আন্তর্জাতিক ডেস্ক
ভারতের নতুন পাঠ্যপুস্তকে মোগল সম্রাট আকবর ও মহিশূরের শাসক টিপু সুলতানের নাম থেকে ‘গ্রেট’ শব্দটি বাদ দেওয়ায় দেশজুড়ে বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। বিষয়টি কেন্দ্রীয় সরকারের রাজনৈতিক নীতিকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে এবং প্রধান বিরোধী দল কংগ্রেস ও ক্ষমতাসীন বিজেপির মধ্যে তীব্র উত্তেজনা তৈরি করেছে।
এই বছর ভারতের জাতীয় শিক্ষাবিষয়ক গবেষণা ও প্রশিক্ষণ কাউন্সিল (এনসিইআরটি) নতুন পাঠ্যপুস্তক ছাপিয়েছে। সেই পাঠ্যপুস্তকে আকবর ও টিপু সুলতানের নাম থেকে ‘গ্রেট’ পদবি সরানো হয়েছে। কংগ্রেস নেতারা অভিযোগ করেছেন, বর্তমান বিজেপি সরকার দেশের ইতিহাসকে নিজেদের রাজনৈতিক মতাদর্শের সঙ্গে মেলাতে গিয়ে ইতিহাসকে সংকুচিত করছে। তারা বলছেন, এটি বিশেষ করে মোগল আমলের শাসকদের প্রতি সরকারের রাজনৈতিক বিরাগকে নির্দেশ করে।
অন্যদিকে, বিজেপি এবং রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘ (আরএসএস) দাবি করেছে, দীর্ঘদিন ধরে যে সংশোধনের প্রয়োজন ছিল, এই পদক্ষেপ তারই অংশ। এনসিইআরটির নতুন পাঠ্যপুস্তকগুলো ভারতজুড়ে ২৪ হাজারের বেশি মাধ্যমিক স্কুলে (সিবিএসই) বিতরণ করা হয়েছে।
কংগ্রেসের সংসদ সদস্য ইমরান মাসুদ বলেছেন, আকবর ও টিপু সুলতানরা একদিনের শাসক ছিলেন না; তারা দীর্ঘ সময় দেশের শাসন করেছেন। তিনি বলেন, পদবি সরানো বা যোগ করার মাধ্যমে ইতিহাসের কোনো মৌলিক পরিবর্তন আনা সম্ভব নয়। আকবর ও টিপু সুলতানের শাসনামলে ভারতের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি এবং জিডিপি উল্লেখযোগ্য ছিল। তিনি আরও বলেন, ব্রিটিশ শাসনের সময় অনেক মোগল বংশধরেরা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিলেন।
কংগ্রেস নেতা কে মুরালিধরন বলেন, আকবর ছিলেন সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির রাজা, আর টিপু সুলতান ইংরেজদের বিরুদ্ধে লড়াই করেছেন। কেন্দ্রীয় সরকারের পদক্ষেপ তাদের ইতিহাসের প্রতি অন্যায় আচরণ। উত্তরাখণ্ড কংগ্রেসের নেতা হরিশ রাওয়াত মনে করেন, পাঠ্যপুস্তক থেকে পদবিগুলো বাদ দেওয়া বৃহত্তর পরিকল্পনার অংশ। তিনি সতর্ক করেছেন, বিজেপি আরও অনেক কিছু বাদ দিতে পারে।
এছাড়া, পাঠ্যপুস্তক থেকে ২০০২ সালের গুজরাটের সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা এবং ১৯৯২ সালে বাবরি মসজিদ ভাঙার ইতিহাসও বাদ দেওয়া হয়েছে। বিষয়গুলো নরেন্দ্র মোদির সরকারের জন্য রাজনৈতিকভাবে সংবেদনশীল। কংগ্রেস নেতা রাওয়াত ২০২৯ সালের জাতীয় নির্বাচনকে একটি গুরুত্বপূর্ণ সময় হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
আরএসএস নেতা সুনীল আম্বেকর বলেন, ইতিহাসের পাঠ্যপুস্তকে ইতিবাচক পরিবর্তন আনা হয়েছে। আকবর ও টিপু সুলতানদের পদবি বাদ দেওয়া হলেও তারা শিক্ষার্থীদের পড়াশোনার অংশ। শিক্ষার্থীদের তাদের কঠোর কাজসমূহ সম্পর্কেও জানানো প্রয়োজন। ভবিষ্যতে পাঠ্যপুস্তকে আরও পরিবর্তন আনা হবে।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ভারতে পাঠ্যপুস্তকে মোগল আমল, স্বাধীনতা সংগ্রাম, সাম্প্রদায়িক সংঘাত এবং বৈজ্ঞানিক অবদানসহ বিভিন্ন বিষয় পুনর্বিবেচনা ও সংশোধন করা হয়েছে। এনসিইআরটি জানিয়েছে, কোভিড-১৯-এর পর শিক্ষার্থীদের ওপর চাপ কমাতে অতিরিক্ত এবং অপ্রাসঙ্গিক বিষয়গুলো বাদ দেওয়া হয়েছে। এর সঙ্গে পাঠ্যপুস্তকের মান কমার কোনো সম্পর্ক নেই।
কিন্তু বিরোধী দল ও শিক্ষাবিদরা মনে করছেন, গুজরাটের দাঙ্গা, বাবরি মসজিদ ধ্বংস, মহাত্মা গান্ধী হত্যাকাণ্ড, আদিবাসী বিদ্রোহ, দলিত ও মুসলিম সাহিত্যের তথ্য এবং ডারউইনের বিবর্তন তত্ত্বসহ গুরুত্বপূর্ণ ইতিহাস বাদ দেওয়ার ফলে শিক্ষার্থীদের ইতিহাসের সঠিক চিত্র পাওয়া থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।
এই বিতর্ক ভারতের শিক্ষাব্যবস্থা, ইতিহাস শিক্ষা এবং রাজনৈতিক প্রভাব নিয়ে নতুন প্রশ্ন উত্থাপন করেছে। শিক্ষার্থীরা ইতিহাসের মৌলিক তথ্য থেকে বঞ্চিত হচ্ছে এবং এটি শিক্ষার মান ও দেশের ইতিহাস বোঝার ক্ষেত্রে দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলতে পারে।
আকাশজমিন / আরআর