iwdKzj Bmjvg ivRy:
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বাংলাদেশসহ বেশ কয়েকটি দেশের পণ্যের ওপর শুল্ক বৃদ্ধি করেছেন। এছাড়া যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশের ক্ষেত্রে সব দেশের পণ্যের ওপর ১০ শতাংশ শুল্ক আরোপের ঘোষণা দিয়েছেন তিনি। ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসির অর্থনীতি সম্পাদক ফয়সাল আহমেদ জানিয়েছেন, বৈশ্বিক অর্থনীতিতে নতুন শুল্কের প্রভাব বিশাল হবে। তিনি বলেছেন, ১৯৩০ সালে অভ্যন্তরীণ ব্যবসা সম্প্রসারণে যুক্তরাষ্ট্র আমদানিকৃত পণ্যের ওপর শুল্ক আরোপ করে। যা সুরক্ষাবাদ হিসেবে পরিচিত। এরপর প্রায় ১০০ বছরেও যুক্তরাষ্ট্রের শুল্ক এত উচ্চ দেখা যায়নি। এমনকি রাতারাতি এশিয়ার পুঁজিবাজারের দরপতনের সময়ও এমনটি হয়নি। ট্রাম্প যা করেছেন সেটি বৈশ্বিক বাজারে ব্যাপক প্রভাব ফেলবে বলে জানিয়েছেন তিনি।
ট্রাম্প বিশ্বের সব দেশের সব পণ্যের ওপর যে ১০ শতাংশ শুল্ক আরোপ করেছেন সেটি শুক্রবার থেকে কার্যকর হবে। এর উপরে ‘বাণিজ্য উদ্বৃত্ত’ থাকায় কয়েক ডজন দেশের ওপর পারস্পরিক শুল্কও আরোপ করা হবে।
বিবিসির অর্থনীতি সম্পাদক জানিয়েছেন, এশিয়ার দেশগুলোর (বাংলাদেশসহ) ওপর ট্রাম্পের অত্যাধিক শুল্ক আরোপের বিষয়টি বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। কারণ ট্রাম্পের এমন সিদ্ধান্ত এসব দেশের কয়েক হাজার কোম্পানি, ফ্যাক্টরি এমনকি পুরো দেশেরই ব্যবসার মডেল পরিবর্তন করে দিতে পারে। বিশ্বের সবচেয়ে বড় কোম্পানিগুলোর ‘সাপ্লাই চেইন’ তাৎক্ষণিকভাবে ভেঙে যেতে পারে। আর অত্যাসন্ন এ প্রভাব এই দেশগুলোকে চীনের দিকে ঠেলে দিতে পারে। ট্রাম্প এসব করছেন যুক্তরাষ্ট্রের আমদানি-রপ্তানির মধ্যে থাকা ব্যবধান শূন্যের কোটায় নিয়ে আসার জন্য। যা বৈশ্বিক অর্থনীতির আগের সবকিছু পরিবর্তন করে দেবে।
নতুন শুল্ক আরোপের প্রভাব যেসব ফ্যাক্টরির ওপর পড়বে সেগুলো অন্যত্র সরিয়ে নিতে কয়েক বছর সময় লাগবে। তবে পূর্ব এশিয়ার যেসব দেশে ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ শুল্ক আরোপ করা হয়েছে সেসব দেশের উৎপাদিত কাপড়, খেলনা এবং বৈদ্যুতিক জিনিসপত্রের দাম খুব দ্রুত বৃদ্ধি পাবে বলে জানান ফয়সাল আহমেদ।
এই দেশগুলোর ওপর শুল্ক আরোপের কারণে ইউরোপের কিছু ভোক্তা লাভবান হতে পারে বলে জানিয়েছেন তিনি। এছাড়া বিশ্বের বড় বড় অর্থনীতির দেশগুলো যুক্তরাষ্ট্রের বাইরে অন্য কোথাও নিজেদের ব্যবসাকে একীভূত করতে পারে তারা। এমনকি ভোক্তারাও সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমে ‘প্রতিশোধ’ নিতে পারেন। ইউরোপের দেশগুলো সিদ্ধান্ত নিতে পারে তারা আর যুক্তরাষ্ট্রে উৎপাদিত পণ্য কিনবে না।— যোগ করেন ফয়সাল।
