অনলাইন ডেস্ক
একটি ভার্চ্যুয়াল হলোগ্রাম যদি কোনো দেশের মন্ত্রী হয়ে যায়—বিষয়টি শুনলে মনে হতে পারে কোনো সায়েন্স ফিকশন মুভির গল্প। কিন্তু এবার সেটিই ঘটেছে বাস্তবে। ইউরোপের ছোট্ট দেশ আলবেনিয়া এমন এক ইতিহাস গড়েছে, যা গোটা বিশ্বে আলোচনার ঝড় তুলেছে। মানুষের পরিবর্তে এবার কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ভিত্তিক একটি ভার্চ্যুয়াল বটকে মন্ত্রীর দায়িত্ব দিয়েছে দেশটি। নতুন এই মন্ত্রীর নাম ‘ডিয়েলা’ (Diella), আলবেনীয় ভাষায় যার অর্থ ‘সূর্যের নারী রূপ’।
আলবেনিয়ার প্রধানমন্ত্রী এদি রামা, যিনি এ বছর মে মাসের নির্বাচনে চতুর্থবারের মতো বিজয়ী হন, নির্বাচনের চার মাসের মধ্যেই ২০২৫ সালের ১১ সেপ্টেম্বর বৃহস্পতিবার ডিয়েলাকে মন্ত্রিসভার সদস্য হিসেবে আনুষ্ঠানিকভাবে পরিচয় করিয়ে দেন। তবে এটি বাস্তব মন্ত্রিত্ব নয়, বরং একটি প্রতীকী ও নীতিনির্ধারণী পদক্ষেপ।
সংবিধান অনুযায়ী, আলবেনিয়ায় মন্ত্রী হতে হলে ন্যূনতম ১৮ বছর বয়সী ও মানসিকভাবে সুস্থ নাগরিক হতে হয়। ফলে, এআই বট ডিয়েলা বাস্তবিক অর্থে মন্ত্রী না হলেও, সরকারি প্রশাসনের কাজে এটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
কেন মানুষের বদলে এআই মন্ত্রী?
বিশ্বের প্রায় সব দেশেই সরকারি কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে প্রায়শই অভিযোগ ওঠে—তারা নাকি ‘হৃদয়হীন’ বা ‘অনুভূতিহীন’। কিন্তু আলবেনিয়া এই অভিযোগকেই ইতিবাচকভাবে কাজে লাগিয়েছে। তারা এমন একটি এআই সিস্টেমকে মন্ত্রিসভায় যুক্ত করেছে, যার মধ্যে কোনো ব্যক্তিগত আবেগ, লোভ বা পক্ষপাতিত্ব নেই।
প্রধানমন্ত্রী এদি রামার মূল উদ্দেশ্য হলো—দুর্নীতিমুক্ত প্রশাসন গঠন। তাঁর ভাষায়, “ডিয়েলার মতো এআই সিস্টেমের কোনো ব্যক্তিগত স্বার্থ নেই, নেই অর্থ বা ক্ষমতার প্রতি আকর্ষণ। এটি কেবল বিদ্যুৎ ব্যবহার করে কাজ করে, তাই ঘুষ, দুর্নীতি বা গোপন তথ্য ফাঁসের আশঙ্কা নেই।” রামা আরও জানান, এই এআই মডেল মূলত দেশের সরকারি ক্রয় ও পাবলিক টেন্ডার প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করবে। এ কাজে তারা আন্তর্জাতিক এক বিশেষজ্ঞ দলের সঙ্গে কাজ করছেন, যারা সরকারি কেনাকাটার জন্য বিশ্বের প্রথম পূর্ণাঙ্গ এআই মডেল তৈরি করছে।
ডিয়েলার আগের অভিজ্ঞতা
মন্ত্রী হওয়ার আগে থেকেই ডিয়েলা আলবেনিয়ার প্রশাসনে যুক্ত ছিল। এটি ‘ই-আলবেনিয়া’ নামের সরকারি প্ল্যাটফর্মে ভার্চ্যুয়াল সহকারী হিসেবে কাজ করেছে। সাধারণ নাগরিকদের বিভিন্ন সরকারি কাগজপত্র জমা দেওয়া, আবেদন ফরম পূরণ ও ডিজিটাল সেবা পাওয়ার প্রক্রিয়ায় সাহায্য করেছে এই চ্যাটবট।
এ পর্যন্ত ডিয়েলা ১০ লাখের বেশি আবেদনপত্র প্রক্রিয়াকরণে সহযোগিতা করেছে। ফলে সরকারের ভেতর-বাহিরের ডেটা ব্যবস্থাপনা সম্পর্কে এর ভালো ধারণা রয়েছে। এবার মন্ত্রীর দায়িত্ব পেয়ে ডিয়েলা আরও বড় পরিসরে ডিজিটাল স্বচ্ছতা, দ্রুত সেবা ও দুর্নীতিবিরোধী কার্যক্রমে ভূমিকা রাখবে।
প্রতিক্রিয়া ও বিতর্ক
ডিয়েলাকে মন্ত্রী ঘোষণার পর আলবেনিয়া জুড়ে দেখা গেছে মিশ্র প্রতিক্রিয়া। একদল নাগরিক ও বিরোধীদল একে “অসাংবিধানিক” ও “রাজনৈতিক কৌশল” বলে দাবি করেছেন। তাদের মতে, একটি রোবট কখনোই জনগণের প্রতিনিধিত্ব করতে পারে না। তবে প্রযুক্তি ও অর্থনৈতিক বিশেষজ্ঞদের মতে, বিষয়টি “আলবেনিয়ার জন্য যুগান্তকারী”। তারা বলছেন, “দুর্নীতির মতো দীর্ঘদিনের সমস্যা মোকাবেলায় প্রযুক্তি যদি সমাধান দিতে পারে, তবে এটি নিঃসন্দেহে সাহসী পদক্ষেপ।”
অর্থনীতিবিদরা আরও বলেন, এই এআই মডেল যদি সরকারি কার্যক্রমে স্বচ্ছতা আনে এবং নাগরিকদের আস্থা তৈরি করে, তাহলে এটি অন্যান্য দেশগুলোর জন্যও অনুকরণীয় উদাহরণ হয়ে উঠবে।
ভবিষ্যতের দিকনির্দেশনা
আলবেনিয়ার প্রধানমন্ত্রী আশা প্রকাশ করেছেন, এআই মন্ত্রী ডিয়েলার মাধ্যমে দেশটি ২০২৭ সালের মধ্যে ইউরোপীয় ইউনিয়নে যোগদানের প্রস্তুতি আরও সুসংহত করতে পারবে। তাঁর মতে, “এই এআই মডেল কেবল প্রশাসনিক স্বচ্ছতা নয়, বরং আলবেনিয়ার অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও প্রযুক্তি নির্ভর সমাজ গঠনের নতুন দরজা খুলে দেবে।”
তবে প্রশ্ন রয়ে যায়—
একটি ‘হৃদয়হীন’ মেশিন কি সত্যিই মানুষের কল্যাণে কাজ করতে পারবে? নাকি এটি কেবলই ভবিষ্যতের রাজনীতির এক প্রদর্শনী?
যে যেভাবেই ভাবুক, একটি বিষয় স্পষ্ট— আলবেনিয়া ভবিষ্যতের রাজনীতি ও প্রযুক্তির এমন এক সংযোগ ঘটিয়েছে, যেখানে বাস্তবতা ও কল্পনার সীমারেখা ক্রমেই মুছে যাচ্ছে। সূত্র: রয়টার্স, বিবিসি, এনবিসি নিউজ
আকাশজমিন / আরজে