সোনালী ব্যাংকের সিলেট কোর্ট বিল্ডিং ও টিলাগড় শাখায় সীমাহীন দুর্নীতি ও অনিয়মের চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে এসেছে। বৃদ্ধা খতিজা বেগমের অজান্তেই তাঁর নামে ঋণ তোলার মতো গুরুতর ঘটনা ঘটেছে, অথচ তিনি এই বিষয়ে সম্পূর্ণ অন্ধকারেই রয়েছেন। ব্যাংকের নথিপত্র ঘেঁটে দেখা গেছে, ভুয়া ঠিকানা, তথ্যপ্রমাণহীন ও জাল কাগজপত্রের আশ্রয় নিয়ে কোটি কোটি টাকার ঋণ জালিয়াতি করা হয়েছে। এ ঘটনায় অভিযুক্ত ব্যাংক কর্মকর্তা শাহরিয়ার আহমেদ সজীবের বিরুদ্ধে বর্তমানে বিভাগীয় তদন্ত চলছে।
স্টার নিউজের হাতে আসা সোনালী ব্যাংক সিলেট কোর্ট বিল্ডিং শাখার সাম্প্রতিক নিরীক্ষা প্রতিবেদনে এই ভয়াবহ জালিয়াতির চিত্র প্রকাশিত হয়েছে। প্রতিবেদনে দেখা যায়, সিলেটের গোলাপগঞ্জের হতদরিদ্র বৃদ্ধা খতিজা বেগমের নামে সোনালী ব্যাংকের কোর্ট বিল্ডিং ও টিলাগড় শাখা থেকে বিপুল অঙ্কের ঋণ উত্তোলন করা হলেও তিনি কিছুই জানেন না। এ বিষয়ে খতিজা বেগম হতাশা প্রকাশ করে জানান, “লোনের বিষয়ে আমি কিছুই জানি না।” একই কায়দায় নগরের তোপখানার আবদুল জাবেদের নামে ঋণ তোলা হলেও দুই সপ্তাহ ধরে খুঁজেও তাঁর কোনো হদিস মেলেনি। এছাড়া আংগুরা বেগম নামের আরেক গৃহিণীকে ঋণ দিতে নগরের ফাজিলচিশতের ১/১ খন্দকার হাউসের ভুয়া ঠিকানা ব্যবহার করা হয়েছে। সরজমিনে খন্দকার হাউসে গিয়ে জানা যায়, ওই নামের কোনো নারী সেখানে থাকেন না এবং কেয়ারটেকারও তাঁকে চেনেন না।
এই পুরো জালিয়াতি ও অনিয়মের মূল হোতা হিসেবে উঠে এসেছে ব্যাংকটির তৎকালীন ব্যবস্থাপক ও বর্তমানে টিলাগড় শাখায় কর্মরত সিনিয়র প্রিন্সিপাল অফিসার শাহরিয়ার আহমেদ সজীবের নাম। তাঁর সময়ে শুধু অনিয়মের মাধ্যমেই ১ কোটি ২৩ লাখ টাকার আবাসন ঋণ আত্মসাৎ করা হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। নিরীক্ষা প্রতিবেদনে আরও দেখা যায়, কোর্ট বিল্ডিং শাখায় তাঁর আমলে বিতরণ করা ৯টি ক্ষুদ্র ঋণের ১১ লাখ ৬১ হাজার টাকার পুরোটাই খেলাপি হয়ে পড়েছে। পাশাপাশি, এসএমই খাতের ৮৬টি ঋণের বিপরীতে প্রায় ৩ কোটি টাকা বিতরণ করা হলেও সেখানে কোনো সিআইবি (CIB) রিপোর্ট বা সঠিক জামিনদারের তথ্য পাওয়া যায়নি। খেলাপির পরিমাণ কৃত্রিমভাবে কম দেখাতে ১ বছর মেয়াদি ঋণের মেয়াদ সফটওয়্যারে জালিয়াতি করে ২ বছর পর্যন্ত বাড়িয়ে দেখানো হয়েছে। এমনকি ‘উন্মেষ’ স্কিমে সঞ্চয়ী হিসাব থাকা সত্ত্বেও নিয়মের তোয়াক্কা না করে ৬৯টিরও বেশি ঋণের অর্থ নগদ টাকায় বিতরণ করা হয়েছে।
অভিযুক্ত কর্মকর্তা শাহরিয়ার আহমেদ সজীবের সঙ্গে সংবাদকর্মীগণ মুখোমুখি হলে তিনি তদন্ত চলমান থাকার অজুহাত দেখিয়ে আনুষ্ঠানিক বক্তব্য দিতে অস্বীকৃতি জানান। উল্টো তিনি তথ্যদাতার পরিচয় জানতে চেয়ে প্রতিবেদককে হুমকি দিয়ে বলেন, “ব্যাংক রিলেটেড কোনো বক্তব্য দিতে হলে আমি হায়ার অথরিটির অনুমতি নিয়ে কথা বলব। ব্যাংকের তথ্য আপনাকে কে দিয়েছে, সেটা বলতেই হবে। না বললে আপনি ফ্রড করছেন।”
অন্যদিকে, সোনালী ব্যাংক সিলেট কোর্ট বিল্ডিং শাখায় যোগাযোগ করা হলেও এজিএম মো. ওয়ারিসুল ইসলাম কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি। তবে এ বিষয়ে সোনালী ব্যাংক সিলেট অঞ্চলের জেনারেল ম্যানেজার (জিএম) খোকন চন্দ্র বিশ্বাস জানান, “হেড অফিসে সংশ্লিষ্ট ডিভিশনকে এসব তথ্য জানানো হয়েছে। পরবর্তী পদক্ষেপ বা করণীয় কী, সে বিষয়ে প্রধান কার্যালয়ের নির্দেশনার অপেক্ষায় রয়েছি।”