শুল্ক আরোপের প্রভাবে সামাজিক মাধ্যম সেবায় যুক্তরাষ্ট্রের বড় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের একচেটিয়া বিধানেও ব্যাপক পরিবর্তন আসতে পারে বলে জানিয়েছেন বিবিসির এ সাংবাদিক। শুল্ক আরোপের কারণে যুক্তরাষ্ট্রে যে মূল্যস্ফীতি দেখা দেবে সেটির কারণে দেশটির কেন্দ্রীয় ব্যাংককে সুদের হার বাড়াতে হবে বলেও মন্তব্য করেছেন তিনি। শেষে ফয়সাল আহমেদ বলেছেন, সবকিছু বিবেচনায় মনে হচ্ছে বিশ্বে একটি অপ্রীতিকর বাণিজ্য যুদ্ধ অত্যাসন্ন। সূত্র: বিবিসি
ট্রাম্পের শুল্কনীতি আরোপে বাণিজ্য যুদ্ধের শঙ্কা: মিত্র থেকে শত্রু; কেউ যেন বাদ পড়েনি যুক্তরাষ্ট্রের কথিত ‘লিবারেশন ডে’ শুল্কারোপ নীতি থেকে। মিত্র দক্ষিণ কোরিয়া, জাপানের মতো দেশের ওপরও আরোপ হয়েছে যথাক্রমে ২৫ ও ২৪ শতাংশ শুল্ক। দক্ষিণ কোরিয়া, জাপান, অস্ট্রেলিয়াসহ ইউরোপীয় ইউনিয়ন ডোনাল্ড ট্রাম্পের সিদ্ধান্তে তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে। শুল্কারোপের এই উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়েছে বিশ্বজুড়ে। তৈরি হয়েছে বাণিজ্য যুদ্ধের শঙ্কা। পাল্টা পদক্ষেপের হুঁশিয়ারিও দিয়েছে বিভিন্ন দেশ।
জাপানের প্রধানমন্ত্রী শিগেরু ইশিবা বলেন, ২০১৯ সাল থেকে আমাদের দেশ যুক্তরাষ্ট্রে সবচেয়ে বড় বৈশ্বিক বিনিয়োগকারী। জাপানিজ কোম্পানিগুলো মার্কিন অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে এবং রাখছে। আমরা খুবই হতাশ।
দক্ষিণ কোরিয়ার বাণিজ্যমন্ত্রী ডুক জিউন বলেন, এটি দুঃখজনক। বিশ্ব বাণিজ্যের ওপর মার্কিন শুল্কারোপ গভীর প্রভাব ফেলবে। ওয়াশিংটনের সাথে যত দ্রুত সম্ভব আমরা আলোচনায় বসব। যুক্তরাষ্ট্রের শুল্কারোপকে সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন ও অযৌক্তিক দাবি করেছে অস্ট্রেলিয়া। দেশটি বলছে, অবন্ধুসুলভ আচরণ করেছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প।
অস্ট্রেলিয়ার প্রধানমন্ত্রী অ্যানথনি আলবানিজ বলেন, এই শুল্কারোপের পেছনে ট্রাম্প প্রশাসনের কোনো ভিত্তি নেই, কোনো যুক্তি নেই। এটা আমাদের দুই দেশের অংশীদারীত্বের ভিত্তির বিরুদ্ধে। এটা কোনো বন্ধুর কাজ নয়। বিশ্ব অর্থনীতিতে অনিশ্চয়তা বাড়বে। ডোনাল্ড ট্রাম্পের শুল্কারোপের জেরে পাল্টা পদক্ষেপ নেয়ার হুঁশিয়ারি দিয়েছে ইউরোপ। শিগগিরই এ সংক্রান্ত ঘোষণা আসবে বলে জানিয়েছে।
