ঢাকা, বাংলাদেশ ।
  রবিবার, ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬,  ২৯ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম :
এমপিও শিক্ষকদের নির্বাচন ভাগ্য নির্ধারণ করবে ইসি: মীর শাহে আলম সরকারি কেনাকাটায় পুকুরচুরি ঠেকাতে আসছে অভিন্ন একক দরতালিকা সাগর-রুনি হত্যার বিচার চেয়ে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে লিখিত অভিযোগ তারুণ্য না অভিজ্ঞতা: ছাত্রদলের নতুন নেতৃত্ব চয়নে জটিল হিসাব-নিকাশ আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধের প্রজ্ঞাপন চ্যালেঞ্জের রিট খারিজ হাইকোর্টে ইন্দোনেশিয়ায় ২৪০ যাত্রী নিয়ে জাহাজ নিখোঁজ ঠাকুরগাঁও সীমান্তে বিএসএফের গুলিতে বাংলাদেশি নিহত, আটক ২ কমলা হ্যারিসের বাড়িতে অনধিকার প্রবেশের চেষ্টা, পুলিশি নিরাপত্তা জোরদার রাজধানীতে সকালের বৃষ্টিতে সড়কে ভোগান্তি, ঝোড়ো হাওয়ার পূর্বাভাস ইয়েমেনে ফের তীব্র সংঘাত, ১২৯টি হামলার দাবি হুথিদের

তরুণ বেকারত্ব: বাংলাদেশের বড় চ্যালেঞ্জ


তরুণ বেকারত্ব: বাংলাদেশের বড় চ্যালেঞ্জ

  • আপলোড সময় : সোমবার ২০ অক্টোবর, ২০২৫ সময় : ৯:৫২ পিএম

রফিকুল ইসলাম রাজুঃ

বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম দ্রুতবর্ধনশীল অর্থনীতির দেশ। পোশাক শিল্প, প্রবাসী আয়, কৃষি উৎপাদন এবং সেবা খাতের সম্প্রসারণের ফলে অর্থনীতিতে দৃশ্যমান সাফল্য এসেছে। কিন্তু এই উন্নয়নের ভেতরেও এক ভয়াবহ বাস্তবতা ক্রমশ স্পষ্ট হচ্ছেতরুণ বেকারত্বের সংকট। দেশের তরুণরা শিক্ষিত, দক্ষ উদ্যমী হলেও উপযুক্ত কর্মসংস্থানের অভাবে হতাশায় ভুগছে।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস)-এর তথ্য অনুযায়ী, দেশে বর্তমানে মোট বেকার জনসংখ্যা প্রায় ২৭ লাখ, যার মধ্যে অধিকাংশই ১৫ থেকে ২৯ বছর বয়সী তরুণ। শ্রমশক্তির মোট সংখ্যার প্রায় ১১ শতাংশ এখনো কাজহীন। এদের মধ্যে বড় অংশ উচ্চশিক্ষিত, যারা বিশ্ববিদ্যালয় বা কলেজ থেকে ডিগ্রি অর্জনের পরও কাজ পাচ্ছে না।

শিক্ষিত তরুণদের বেকারত্ব: এক কঠিন বাস্তবতা

শিক্ষিত তরুণদের মধ্যে বেকারত্বের হার সবচেয়ে বেশি। বিবিএস-এর শ্রমশক্তি জরিপ অনুযায়ী, বিশ্ববিদ্যালয় ডিগ্রিধারী যুবকদের মধ্যে বেকারত্বের হার ১২ থেকে ১৮ শতাংশ পর্যন্ত। অনেকেই একাধিকবার চাকরির পরীক্ষায় অংশ নিচ্ছে, কিন্তু কাঙ্ক্ষিত চাকরি পাচ্ছে না। সরকারি চাকরির সংখ্যা সীমিত, আর বেসরকারি খাতে সুযোগ থাকলেও সেখানে দক্ষতার ঘাটতি বেতন কাঠামোর অসামঞ্জস্য বড় প্রতিবন্ধকতা।

