বিশ্বব্যাপী বিমান চলাচলে বড় ধরনের বিঘ্ন ঘটার শঙ্কা দেখা দিয়েছে এয়ারবাসের ছয় হাজার বিমানের সফটওয়্যার আপডেটের নির্দেশনা জারির পর। সৌর বিকিরণের প্রভাবে বিমানের নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থায় ত্রুটি দেখা দিতে পারে—এমন আশঙ্কা থেকেই এ নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছে কোম্পানিটি। বিশেষভাবে তাদের জনপ্রিয় এ৩২০ সিরিজের বিমানের সফটওয়্যার দ্রুত আপডেট করার কথা বলা হয়েছে।
ঘটনার পেছনে যে কারণটি মূলত উদ্বেগ বাড়িয়েছে, তা ঘটেছিল গত অক্টোবর মাসে। জেটব্লু এয়ারক্রাফটের মেক্সিকো থেকে যুক্তরাষ্ট্রগামী একটি বিমান উড়ন্ত অবস্থায় হঠাৎ নিচে নেমে যায়। জরুরি পরিস্থিতিতে বিমানটি নিরাপদে অবতরণ করলেও তাৎক্ষণিকভাবে কারণ জানা যায়নি। পরে তদন্তে দেখা যায়, সৌর বিকিরণের প্রভাবে বিমানের কম্পিউটারের একটি গুরুত্বপূর্ণ ডাটা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। এই ডাটা বিমানের উচ্চতা নিয়ন্ত্রণে ব্যবহৃত হয়। ফলে কম্পিউটার ভুল সিগন্যাল পাঠায় এবং বিমান অপ্রত্যাশিতভাবে নিচে নেমে আসে।
তদন্ত প্রতিবেদনের পর এয়ারবাস তৎক্ষণাৎ ব্যাপক নিরাপত্তা পর্যালোচনা শুরু করে। এরপর দ্রুত সমাধান পরিকল্পনা প্রণয়ন করা হয় এবং বিশ্বের বিভিন্ন এয়ারলাইন্সে ব্যবহৃত প্রায় ছয় হাজার বিমানের সফটওয়্যার আপডেটের নির্দেশনা পাঠানো হয়।
এ নির্দেশনার ফলে বহু এয়ারলাইন্স ইতিমধ্যে পূর্বঘোষিত ফ্লাইট বাতিল বা স্থগিত করতে বাধ্য হয়েছে। কারণ প্রতিটি বিমানকে আলাদাভাবে হ্যাঙ্গারে নিয়ে সফটওয়্যার আপডেট করতে হচ্ছে, এবং কখনো কখনো কয়েকটি অতিরিক্ত নিরাপত্তা পরীক্ষা চালাতে হচ্ছে। এর ফলে স্বাভাবিক ফ্লাইট শিডিউলে চাপ সৃষ্টি হয়েছে। আন্তর্জাতিক রুটে যেসব বিমান দৈনিক নিয়মিত চলাচল করে, তাদের ক্ষেত্রেও সময়মতো আপডেট সম্পন্ন করা কঠিন হয়ে পড়েছে।
এয়ারবাস জানিয়েছে, বেশিরভাগ বিমানে সফটওয়্যারটিকে একটি পরীক্ষিত ও নিরাপদ পুরোনো সংস্করণে ফিরিয়ে নিয়ে সমস্যা সমাধান করা সম্ভব হচ্ছে। একটি বিমানের সফটওয়্যার আপডেট করতে গড়ে দুই ঘণ্টা সময় লাগছে। তবে কিছু ক্ষেত্রে হার্ডওয়্যারও পরিবর্তন করতে হতে পারে, যা সময়সাপেক্ষ। কোম্পানির দাবি, হার্ডওয়্যার পরিবর্তনের প্রয়োজন ‘বিরল’, কিন্তু যেসব বিমানের ক্ষেত্রে তা প্রয়োজন হবে, সেসবের জন্য অতিরিক্ত সময় ও প্রযুক্তিগত সহায়তা লাগবে।
বিশ্বব্যাপী যাত্রীদের ওপর এর প্রভাব ইতিমধ্যে দেখা যাচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপ ও মধ্যপ্রাচ্যের কয়েকটি এয়ারলাইন্স যাত্রীদের আগেই সতর্ক করছে যে, ফ্লাইট বাতিল বা বিলম্ব হতে পারে। অনেক দেশ তাদের বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে বিষয়টি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে। প্রযুক্তিগত ত্রুটি সংশোধনের এই প্রক্রিয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হলেও এর প্রভাব বিমান পরিবহন ব্যবস্থার ওপর দীর্ঘমেয়াদে কতটা পড়বে, তা নিয়ে বিশেষজ্ঞরা নানা মত দিয়েছেন।
বিমান নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদের মতে, সৌর বিকিরণজনিত প্রযুক্তিগত ঝুঁকি ভবিষ্যতে আরও বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে পারে। পৃথিবীর চৌম্বকক্ষেত্র দুর্বল হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে এ ধরনের ঘটনা বাড়ার ঝুঁকি রয়েছে বলেও তাঁরা মনে করেন। তবে দ্রুত সিদ্ধান্ত ও প্রযুক্তিগত হস্তক্ষেপ নেওয়ায় তারা এয়ারবাসের উদ্যোগকে প্রয়োজনীয় এবং যথাসময়ে নেওয়া ব্যবস্থা বলে উল্লেখ করেছেন।
এদিকে যাত্রীদের জন্য বিভিন্ন এয়ারলাইন্স বিকল্প তারিখে টিকিট পরিবর্তনের সুযোগ দিচ্ছে। যেসব ফ্লাইট বাতিল হয়েছে, সেসবের ক্ষেত্রে অতিরিক্ত চার্জ ছাড়াই নতুন করে টিকিট ইস্যু করা হচ্ছে। পরিস্থিতি স্বাভাবিক হতে কয়েক দিন সময় লাগতে পারে বলে জানিয়েছে একাধিক আন্তর্জাতিক এয়ারলাইন্স। সূত্র: বিবিসি
আকাশজমিন / আরআর