ইউরোপিয়ান কমিশনের প্রেসিডেন্ট উরসুলা ভন ডার লিয়েন বলেন, এটা বিশ্ব অর্থনীতির জন্য বিশাল ধাক্কা। বিশ্ব বাণিজ্য তো ক্ষতিগ্রস্ত হবেই সেই সাথে গোটা পৃথিবীর ভোক্তারাও ক্ষতিগ্রস্ত হবে। কিন্তু আমরা জবাব দিতে প্রস্তুত। স্টিল ও অ্যালুমিনিয়ামের ওপর ট্রাম্পের আরোপিত শুল্কের বিপরীতে এরইমধ্যে আমরা পাল্টা ব্যবস্থা নিয়েছি। ব্যবসায়ীক স্বার্থ সুরক্ষায় আরও পদক্ষেপ নিতে প্রস্তুত ইউরোপ। এরইমধ্যে পাল্টা পদক্ষেপ নিয়েছে লাতিন আমেরিকার দেশ ব্রাজিল। দেশটির পণ্যের ওপর শুল্ক আরোপ করে এমন যেকোনো দেশকে জবাব দিতে আইনও পাস করেছে ব্রাজিলের পার্লামেন্ট।
জনশূন্য দ্বীপেও শুল্ক বসালেন ট্রাম্প, বসবাস কেবল পেঙ্গুইন-পাখির: মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প হোয়াইট হাউসের রোজ গার্ডেনে দাঁড়িয়ে ‘‘স্বাধীনতা দিবসের শুল্ক’’ হিসাবে বর্ণনা করে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের ওপর যে শুল্ক চাপিয়েছেন, সেটির জন্য অনেক দেশই প্রস্তুত ছিল। কিন্তু তিনি যে জনশূন্য ও বসতিহীন দ্বীপের ওপর শুল্ক চাপাবেন তা হয়তো কেউই ধারণ করতে পারেন নাই। জনমানবহীন সেই দ্বীপপুঞ্জে কেবল বসবাস রয়েছে পেঙ্গুইন, সিল আর কিছু প্রজাতির পরিযায়ী পাখির। যুক্তরাষ্ট্রের সকল বাণিজ্য অংশীদারদের ওপর বেসলাইন ১০ শতাংশ হারে শুল্ক আরোপ করা ছাড়াও ট্রাম্প প্রশাসনের তালিকায় অ্যান্টার্কটিকার ভারত মহাসাগরীয় জনশূন্য হার্ড ও ম্যাকডোনাল্ড দ্বীপপুঞ্জকেও অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। আর হ্যাঁ, এই দুই দ্বীপে কোনও মানুষের বসবাস নেই। হোয়াইট হাউসের প্রকাশিত তালিকায় থাকা হার্ড দ্বীপ ও ম্যাকডোনাল্ড দ্বীপ অস্ট্রেলিয়ার দূরবর্তী ভূখণ্ড। অস্ট্রেলিয়ার ভূখণ্ড হওয়ায় এসব দ্বীপকে নতুন শুল্ক তালিকায় যুক্ত করা হয়েছে বলে হোয়াইট হাউসের একজন কর্মকর্তা জানিয়েছেন।
বক্তৃতার সময় যেসব দেশ ও ভূখণ্ডের বিরুদ্ধে নতুন করে শুল্ক আরোপ করেছেন ট্রাম্প, সেসব দেশের তালিকা সম্বলিত পোস্টার দেখা যায় তার হাতে। পরে এসব দেশের বিষয়ে শুল্ক আরোপের ব্যাখ্যাসহ বিস্তারিত তথ্য সাংবাদিকদের সরবরাহ করা হয়। সেখানে বলা হয়েছে, হার্ড দ্বীপ ও ম্যাকডোনাল্ড দ্বীপ বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের পণ্যে ১০ শতাংশ শুল্ক আরোপ করেছে। এর পাল্টায় যুক্তরাষ্ট্র একই হারে এসব দ্বীপের বিরুদ্ধে শুল্ক আরোপ করছে। অস্ট্রেলিয়ার সরকারের ওয়েবসাইটে বলা হয়েছে, বিশ্বের অন্যতম প্রত্যন্ত ও দূরবর্তী জনমানবহীন হার্ড দ্বীপ ও ম্যাকডোনাল্ড দ্বীপ। অস্ট্রেলিয়ান অ্যান্টার্কটিক প্রোগ্রাম অনুযায়ী, আবহাওয়া পরিস্থিতির ওপর নির্ভর করে পশ্চিম অস্ট্রেলিয়ার পার্থের পার্শ্ববর্তী ফ্রেম্যান্টল বন্দর থেকে জাহাজে চেপে হার্ড দ্বীপে পৌঁছাতে সময় লাগে অন্তত ১০ দিন।
