পূর্ণভাবে ধামাচাপা দেওয়ার হীন অপচেষ্টা চালানো হচ্ছে বলেও তারা তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেন। ঘটনার বিষয়ে প্রকৃত সত্য উদঘাটনের জন্য উদয়ন উচ্চ মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ মুহাম্মদ আরিফ রহমানের সাথে যোগাযোগ করার একাধিক চেষ্টা করা হলেও তার পক্ষ থেকে কোনো ধরনের বক্তব্য বা মন্তব্য পাওয়া যায়নি।
অন্যদিকে, সন্তানের বিরুদ্ধে আনীত এসব অভিযোগের বিষয়ে ভিন্ন বক্তব্য তুলে ধরে অভিযুক্ত শিক্ষার্থীর পিতা ও ঢাবি বিজ্ঞান অনুষদের ভারপ্রাপ্ত ডিন অধ্যাপক ড. মো. মোফাজ্জল হোসেন দাবি করেন, গত ৭ অক্টোবর তার ছেলেকে ক্লাসরুম থেকে কয়েকজন শিক্ষার্থী জোরপূর্বক বের করে নিয়ে রাজধানী পলাশী ও আজিমপুর এলাকায় বেধড়ক মারধর করে। এতে তার ছেলে মারাত্মকভাবে আহত হলে তাকে দ্রুত ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে প্রাথমিক চিকিৎসা প্রদান করা হয়। পরদিন এই ঘটনার সুনির্দিষ্ট বিচার চেয়ে তিনি স্কুলের অধ্যক্ষের নিকট লিখিত অভিযোগ দায়ের করেছিলেন। স্কুল কর্তৃপক্ষ সিসিটিভি ফুটেজ পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে দেখে কয়েকজন শিক্ষার্থীকে শনাক্ত করে তাদের আলাদা কক্ষে পরীক্ষা নেওয়ার বিশেষ ব্যবস্থা করেছে বলে তিনি অবহিত হয়েছেন।
অধ্যাপক মোফাজ্জল হোসেন আরও দাবি করেন যে, পরবর্তীতে তার ছেলের বিরুদ্ধে বিভিন্ন মানহানিকর অভিযোগসংবলিত ফটোকার্ড সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বিভিন্ন পেজে ছড়িয়ে দেওয়া হয়। এই ঘটনায় তিনি গত ৩০ অক্টোবর শাহবাগ থানায় একটি সাধারণ ডায়েরিও (জিডি) এন্ট্রি করেছেন। তার ভাষ্যমতে, অভিযোগকারী কয়েকজন শিক্ষার্থীর সাথে পূর্বে তার ছেলের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক ছিল। পরবর্তীতে একটি ভুয়া সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের আইডিতে লেখালেখিকে কেন্দ্র করে তাকে ভয়ভীতি প্রদর্শন এবং চাঁদা বা টাকা আদরের ঘটনা ঘটে। তার ছেলের বক্তব্য অনুযায়ী, টাকা দেওয়া সম্পূর্ণ বন্ধ করে দেওয়ার পর ওই শিক্ষার্থীদের সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করায় পরিকল্পিতভাবে তাকে মারধর করা হয়েছে। এই ঘটনা তদন্তে বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছে এবং তার ছেলেও তদন্ত কমিটির ডাকে সাড়া দিয়েছে। তবে ছেলের সার্বিক নিরাপত্তার কথা চিন্তা করে বর্তমানে তারা তাকে নিয়মিত স্কুলে পাঠাচ্ছেন না।
সার্বিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ও প্রক্টরিয়াল টিমের ভূমিকা সম্পর্কে জানতে চাইলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর অধ্যাপক ড. মো. ইসরাফিল প্রাং স্পষ্ট করে জানান যে, এই ঘটনার সাথে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টরিয়াল বডি সরাসরি অ্যাসাইনড বা যুক্ত নয়। এটি মূলত স্কুল কর্তৃপক্ষের নিজস্ব এখতিয়ারভুক্ত বিষয় এবং স্কুল কর্তৃপক্ষই এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করবে। তবে ক্যাম্পাসে বা এর আশেপাশে যাতে কোনো ধরনের অপ্রীতিকর উত্তেজনাকর পরিস্থিতি বা বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি না হয়, সে জন্য তাৎক্ষণিকভাবে প্রক্টরিয়াল টিমের সদস্যদের ঘটনাস্থলে পাঠানো হয়েছে। বর্তমানে সামগ্রিক পরিস্থিতি সম্পূর্ণ স্বাভাবিক ও নিয়ন্ত্রণে রয়েছে বলে তিনি জানান।