--মামুনার রশীদ, বগুড়া।
"আমার একটি স্বপ্ন আছে"এটি একটি উক্তি? না ,শুধু একটি উক্তি না ,এটি একটি বিখ্যাত ঐতিহাসিক উক্তি । আমার একটি স্বপ্ন আছে-এটি আমার কথা নয় ,এই স্বপ্ন হল মার্টিন লুথার কিং জুনিয়রের।আমেরিকার এই বর্ণবাদ বিরোধী নেতা ১৯৫৭ সালে নিগ্রোদের নেতা নির্বাচিত হন এবং ১৯৬৩ সালে তিনি টাইম ম্যাগাজিনের ম্যান অব দ্য ইয়ার নির্বাচিত হন । ১৯২৯ সালে জন্ম নেওয়া মার্টিন লুথার কিং জুনিয়র মাত্র পনের বছর বয়সে ডিগ্রি পাশ করেন । তিনি ছিলেন কৃষ্ণাঙ্গ সমাজের প্রতিবাদী নেতা । তিনি সর্বদা চেয়েছেন সাদা এবং কালো মানুষের আকাশচুম্বী ব্যবধানকে একই সীমা রেখায় আনতে ।যার কারণে তিনি তাঁর সংক্ষিপ্ত জীবনে বিশ বারেরও অধিক সময় গ্রেফতার হন আর কমপক্ষে চারবার জেল খেটেছেন ।
আজকের প্রেক্ষাপটে তিনি কেবল আমেরিকান কৃষ্ণাঙ্গ নেতা নন বরং বিশ্ব ফিগারে পরিণত হয়েছেন ।মাত্র ৩৫ বছর বয়সে তিনি শান্তিতে নোবেল পান যার অর্থ তিনি জনগণের আন্দোলনে ব্যয় করেছেন ।আজকের বিশ্ব কৃষ্ণাঙ্গ নেতারা,সফল অধিপতিরা কিং লুথারের আন্দোলন আর প্রতিবাদের ফল ।আমার একটি স্বপ্ন আছে -আমেরিকার প্রেসিডেন্ট কোনো এক সময় কৃষ্ণাঙ্গ হবে ,দূর হবে সাদা কালোর সকল মৌলিক বৈষম্য।তাঁর মৃত্যুর চার দশক পরে তাঁর সেই স্বপ্ন সত্যি হয়েছে ।২৮শে আগষ্ট ,১৯৬৩ ,প্রায় ২,৬০০০ মানুষের ওয়াশিংটন মুখি যাত্রা সমাবেশে কিং লুথার জুনিয়র ঘোষণা করলেন "I have a dream"।এমন সময় তিনি এই স্বপ্ন ঘোষণা করেন যখন গৃহযুদ্ধে রক্তাত্ত আমেরিকা ।আমার একটা স্বপ্ন আছে - বর্ণ বৈষম্যহীন সমাজের ,সৃষ্টিগতভাবে সবাই সমান ,সবার জন্য সমান সুযোগ । তাই সেই বিখ্যাত স্বপ্নের কয়েকটা লাইনঃ
Now, it is the time to rise up
from the dark and desolate valley of segregation.Now,it is the time to make
real the promises of democracy.I have a dream that one day this nation will
rise up and live out the true meaning of its creed.