হার্ড দ্বীপ এবং ম্যাকডোনাল্ড দ্বীপে কেবল পেঙ্গুইন, সিল এবং পরিযায়ী পাখির বসবাস। যার মধ্যে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে সংরক্ষিত কয়েকটি প্রজাতির পাখিও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। ইউনেস্কোর বিশ্ব ঐতিহ্যের তালিকাভুক্ত অস্ট্রেলিয়ার ওই দ্বীপ ভূখণ্ড ট্রাম্পের ঘোষণা করা এমন সব অঞ্চলের তালিকায় আছে; যার ওপর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে আমদানিতে কমপক্ষে ১০ শতাংশ শুল্ক বসবে।
ব্রিটিশ দৈনিক দ্য গার্ডিয়ান বলেছে, অস্ট্রেলিয়ার দূরবর্তী হার্ড দ্বীপ ও ম্যাকডোনাল্ড দ্বীপ এমনই জনশূন্য যে গত প্রায় ১০ বছরে সেখানে কোনও মানুষই যাননি। এমন জনশূন্য দ্বীপ ভূখণ্ডের ওপর ট্রাম্পের শুল্ক চাপানোর ঘোষণায় রীতিমতো ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছেন অস্ট্রেলিয়ার প্রধানমন্ত্রী অ্যান্থনি আলবানিজ। তিনি বলেছেন, বিশ্বের কোনও স্থানই নিরাপদ নয়।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক বার্তায় আলবানিজ বলেছেন, এসব অনিশ্চিত সময়, সকল অস্ট্রেলিয়ান এ সম্পর্কে নিশ্চিত হতে পারে। এই শুল্ক অপ্রত্যাশিত নয়, তবে অমূলক। আজকের এই সিদ্ধান্তের কারণে অস্ট্রেলিয়ার তুলনায় অন্যান্য অনেক দেশ বেশি ভুগবে। এই শুল্ক মোকাবিলায় অস্ট্রেলিয়ার চেয়ে বিশ্বের কোনও দেশই আর ভালো প্রস্তুতি নেয়নি।
হার্ড দ্বীপ এবং ম্যাকডোনাল্ড দ্বীপ ছাড়াও অস্ট্রেলিয়ার অন্যান্য দূরবর্তী ভূখণ্ডও ট্রাম্পের নতুন শুল্ক তালিকায় আছে। এর মধ্যে কোকোস দ্বীপ, ক্রিসমাস দ্বীপ এবং নরফোক দ্বীপও রয়েছে। নরফোক দ্বীপে ২ হাজার ১৮৮ জন মানুষের বসবাস রয়েছে। এই দ্বীপের ওপর ২৯ শতাংশ শুল্ক আরোপ করেছে ট্রাম্প প্রশাসন; যা অস্ট্রেলিয়ার মূল ভূখণ্ডের ওপর আরোপিত শুল্কের তুলনায় ১৯ শতাংশ বেশি। সূত্র: অ্যাক্সিওস, দ্য গার্ডিয়ান।
ট্রাম্পের নতুন শুল্ক আরোপে দেশে দেশে পাল্টা পদক্ষেপের ঘোষণা: আন্তর্জাতিক বিশ্বের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের তথাকথিত ‘বাণিজ্য ঘাটতি’ কাটাতে নতুন শুল্ক পরিকল্পনা ঘোষণা করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। নতুন সেই পরিকল্পনায় যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্ক রয়েছে— এমন সব দেশ ও অঞ্চলের রপ্তানি শুল্ক বাড়িয়েছেন ট্রাম্প। গত বুধবার যুক্তরাষ্ট্রের স্থানীয় সময় বিকেল ৪টার দিকে ওয়াশিংটনের হোয়াইট হাউসে এই পরিকল্পনা ঘোষণা করেন ট্রাম্প। সংবাদ সম্মেলনের শুরুতে ২ এপ্রিলকে যুক্তরাষ্ট্রের ‘অর্থনৈতিক স্বাধীনতা দিবস’ হিসেবে ঘোষণা করেন ট্রাম্প। নতুন শুল্ক আরোপকে যুক্তরাষ্ট্রের ‘অর্থনৈতিক স্বাধীনতা’ বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
