সিরাজগঞ্জ প্রতিনিধি / : 228
রেজাউল করিম ঝন্টু, সিরাজগঞ্জ
সিরাজগঞ্জের শাহজাদপুররে ৯ গ্রাম, তীব্র নদীভাঙ্গনে বিলিনের পথে, আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছেন নদী পাড়ের মানুষ। টানা বৃষ্টি আর উজান থেকে নেমে আশা পাহাড়ি ঢলের কারণে যমুনা নদীতে হু হু করে বাড়ছে পানি। করতোয়া, ফুলজোড় ও হুরাসাগরসহ অন্যান্য নদীর পানিও বাড়তে শুরু করেছে।
ফলে, শুরু হয়েছে তীব্র নদীভাঙ্গন। প্রতিদিনই ফসলি জমি, বাড়ি ঘরসহ বিভিন্ন স্থাপনা নদীগর্ভে চলে যাচ্ছে। দ্রুত পানি বাড়ার কারণে নদীভাঙ্গনে বিলীন হওয়ার পথে সিরাজগঞ্জ সদরসহ শাহজাদপুর উপজেলার ৯টি গ্রাম। ভাঙ্গনের হুমকির মুখে আছে মসজিদ, মাদ্রাসা ও বিদ্যালয়সহ অনেক স্থাপনা। দ্রুত ব্যবস্থা না নিলে যেকোনো সময় বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়ার আশঙ্কা করছেন স্থানীয়রা। আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছেন নদী পাড়ের মানুষ।
জানা গেছে, দুই সপ্তাহের বেশি সময় ধরে সিরাজগঞ্জ সদর উপজেলার খোকশাবাড়ি ইউনিয়নের ভাটপিয়ারী এবং শাহজাদপুরের সোনাতনী ইউনিয়নের মাকড়া, ধীতপুর, কুড়সী, বারপাখিরা, বড় চামতারা ও বানতিয়ার, গালা ইউনিয়নের বৃ-হাতকোড়া, মোহনপুর গ্রাম ও কৈজুড়ি ইউনিয়নের চর-ঠুটিয়া গ্রামে তীব্র ভাঙ্গন দেখা দিয়েছে। ইতোমধ্যে এসব গ্রামের অধিকাংশ ঘর-বাড়ি, ফসলি জমি, মসজিদ, মাদ্রাসা ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। সোনাতনী ইউনিয়নের ধীতপুর গ্রামের কৃষক কালু মোল্লা (৭৫) বলেন১৯৮৮ সাল থেকে সোনাতনী ইউনিয়নে বিভিন্ন গ্রামে নদীভাঙ্গন চলছে।
এ পর্যন্ত ১১ বার ভাঙ্গনের কবলে পরেছি। ভাঙ্গনে বাড়ি ঘর ও ফসলি জমি নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যাওয়ায় নিঃস্ব হয়ে পড়েছি। সব হারিয়ে অন্যের জমি ভাড়া নিয়ে ঘর তুলে পরিবার নিয়ে বাস করছি। এ চরের জমিতে পটল, বেগুন, ধান, বাদাম, মাসকলাই, বাঙ্গি, সবজি, ধনিয়াসহ সব ধরনের ফসলের ভালো ফলন হয়। এসব ফসল ফলিয়ে ভালোই দিন কাটছিল আমাদের।
কিন্তু,
এসব জমি ও ভিটা ভাঙ্গনের মুখে পড়েছে। এ ভিটা ভেঙ্গে গেলে কোথায় গিয়ে আশ্রয় নেব, কী
খাব, তা নিয়ে খুবই দুশ্চিন্তায় পড়েছি। কৃষক ফজর আলী আক্ষেপ করে বলেন, নদীভঙ্গনে ভাঙতে
ভাঙতে সব শেষ হয়ে গেলেও সরকার কোনো ব্যবস্থাই নিচ্ছে না। আমরা যুবক থেকে বুড়ো হয়ে গেছি,
ভাঙ্গন রোধে শুধুই আশ্বাস পেয়েছি, কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। কুড়সি গ্রামের মাওলানা