এই বিখ্যাত স্বপ্ন দ্রষ্টাও রক্ষা পান নি আততায়ীর হাত থেকে ।১৯৬৮ সালের ৪ঠা এপ্রিল বেলকোনিতে দাঁড়িয়ে থাকা অবস্থায় প্রাণ দেন ।তিনি নেই তবে তাঁর স্বপ্নটা আজ বাস্তব । বাংলাদেল কি পাবে এমন একজন স্বপ্নদ্রষ্টাকে যে দলের রাজনীতি না ,মানুষের অধিকারের কথা বলবে ?বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, জিয়াউর রহমান থেকে শুরু করে আমরা যেসব সরকার প্রধান পেয়েছি ,রাজনীতিবিদ পেয়েছি,তাঁরা সকলে দলীয় স্বপ্নদ্রষ্টা হয়ে উঠেছিলেন এবং আজও দল ব্যতিতও আপামরজনসাধারণ তাঁদেরকে স্বপ্নদ্রষ্টা মনে করে না; তাঁদের দল তাঁদেরকে দলীয় সম্পদ ও দলীয় আদর্শের প্রতীক হিসেবে উপস্থাপন করেছে।যার ফলে স্বাধীনতা পাঁচ দশক পরেও আমরা একজন খাঁটি দেশপ্রেমিক রাজনৈতিক স্বপ্নদ্রষ্টা পাইনি।
নিঃস্বার্থ একজন স্বপ্নদ্রষ্টা বাঙালির
ভাগ্যে জোটেনি।যিনি আমাদের শুনাবেন "I HAVE A
DREAM"বাঁচুক বাংলাদেশ এমন একটি স্বপ্ন
নিয়ে ।আমেরিকার ভাগ্য ভালো তারা জর্জ
ওয়াশিংটনের পরে আব্রাহামকে পেয়েছে
,মার্টিন কিং লুথারকে পেয়েছে
আর আমরা পেয়েছি শুধু
পেয়েছি রাষ্ট্র শাসক এবং দলীয়
সংকীর্ণতা থেকে তারা মুক্ত
হতে পারেন নি।এন্ড্রু কিশোরের একটা বাংলা গানের
অন্তরা এখানে প্রণিধানযোগ্য " আশায় আশায় দিন
যে গেল,আশা পূরণ
হলো না।" আমরা সব সময়
আশায় থাকি হয়তো রাজনীতিতে
একজন রাজনৈতিক মোহমুক্ত মহাত্মা গান্ধী পাবো,একজন মাহাথির
মোহাম্মদ পাবো,একজন লিংকন
বা মার্টিন লুথার কিং পাবো।
স্বপ্ন দেখা ভালো কিন্তু আমি হয়তো দিবাস্বপ্ন দেখছি কারণ বাংলাদেশের রাজনীতি নিয়ে স্বপ্ন দেখা মানে দিবাস্বপ্ন দেখা এবং দুঃস্বপ্নের সহযাত্রী হওয়া।স্বপ্ন আনন্দদায়ক হতে পারে,ভয়ংকর হতে পারে,হতবুদ্ধিকর বা অস্পষ্ট হতে পারে - আমার স্বপ্ন যে কোনটি তা নিজেও জানি না।রাজনৈতিক দর্শন থেকে,মানুষের বৈষম্য দূরীকরণে মার্টিন লুথার কিং স্বপ্ন দেখেছিলেন কিন্তু সিগমুন্ড ফ্রয়েড মনে করেন' স্বপ্ন হচ্ছে অবচেতন আকাঙ্ক্ষা ও প্রেষণার প্রতিফলন এবং এটা অবদমিত ইচ্ছার ছদ্মবেশী পরিপূর্ণতা।' তবে মার্টিন লুথার কিং এর স্বপ্ন এমন নয় বরং তা সত্য,সুন্দর এবং সাম্যের সুনীল আকাশ আর আমার স্বপ্ন অনেকটা ভয়ানক।বিখ্যাত রোমান্টিক কবি উইলিয়াম ওয়ার্ডসওয়ার্থ (১৭৭০--১৮৫০) বলেন,"কবিরা হলেন স্বপ্নদর্শী যাদের রয়েছে আমাদের স্বপ্নগুলোকে সত্যি করার ক্ষমতা।" আর আমি মনে করি রাজনীতিবিদরা হলেন সেই কবি,সেই কর্তা,সেই সংস্কারক যারা আমাদের মতো ছোট ছোট মানুষের স্বপ্ন পূরণে নিরলস প্রচেষ্টা চালিয়ে যান।তবে আমাদের দুর্ভাগ্য আমরা এমন রাজনীতিবিদ পাই নি; আমাদের রাজনীতিবিদগণ থেকে শুরু করে তৃণমূলের সমর্থকেরাও শুধু ক্ষমতায় যাওয়ার নেশায় দশকের পরে দশক স্বপ্ন দেখেন।