তবে মার্কিন প্রেসিডেন্টের এই ‘অর্থনৈতিক স্বাধীনতা’র সমালোচনা করেছেন প্রায় সব বৈশ্বিক নেতা। অনেকে যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে পাল্টা অর্থনৈতিক ব্যবস্থা গ্রহণের হুমকিও দিয়েছেন।
ইউরোপীয় ইউনিয়ন: যুক্তরাষ্ট্রের ঘনিষ্ঠ মিত্র এবং ইউরোপের দেশগুলোর জোট ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইউ) ওপর ২০ শতাংশ রপ্তানি শুল্ক ঘোষণা করেছেন ট্রাম্প। তাৎক্ষণিক এক প্রতিক্রিয়ায় রয়টার্সকে ইইউ’র প্রেসিডেন্ট উরসুলা ভন ডার লেন বলেন, “এই ঘোষণার প্রতিক্রিয়ায় (যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে) কী কী অর্থনৈতিক ব্যবস্থা গ্রহণ করা যায়, তা চূড়ান্ত করার কাজ চলছে। তবে আমরা প্রথমে আলাপ-আলোচনাকে গুরুত্ব দেবো। যদি তাতে কোনো কাজ না হয়, সেক্ষেত্রে ব্যবস্থা গ্রহণ করা ছাড়া আমাদের সামনে আর কোনো বিকল্প থাকবে না।”
চীন: আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও রাজনীতিতে যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম বড় প্রতিদ্বন্দ্বী চীনের ওপর ২৪ শতাংশ রপ্তানি শুল্ক আরোপ করেছেন ট্রাম্প। তাৎক্ষণিক এক প্রতিক্রিয়ায় চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে প্রদান করা এক বিবৃতিতে বলা হয়েছে, “আমরা দৃঢ়ভাবে এতে আপত্তি জানাচ্ছি। সেই সঙ্গে বলছি যে জাতীয় স্বার্থ রক্ষায় ব্যবস্থা গ্রহণের অধিকার চীনের রয়েছে এবং আমরা তা করব।”
জাপান: এশিয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মিত্র জাপানের ওপর ২৪ শতাংশ রপ্তানি শুল্ক জারি করেছেন ট্রাম্প। তাৎক্ষণিক এক প্রতিক্রিয়ায় দেশটির বাণিজ্যমন্ত্রী ইওজি মাতো বলেছেন, ‘ওয়াশিংটনের এই সিদ্ধান্ত খুবই দুঃখজনক। এর বেশি আর কিছু বলেননি তিনি।
দক্ষিণ কোরিয়া: যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম এশীয় মিত্র দক্ষিণ কোরিয়ার ওপরও ২৫ শতাংশ রপ্তানি শুল্ক আরোপ করেছেন ট্রাম্প। তবে দেশটির ভারপ্রাপ্ত প্রেসিডেন্ট হান ডাক-সু ওয়াশিংটন বা ডোনাল্ড ট্রাম্পের কোনো সমালোচনা করেননি, বরং অতিরিক্ত রপ্তানি শুল্কের ফেলে যেসব খাতে সম্ভাব্য আর্থিক ক্ষতির আশংকা রয়েছে, তা প্রতিরোধে ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ দিয়েছেন তিনি।
কানাডা ও মেক্সিকো: গত ২০ জানুয়ারি প্রেসিডেন্টের শপথ গ্রহণের পর দুই প্রতিবেশী দেশ কানাডার বিরুদ্ধে ২৫ শতাংশ রপ্তানি শুল্ক জারি করেছিলেন ট্রাম্প। নতুন ঘোষণায় এই দুই দেশের ওপর আরও ১০ শতাংশ করে শুল্ক আরোপ করা হয়েছে। কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি ইতোমধ্যে ‘জাতীয় স্বার্থ রক্ষায় পাল্টা ব্যবস্থা গ্রহণের’ ইঙ্গিত দিয়েছেন।