নজরুল ইসলাম বলেন, সোনাতনী ইউনিয়নের মাটি সোনার মতোই উর্বর।
এখানে
যে ফসলই বোনা হয় ব্যাপক ফলন হয়। যমুনা নদীর ভাঙ্গনে গরুর হাট, মসজিদ, মাদ্রাসা, বাড়ি,
ফসলি জমি সবই হারিয়ে যাচ্ছে। এতে চরের মানুষগুলো দিশেহারা হয়ে পড়ছেন। ভাঙ্গন রোধে সরকার
দ্রুত ব্যবস্থা না নিলে ইউনিয়নটি মানচিত্র থেকেই হারিয়ে যাবে। মনোয়ারা বেগম (৬৫) বলেন,
আমার জীবদ্দশায় ১৪ বার নদীভাঙ্গনের শিকার হয়ে বর্তমানে নিঃস্ব। অন্যের জমিতে ঘর তুলে
বসবাস করছি। ভাঙতে ভাঙতে সেই ঘরের পাশে চলে এসেছে আগ্রাসী যমুনা নদী। এবার ভাঙলে কোথাও
যাওয়ার জায়গা নেই। পরিবার নিয়ে কোথায় থাকব, সেটা ভেবেই দিন-রাত পার করছি।মনোয়ারা বেগমের
মতো ধীতপুর গ্রামের অসংখ্য মানুষ নদীভাঙ্গনের আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছেন।
স্থানীয়রা
জানান, গত এক বছরে সোনাতনী ইউনিয়নের শ্রীপুর থেকে বারোপাখিয়া পর্যন্ত পাঁচ-ছয়টি গ্রামের
তিন শতাধিক বাড়ি যমুনা নদীতে চলে গেছে। ভাঙন রোধে এখানে দ্রুত বাঁধ নির্মাণের দাবি
জানিয়েছেন তারা। সিরাজগঞ্জ সদর উপজেলার ভাটপিয়ারী গ্রামের আমজাদ আলী, আব্দুল হামিদ,
হাবিবুর রহমানসহ কয়েকজন কৃষক বলেন, যমুনার ভাঙনে ভাটপিয়ারী গ্রামের পুরোটাই নদীগর্ভে
চলে গেছে।
দফায় দফায় বাড়ি-ঘর ভেঙে এখানকার কৃষকরা ওয়াপদা’র
পাশে আশ্রয় নিয়ে বসবাস করছেন। কয়েক সপ্তাহ ধরে চলা ভাঙ্গনে কৃষকরা আতঙ্কে আছেন। ইতোমধ্যে
বেশকিছু কৃষিজমি নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। ভাঙ্গন রোধ না হলে শিক্ষা ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানসহ
শতাধিক বাড়ি নদীগর্ভে বিলীন হবে।
শাহজাদপুর
উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) কামরুজ্জামান বলেন, নদীতে পানি বৃদ্ধির ফলে সোনাতনী
ইউনিয়নসহ চরাঞ্চলের বেশ কয়েকটি গ্রামে ভাঙ্গন দেখা দিয়েছে। ভাঙ্গনকবলিত এলাকাগুলো পরিদর্শন
করে ক্ষতিগ্রস্তদের পুনর্বাসনের ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
সিরাজগঞ্জ
পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. মোখলেসুর রহমান বলেন, সদর ও শাহজাদপুর উপজেলায়
ভাঙ্গন দেখা দিয়েছে। ভাঙ্গন এলাকা পরিদর্শনসহ সেখানে জিও ব্যাগ ফেলা হচ্ছে। আশা করছি,
কোনো সমস্যা হবে না। চরাঞ্চলের উন্নয়নে একটি প্রকল্প চালু হওয়ার কথা রয়েছে, প্রকল্পটি
চালু হলে এ বিষয়ে ব্যবস্থা নেওয়া যাবে।
আকাশজমিন/আরআর