তাঁদের স্বপ্নের মূলে রয়েছে ক্ষমতা। বৈষম্য দূর,বেকারত্ব হ্রাস,পানির সমস্যা সমাধান, রাজনৈতিক অনৈক্য দূর,দলীয় ভেদাভেদ দূর,স্বজনপ্রীতি রোধ,দুর্নীতি মুক্ত দেশ,সুষ্ঠু ও টিকসই বহুদলীয় গণতন্ত্র বহাল - এসব আজ সকলের কাছেই দিবাস্বপ্ন।এমন স্বপ্ন আমাদের ক্ষমতা পাগল রাজনীতিবিদগণ দেখবেন না; এখানে বরং অন্য দল ও গোষ্ঠীকে হেনস্তা করে,আইনের অপপ্রয়োগে নিষ্ক্রিয় করে ক্ষমতা ভোগ করা যায় - এমন স্বপ্ন দেখা। ডি.এইচ লরেন্স তাঁর ড্রীমস কবিতায় বলেন,"All people dream, but not equally." সত্যি ই তাই।তবে রাজনৈতিক ব্যক্তিগণের দেশ-সমাজ ভেদে স্বপ্ন ও ইচ্ছা অনেকটাই এক হওয়া উচিত। সাধারণ মানুষের স্বপ্ন ভিন্ন হলেও রাজনীতিবিদদের স্বপ্ন হওয়া উচিত জনকল্যাণ, দেশের কল্যাণ এবং সমৃদ্ধির জন্য স্বপ্ন।
কিন্তু এটা হয়তো আমার
দিবাস্বপ্ন ই রয়ে যাবে।
ল্যাংস্টোন হিউজ তাঁর ড্রীমস
কবিতায় বলেন,"Hold fast to
dream,For if dreams die.Life is a broken winged bird,that can not fly."যার বাংলা অর্থ,"
স্বপ্নকে আঁকড়ে ধরো,কেননা স্বপ্ন
মরে গেলে জীবন হবে
ডানা ভাঙা পাখির মতো
যা পারবে না উড়তে।" সম্ভবত
এখানে ই কবিরা সফল।তাঁরা
স্বপ্ন দেখান এবং আমাদেরকে বাঁচান।আমি
গত আগষ্ট-জুলাইয়ের পরে স্বপ্ন দেখা
ভুলে গেছি! আমার এক বুক
আশা,জুলাই সংগ্রামে সহস্রাধিক তরুণদের রক্ত আর লাশ
সত্যি কি বৃথা গেল?
আমরা বৈষম্যহীন সমাজ গড়তে গিয়ে
আবারও সেই বৈষম্যের পথে,অরাজকতার পথে এগিয়ে চলছি।
১৯৬৩ সালের ২৮ আগষ্ট আমেরিকার ওয়াশিংটন ডিসিতে সেই বক্তব্যে কিং জুনিয়র আরও বলেন," আমার একটি স্বপ্ন আছে যে,একদিন এই জাতি জেগে উঠবে এবং ধর্মীয় বিশ্বাসের সঠিক অর্থ বুঝতে পারবে;স্বতঃপ্রমাণের জন্য আমরা এই সত্যগুলোকে সমুন্নত রাখি যে সব মানুষ ই সমান ভাবে সত্য।" তিনি বহু বছর আগে যে স্বপ্ন দেখে গেছেন তা আজও বাংলাদেশের অনেকের স্বপ্ন কিন্তু আমরা ধর্মীয় বিশ্বাসের নিগূঢ় মানে বুঝি না আর সব মানুষ সত্যের চেয়ে বড় এবং সমান -এটা বুঝি কিন্তু মানি না।