আর মেক্সিকোর প্রেসিডেন্ট ক্লডিয়া শেইনবাম জানিয়েছেন, তার সরকার ‘টিট ফর ট্যাট’ নীতিতে বিশ্বাসী নয়, তবে ট্রাম্প প্রশাসনের এই নতুন পদক্ষেপের বিপরীতে ‘বিস্তৃত কর্মসূচি’ গ্রহণের পরিকল্পনা মেক্সিকোর রয়েছে। যথাসময়ে সেই কর্মসূচি ঘোষণা করা হবে।
অস্ট্রেলিয়া: অস্ট্রেলিয়ার ওপর ১০ শতাংশ রপ্তানি শুল্ক আরোপ করেছেন ট্রাম্প। প্রধানমন্ত্রী অ্যান্থনি অ্যালবানিজ তাৎক্ষণিক এক প্রতিক্রিয়ায় জানিয়েছন, এই পদক্ষেপের প্রতিক্রিয়া হিসেবে মার্কিন পণ্যের ওপর পাল্টা শুল্ক আরোপের কোনো পরিকল্পনা তার সরকারের নেই। পাশাপাশি তিনি বলেছেন, আরোপিত শুল্ক প্রত্যাহারে ওয়াশিংটনের সঙ্গে আলাপ-আলোচনা চালিয়ে যাবে ক্যানবেরা।
ব্রাজিল: দক্ষিণ আমেরিকা মহাদেশের বৃহত্তম অর্থনীতির দেশ ব্রাজিলের ওপরও ১০ শতাংশ রপ্তানি শুল্ক জারি করা হয়েছে। এর প্রতিক্রিয়ায় দেশটির সরকারের পক্ষ থেকে এক বিবৃতিতে বলা হয়েছে, “ব্রাজিল দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যে পারস্পরিক সহযোগিতা নিশ্চিত করার জন্য সম্ভাব্য সকল পদক্ষেপ মূল্যায়ন করছে, যার মধ্যে বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার সদস্যপদ ফিরে পাওয়ার ব্যাপারটিও অন্তর্ভুক্ত। সূত্র : রয়টার্স
অর্থনৈতিক মন্দার শঙ্কা বিশ্লেষকদের: দ্বিতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় এসেই একের পর এক ঝড় তুলেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। এবার রীতিমতো কাঁপন ধরিয়ে দিলেন বিশ্ব অর্থনীতিতে। বাংলাদেশসহ ১৮৫টি দেশ-অঞ্চলের ওপর শুল্ক বৃদ্ধির জেরে বিশ্বজুড়ে তীব্র অর্থনৈতিক মন্দার শঙ্কায় বিশ্লেষকরা। বলা হচ্ছে, ওয়াশিংটনের পদক্ষেপের জবাবে পাল্টা ট্যারিফ দিতে পারে অন্য দেশগুলোও। যার ফলে বেড়ে যাবে বিশ্বের প্রায় সব পণ্যের দাম। বিশ্লেষকরা বলছেন, পাল্টাপাল্টি শুল্কারোপের জেরে বাণিজ্য যুদ্ধ শুরু হলে, চরম অস্থিরতা তৈরি হবে আন্তর্জাতিক বাজারে।
অর্থনীতিবিদ থমাস ব্রিজেস বলেন, এই শুল্ক দীর্ঘস্থায়ী হলে বিশ্ব অর্থনীতির ভিত্তির ওপর যথেষ্ট প্রভাব পড়বে। সব আমদানি পণ্যে যদি অন্য দেশগুলোও শুল্কারোপ শুরু করে তাহলে বিশ্বব্যাপী পণ্যের দাম বেড়ে যাবে। যেমন ধরা যাক, তাইওয়ান কম্পিউটার চিপ আমদানি করে। শুল্ক বাড়লে চিপের দামও বাড়বে। বাড়বে কম্পিউটারের দামও। যুক্তরাষ্ট্রকে জবাব দিতে অন্য দেশগুলোও একই পদক্ষেপ নিলে শুরু হবে ভয়াবহ বাণিজ্য যুদ্ধ। যার জেরে আবারও তীব্র অর্থনৈতিক মন্দার কবলে পড়তে পারে বিশ্ব, এমন শঙ্কা বিশ্লেষকদের।
