বৈশ্বিক ভূরাজনীতিতে হঠাৎ করেই প্রবল ঝড়ের মুখে পড়েছেন আধুনিক বিশ্বের দুই বিতর্কিত ও প্রভাবশালী শীর্ষ নেতা—মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। নিজ দেশের ক্ষমতার চাবিকাঠি ফসকে যাওয়ায় এবং একের পর এক রাজনৈতিক সংকটে জর্জরিত হওয়ায় বিশ্বমঞ্চে এখন তাঁদের ভবিষ্যৎ নিয়ে বড়ো ধরনের প্রশ্ন উঠেছে। আমেরিকার মধ্যবর্তী নির্বাচনে কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ হারানোর ধাক্কা এবং ইসরায়েলে সরকার গঠনে চরম অনিশ্চয়তার মধ্য দিয়ে কি তবে শুরু হলো এই দুই ক্ষমতাধরের পতনের পালা?
মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচনে ডেমোক্রেটিক পার্টির কাছে কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে একচ্ছত্র ক্ষমতার বড় ধাক্কা খেয়েছেন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। অন্যদিকে, ইসরায়েলের সাম্প্রতিক নির্বাচনে প্রয়োজনীয় ৬১ আসনের সমর্থন জোগাড় করতে ব্যর্থ হয়ে রাজনৈতিক ভাগ্য বিড়ম্বনার মুখে পড়েছেন তাঁর ঘনিষ্ঠ মিত্র বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। কয়েকদিনের ব্যবধানে ঘটে যাওয়া এই দুই দেশের রাজনৈতিক পটপরিবর্তন বিশ্বনেতৃত্বের সমীকরণে এক নতুন মোড় এনে দিয়েছে। যদিও তাঁদের রাজনৈতিক পতন একদম আসন্ন—এমন কথা এখনই নিশ্চিত করে বলা চলে না, তবে এটা স্পষ্ট যে ক্ষমতা ধরে রাখার চেয়ে এখন নিজেদের শর্ত টিকিয়ে রাখাই তাঁদের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, মধ্যবর্তী নির্বাচনে কংগ্রেসের নিম্নকক্ষ প্রতিনিধি পরিষদ ও উচ্চকক্ষ সিনেটে ডেমোক্র্যাটদের নিরঙ্কুশ জয় ট্রাম্পের নীতির বিরুদ্ধে সরাসরি জনগণের ক্ষোভেরই বহিঃপ্রকাশ। ভোটারদের মূল আক্রোশ ছিল ক্রমবর্ধমান জীবনযাত্রার ব্যয়, লাগামছাড়া মূল্যস্ফীতি, জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধি এবং ইরানের সঙ্গে চলমান যুদ্ধপরিস্থিতি নিয়ে। হোয়াইট হাউসের দ্বিতীয় মেয়াদে নিজেকে ‘শান্তির দূত’ হিসেবে তুলে ধরার প্রতিশ্রুতি দিলেও যুদ্ধের দামামা ও অর্থনৈতিক চাপে সেই ভাবমূর্তি আজ প্রশ্নের মুখে। ফলে এ নির্বাচন কেবল আসন দখলের লড়াই ছিল না, বরং তা পরিণত হয়েছিল ট্রাম্পের নেতৃত্বের ওপর সরাসরি এক গণভোটে। এএফপির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নির্বাচনের ঠিক আগে ট্রাম্পের জনসভায় নীতিগত আলোচনার অনুপস্থিতি এবং ওয়াশিংটনকে সুন্দর করার সাধারণ প্রতিশ্রুতির মধ্য দিয়ে অনেকটা অবসরের পূর্বপ্রস্তুতির বার্তা ফুটে উঠেছে।
অন্যদিকে, ইসরায়েলে বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর সংকট সম্পূর্ণ ভিন্ন আঙ্গিকের। ২৭ অক্টোবরের নির্বাচনে তাঁর দল লিকুদ পার্টি ও শরিকরা মিলে মাত্র ৫৩টি আসন পেয়েছে, যা সরকার গঠনের জন্য যথেষ্ঠ নয়। এর ফলে বিরোধী জোট এবং আরব দলগুলোর সমর্থনে সরকার গঠনের দৌড়ে এগিয়ে রয়েছে বিরোধীরা। ইসরায়েলি প্রেসিডেন্ট আইজ্যাক হারজগের সঙ্গে রাজনৈতিক দলগুলোর আলোচনার মধ্য দিয়ে নির্ধারিত হতে যাওয়া এই ফলাফল নেতানিয়াহুর দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে এক মারাত্মক আঘাত হেনেছে। ক্ষমতা হাতছাড়া হওয়ার উপক্রম হওয়ায় তিনি ক্ষুব্ধ কণ্ঠে একে ‘জয় চুরি হয়ে গেছে’ বলে মন্তব্য করেছেন।
এই রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের ফলে বৈশ্বিক রাজনীতি ও মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা ব্যবস্থায় সুদূরপ্রসারী প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। কংগ্রেসে ডেমোক্র্যাটরা সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়ায় ট্রাম্প প্রশাসনের শুল্কনীতি, বাজেট বরাদ্দ এবং সামরিক পদক্ষেপগুলো এখন কঠোর আইনি ও সংসদীয় নজরদারির মুখে পড়বে। যদিও দ্য নিউইয়র্ক টাইমসকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প ফল মেনে নেওয়ার কথা বলেছেন এবং ডেমোক্র্যাটদের সঙ্গে কাজ করার ইচ্ছা প্রকাশ করেছেন, তবুও তাঁর নির্বাহী ক্ষমতার পথ অনেকটাই সংকুচিত হয়ে পড়েছে। এমনকি রয়টার্সের তথ্য অনুযায়ী, ইসরায়েলকে দেওয়া বার্ষিক ৪০০ কোটি ডলারের মার্কিন সহায়তা ২০২৭ সাল থেকে বন্ধের যে সমঝোতা হয়েছে, তাতে দুই নেতার পারস্পরিক সম্পর্কের টানাপোড়েনও স্পষ্ট হয়েছে।
সব মিলিয়ে, যুদ্ধ, জ্বালানি সংকট ও মুদ্রাস্ফীতির যাঁতাকলে পিষ্ট হয়ে বিশ্বমঞ্চের এই দুই ক্ষমতাধর নেতার রাজনৈতিক অবস্থান আজ নড়বড়ে। নেতৃত্বের এই পালাবদল কি মধ্যপ্রাচ্যসহ বিশ্ব অর্থনীতিতে স্থায়ী শান্তির নতুন দুয়ার খুলবে, নাকি পুরোনো সংঘাতের এক ভিন্ন রূপ উপহার দেবে—এখন সেটাই দেখার বিষয়।