আমরা রাজনীতি করার সময়,সংবিধান প্রণয়ন করার সময় একটা দল ও গোষ্ঠীকে নিজেদের স্বার্থে বাহিরে রাখি,বঞ্চিত করে রাখি আর বিভিন্ন সমাবেশে কাজী নজরুল ইসলামের কণ্ঠে গাইতে থাকি " গাহি সাম্যের গান,মানুষের চেয়ে বড় কিছু নয়,নহে কেউ মহীয়ান।" কিন্তু দুর্ভাগ্য জনক সত্য এই যে আমরা অপরাধী ও দুর্নীতিবাজ যদি মুক্তিযুদ্ধের লোক হয়,ঘৃণিত লোক হয় তবু তাঁর জন্য রাজনৈতিক সুবিধা রাখি আর বিশেষ বিশেষ চিন্তার মানুষের রাজনৈতিক অধিকার হরণ করি।দোষী,অপরাধী, সন্ত্রাসী, দুর্নীতিবাজ ব্যতিত এই রাষ্ট্রে সকলের নিজ নিজ আদর্শ মতে রাজনীতি করার সাংবিধানিক অধিকার রাখা ই এখন সময়ের দাবি।
সেই বক্তব্যে কিং জুনিয়র আরও বললেন যে,একদিন সাবেক ক্রীতদাসের সন্তান এবং সাবেক ক্রীতদাসের মালিকের সন্তান জর্জিয়ার লাল পর্বতের ওপর ভ্রাতৃত্ববোধের টেবিলে একত্রে বসতে সক্ষম হবে।" আমিও তাঁর মতো স্বপ্ন দেখি যে এই বাংলাদেশে একদিন মুক্তিযোদ্ধা-অমুক্তিযোদ্ধা, মুসলিম-অমুসলিম,ধর্মীয় চিন্তার মানুষ -মুক্ত চিন্তার মানুষ,ধনী-গরিব সকলে একত্রে বসে রাজনীতি করার সুযোগ পাবে এবং দেশের কল্যাণে ই তাঁরা একে অপরের সমালোচনা করবে,সহযোগিতা করবে। কিং জুনিয়র সেই ঐতিহাসিক বক্তব্যে আরও বলেন," আমার একদিন স্বপ্ন আছে যে,একদিন প্রত্যেক উপত্যকা উন্নত হবে,প্রতিটি পাহাড়-পর্বত অবনত হবে,দুর্গম জায়গাগুলো সমতল হবে এবং বাঁকা জায়গাগুলো সোজা হবে,সৃষ্টিকর্তার মহিমা প্রকাশ পাবে এবং সব মানুষ তা এক সাথে দেখবে।"
এমন আশা আজ আমার, আপনার সবার ই কিন্তু আমরা ট্যানেলের শেষের আলোর বিন্দুও মনে হয় দেখতে পারছি না।তবু দেখবো,তবু স্বপ্নের কথা বলবো কারণ স্বপ্নহীন মানুষ ডানাহীন পাখির মতো; উড়তে পারে না।আমি স্বপ্ন নিয়ে উড়তে চাই এবং দেখতে চাই একদিন পারিবারিক পরিচয় নয়,জনকের বংশ নয়,ঘোষকের বংশ নয় বরং নেতৃত্বের গুণে গুণান্বিত একটা দল,শ্রেণি,গোষ্ঠী সকলকে নিয়ে এ দেশ শাসনের জন্য এগিয়ে আসবে আর এটাই হবে আমার স্বপ্নের সত্য রূপ।কেউ স্বার্থগত দ্বন্দ্বে কিম্বা সংখ্যার দোহায় দিয়ে আমরা বঞ্চিত করবো না,বৈষম্যের সৃষ্টি করবো না।আজ প্রয়াত গায়ক ফকির আলমগীরের মতো গাইতে ইচ্ছে করে,
"চাষাদের, মুটেদের,
মজুরের
চাষাদের,
মুটেদের, মজুরের
গরিবের
নিঃস্বের ফকিরের
আমার
এ দেশ ....
সব
মানুষের,
সব
মানুষের
সব
মানুষের
ছোটদের
বড়দের সকলের
ছোটদের
বড়দের সকলের
গরিবের
নিঃস্বের ফকিরের।"
তবেই
তো সকলে দেখতে পাবে
" এমন দেশটি কোথাও খুঁজে পাবে না কো
তুমি,
সকল
দেশের রানি সে যে
আমার জন্মভূমি" এর বাস্তব রূপ।মার্টিন
কিং জুনিয়রের মতো আমার এ
স্বপ্নও একদিন পূর্ণ হবে ইনশাআল্লাহ।
আকাশজমিন/আরআর