অর্থনীতিবিদ ভ্লাদিমির তায়ঝেলনিকোভের মতে, বিষয়টি খুবই উদ্বেগের। ট্রাম্পের শুল্কারোপের জবাব স্বাভাবিকভাবেই অন্য দেশগুলো পাল্টা শুল্কারোপের মাধ্যমেই দেবে। এই বাণিজ্য যুদ্ধ যদি আরও তীব্র হয়, তাহলে আমরা ২০১৪ সালের মতো বৈশ্বিক মন্দা দেখতে পাবো। এমনকি পরিস্থিতি সে সময়ের চেয়েও ভয়াবহ হতে পারে। মনে করা হচ্ছে, ট্রাম্পকে থামানোর আপতত কোনো পথ নেই। আপিল বিভাগ সক্রিয় না হওয়ায় বিশ্ব বাণিজ্যের নিয়ন্ত্রক সংস্থা ডব্লিওটিও বর্তমানে রীতিমতো অকার্যকর। কাজেই সেখানে অভিযোগ করেও কোনো সমাধান পাবে না ভুক্তোভোগী দেশগুলো। ভ্লাদিমির তায়ঝেলনিকোভ বললেন, বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থায় অভিযোগ করে লাভ হবে না। ২০২০ সাল থেকে সংস্থাটির আপিল বিভাগ সক্রিয় নেই। কারণ, যুক্তরাষ্ট্র সেখানে নতুন বিচারক নিয়োগে বাধা দিয়ে আসছে, আর এই দ্বন্দ্বের সমাধানও হচ্ছে না। কেউ কেউ বলছেন, অনেক দেশই এই পরিস্থিতিতে বাণিজ্যের জন্য নতুন বাজার খুঁজবে। তবে, যুক্তরাষ্ট্রের বিকল্প পাওয়া সহজ হবে না।
এশিয়ার শেয়ারবাজারে ধস: যুক্তরাষ্ট্রের ১৮৫টি দেশ-অঞ্চলের পণ্যে শুল্ক বৃদ্ধির ঘোষণার জেরে ধস নেমেছে এশিয়ার শেয়ারবাজারে। ফলে বিশ্ব বাণিজ্য ও সাপ্লাই চেনে বিপর্যয়ের শঙ্কা করা হচ্ছে। ট্রাম্পের এই শুল্কারোপে সবচেয়ে বেশি ভুক্তোভোগী ভাবা হচ্ছে এশিয়ার দেশগুলোকে। ওয়াশিংটনের অন্যতম বাণিজ্যিক অংশীদার হিসেবে পরিচিত চীন, জাপান, ভিয়েতনাম ও দক্ষিণ কোরিয়াসহ অন্যান্য দেশের ওপর বড় ধরণের শুল্কারোপ করা হয়েছে। যার প্রভাব পড়েছে দেশগুলোর শেয়ারবাজারে।
জাপানের নিক্কেইয়ের গড় শেয়ার ৪ দশমিক ৬ শতাংশ কমে আট মাসের মধ্যে সর্বনিম্ন হয়েছে। এদিকে, দক্ষিণ কোরিয়ার বেঞ্চমার্ক কোরিয়া কম্পোজিট স্টক প্রাইস ইনডেক্স ৩৬ দশমিক ৫৭ পয়েন্ট কমেছে। পতন ঘটেছে চীনের শেয়ার বাজারেও। দেশটির মুদ্রা ইউয়ানের দর সাত সপ্তাহের মধ্যে সর্বনিম্ন হয়েছে।
অর্থনীতিবিদ টিম হারকোর্ট বলেছেন, এই বাণিজ্য যুদ্ধে কেউ জিতবে না। শুল্ক আরোপ করা নিজের পায়ে নিজের কুড়াল মারার মতো। শেষ পর্যন্ত এটি ট্রাম্পের জনপ্রিতা কমাবে। যুক্তরাষ্ট্রেরও ক্ষতি করবে। আমার মনে হয়, এ ক্ষেত্রে এশিয়ার দেশগুলো বিচক্ষণতার পরিচয় দেবে। ফলে আসিয়ানের সাথে উত্তর-পূর্ব এশিয়ার বাণিজ্য বাড়বে।