বাংলাদেশে প্রতিবছর প্রায় ২০ লাখ নতুন কর্মশক্তি শ্রমবাজারে প্রবেশ করছে, কিন্তু নতুন চাকরি তৈরি হচ্ছে গড়ে মাত্র ১২ থেকে ১৪ লাখ। ফলে প্রতি বছরই নতুন করে অন্তত থেকে লাখ তরুণ বেকার থেকে যাচ্ছে।

কাঠামোগত দুর্বলতা দক্ষতার অভাব

বাংলাদেশের শ্রমবাজারে চাহিদা যোগানের মধ্যে বিশাল ফারাক। অনেক তরুণ উচ্চশিক্ষিত হলেও বাজার-চাহিদাভিত্তিক দক্ষতা অর্জন করতে পারে না। বিশেষ করে প্রযুক্তি, তথ্যপ্রযুক্তি (আইটি), ডিজিটাল মার্কেটিং, রোবোটিকস কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা খাতে দক্ষ জনশক্তির চাহিদা থাকলেও এই বিষয়ে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত তরুণের সংখ্যা সীমিত।

বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজ (বিআইডিএস)-এর এক গবেষণায় বলা হয়েছে, বেকার তরুণদের প্রায় ৬৫ শতাংশই কোনো কারিগরি বা পেশাগত প্রশিক্ষণ নেয়নি। অপরদিকে, নিয়োগদাতারা বলছেন, “চাকরিপ্রার্থীদের মধ্যে তাত্ত্বিক জ্ঞান থাকলেও বাস্তব কর্মদক্ষতা নেতৃত্বগুণের অভাব রয়েছে।

আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারে প্রতিযোগিতা

বাংলাদেশ বিশ্বের অন্যতম শ্রম রপ্তানিকারক দেশ। বর্তমানে প্রায় এক কোটি প্রবাসী কর্মী বিভিন্ন দেশে কাজ করছে। তবে সাম্প্রতিক সময়ে আন্তর্জাতিক বাজারে দক্ষ কর্মীর চাহিদা বাড়লেও বাংলাদেশ থেকে পাঠানো অধিকাংশ কর্মী এখনো স্বল্পদক্ষ।

এর ফলে একদিকে বিদেশে উচ্চ আয়ের সুযোগ হারানো হচ্ছে, অন্যদিকে অভ্যন্তরীণ শ্রমবাজারে শিক্ষিত বেকারদের সংখ্যা বাড়ছে। ফিলিপাইন ভিয়েতনামের মতো দেশগুলো যেভাবে তথ্যপ্রযুক্তি, হেলথকেয়ার বা আতিথেয়তা খাতে দক্ষ কর্মী পাঠিয়ে বিপুল বৈদেশিক আয় করছে, বাংলাদেশ এখনো সে পর্যায়ে পৌঁছাতে পারেনি।

 বেসরকারি খাতের সীমাবদ্ধতা

বাংলাদেশের শিল্প খাত এখনো শ্রমনির্ভর। উচ্চপ্রযুক্তি, গবেষণা বা উদ্ভাবনীভিত্তিক শিল্পের সংখ্যা খুবই কম। বেসরকারি খাতে উদ্যোক্তা উন্নয়ন এবং বিনিয়োগে এখনও প্রশাসনিক জটিলতা, করের চাপ অবকাঠামোগত দুর্বলতা বড় সমস্যা।

অন্যদিকে, অনেক তরুণ উদ্যোক্তা হওয়ার আগ্রহী হলেও প্রয়োজনীয় অর্থায়ন নীতিগত সহায়তার অভাবে ব্যবসা শুরু করতে পারছে না। ব্যাংক ঋণ প্রক্রিয়া জটিল, স্টার্টআপ ইকোসিস্টেম এখনো প্রাথমিক পর্যায়ে।

নারীদের বেকারত্বের বিশেষ চ্যালেঞ্জ

নারী শিক্ষার হার বাড়লেও কর্মসংস্থানে তাদের অংশগ্রহণ এখনো তুলনামূলকভাবে কম। বিশেষ করে শহুরে শিক্ষিত নারীদের মধ্যে বেকারত্বের হার পুরুষের তুলনায় বেশি। সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি, নিরাপত্তাহীনতা পারিবারিক চাপের কারণে অনেক নারী চাকরির বাজার থেকে পিছিয়ে পড়ছেন। বিশেষজ্ঞদের মতে, যদি নারীদের কর্মসংস্থান নিশ্চিত করা যায়, তবে দেশের জিডিপি কমপক্ষে . শতাংশ পর্যন্ত বাড়তে পারে।

তরুণ বেকারত্বের সামাজিক প্রভাব

বেকারত্ব শুধু অর্থনৈতিক নয়, সামাজিক সংকটও বটে। দীর্ঘদিন চাকরি না পেয়ে অনেক তরুণ হতাশায় ভোগে, মানসিক অস্থিরতা সামাজিক বিচ্ছিন্নতা তৈরি হয়। এতে অপরাধ, মাদকাসক্তি, অনলাইন প্রতারণা উগ্রবাদে জড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি বাড়ে। একই সঙ্গে পারিবারিক চাপও তৈরি হয়সন্তান শিক্ষিত হয়েও কাজ না পেলে বাবা-মায়ের হতাশা বাড়ে, সামাজিক অসমতা গভীর হয়।

 সমাধানের পথ: করণীয় নীতিগত পদক্ষেপ

বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, তরুণ বেকারত্ব মোকাবিলায় সরকার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বেসরকারি খাতকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে। নিচে কয়েকটি প্রস্তাবনামূলক করণীয় উল্লেখ করা হলো

কারিগরি পেশাগত প্রশিক্ষণ সম্প্রসারণদেশের প্রতিটি জেলায় দক্ষতা উন্নয়ন ইনস্টিটিউট গড়ে তোলা এবং আধুনিক প্রযুক্তি শিক্ষায় বিনিয়োগ বাড়ানো জরুরি।

শিক্ষা শিল্পখাতের সংযোগ বৃদ্ধি: বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে চাকরিমুখী পাঠ্যক্রম চালু করতে হবে যাতে স্নাতকরা বাস্তব বাজারের চাহিদা অনুযায়ী প্রস্তুত হতে পারে।

উদ্যোক্তা উন্নয়ন তহবিল গঠন: তরুণদের ক্ষুদ্র উদ্যোগে বিনিয়োগে সহজ শর্তে ঋণ কর ছাড় সুবিধা দিতে হবে।

নারী কর্মসংস্থানে বিশেষ সহায়তা: নিরাপদ কর্মপরিবেশ, মাতৃত্বকালীন সুবিধা ফ্লেক্সিবল কর্মঘণ্টা নিশ্চিত করতে হবে।

ডিজিটাল ফ্রিল্যান্সিং খাতের প্রসার: আইটি প্রশিক্ষণ আন্তর্জাতিক ক্লায়েন্ট অর্জনের জন্য সরকারি সহায়তা জোরদার করতে হবে।

বাংলাদেশের উন্নয়নযাত্রা তরুণদের হাত ধরেই সম্ভব। কিন্তু যদি এই বিশাল যুবশক্তি বেকার থেকে যায়, তাহলে উন্নয়ন টেকসই হবে না। সরকার সমাজ উভয়েরই উচিত তরুণদের সম্ভাবনাকে কাজে লাগানো। শিক্ষিত বেকারত্ব দূরীকরণ শুধু কর্মসংস্থানের বিষয় নয়, এটি একটি জাতির ভবিষ্যতের প্রশ্ন।

আকাশজমিন / আরআর

 

Tags :


এ সম্পর্কিত আরো খবর