বাংলাদেশসহ ১৮৫টি দেশ-অঞ্চলের ওপর শুল্ক বৃদ্ধি: এবার যুক্তরাষ্ট্রের অতিরিক্ত শুল্কের খড়গ পড়লো বাংলাদেশসহ ১৮৫টি দেশ ও অঞ্চলের ওপর। বাংলাদেশি পণ্যে শুল্কের হার বাড়িয়ে ৩৭ শতাংশ ধার্য করেছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। ন্যূনতম ১০ শতাংশ থেকে সর্বোচ্চ ৫০ শতাংশ পর্যন্ত ট্যারিফের কবলে পড়েছে এসব দেশ। মার্কিন প্রেসিডেন্টের দাবি, অসম বাণিজ্যনীতির জবাব দিতেই এমন পদক্ষেপ। অভিযোগ, ৫ দশকের বেশি সময় ধরে বৈদেশিক বাণিজ্যে লুটপাট, নিপীড়নের শিকার হয়ে আসছে যুক্তরাষ্ট্র।
গত বুধবার (২ এপ্রিল) স্থানীয় সময় বিকেলে হোয়াইট হাউসের রোজ গার্ডেনের সংবাদ সম্মেলনে বিশাল এক খতিয়ান নিয়ে হাজির হন ডোনাল্ড ট্রাম্প। কোন দেশের সাথে কতটা বাণিজ্য ঘাটতি তুলে ধরেন সে তালিকা। কর চাপানোর এই তালিকা থেকে বাদ পড়েনি এশিয়া থেকে অস্ট্রেলিয়া, আমেরিকা থেকে ইউরোপ কোনো অঞ্চল। নতুন শুল্কারোপের সিদ্ধান্ত ঘোষণার দিনটিকে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক স্বাধীনতার দিন আখ্যা দিয়েছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প।
তিনি এ সময় বলছিলেন, এই দিনের জন্য বহুকাল অপেক্ষা করেছি। এপ্রিলের ২ তারিখ, দিনটি আজীবন স্মরণীয় হয়ে থাকবে। এটা মার্কিন শিল্পের পুনর্জন্মের দিন। আমেরিকার লক্ষ্য পুনরুদ্ধারের দিন। আমেরিকাকে আবার সমৃদ্ধ করে গড়ে তোলার সূচনার দিন। এদিকে, দেশটিতে আগে বাংলাদেশের পণ্যে শুল্কের হার ছিল গড়ে ১৫ শতাংশ। অতিরিক্ত শুল্কের কারণে দেশের রফতানি বাজার বিশেষ করে পোশাক খাতে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে বলে ধারণা করছেন অর্থনীতিবিদরা। যুক্তরাষ্ট্রে বছরে প্রায় ৮৪০ কোটি ডলারের পণ্য রফতানি করে বাংলাদেশ। এর মধ্যে বড় অংশই তৈরি পোশাক।
পোশাক খাতে বাংলাদেশের অন্যতম প্রতিদ্বন্দ্বী দেশগুলোর মধ্যে চীন, ভারত, ভিয়েতনাম, কম্বোডিয়ার ওপর শুল্কের হার বাড়িয়ে যথাক্রমে ৩৪, ২৬, ৪৬ ও ৪৯ শতাংশ নির্ধারণ করা হয়েছে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের ওপর আরোপ হয়েছে ২০ শতাংশ শুল্ক। দক্ষিণ আফ্রিকার দক্ষিণের ছোট দেশ লেসেথোর ওপরও চাপানো হয়েছে ৫০ শতাংশ ট্যারিফ।
ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেন, ৫০ বছরের বেশি সময় ধরে আমাদের দেশ ও করদাতাদের ছিন্নভিন্ন করা হয়েছে। তবে আর তা হবে না। বিষয়টি খুব সাধারণ। আমাদের সাথে যা করা হবে, সেটাই তাদের সাথে করা হবে। বেশিরভাগ দেশের ওপর ৫ এপ্রিল থেকে কার্যকর হবে বর্ধিত শুল্ক। কিছু দেশে ৯ এপ্রিল। দেশটিতে আমদানিকৃত পণ্যে শুল্কের পরিমাণ বেড়ে ২ দশমিক ২ ট্রিলিয়ন ডলারে দাঁড়াবে ২০৩৪ সাল নাগাদ। নিজ দেশের বাইরে তৈরি মোটরযানের ওপর ২৫ শতাংশ শুল্ক আরোপেরও ঘোষণা দেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট। যা ঘোষণার কয়েকঘণ্টা পরই কার্যকরের কথা জানানো হয়।