ঢাকা, বাংলাদেশ ।
  রবিবার, ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬,  ২৯ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম :
রাজনৈতিক দুর্বৃত্তায়ন ও চাঁদাবাজি কঠোর হাতে দমন করা হবে: আইনমন্ত্রী ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের নতুন অধ্যায় চায় বাংলাদেশ: পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী ডেঙ্গুতে আরও ৬ প্রাণহানি, এক দিনে হাসপাতালে ১৫৬১ জন ভর্তি গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করতে স্থানীয় সরকার ব্যবস্থা জোরদার করতে হবে: রাষ্ট্রপতি আসিফ মাহমুদের বিরুদ্ধে ১১ হাজার কোটি টাকা পাচারের অভিযোগ: দুদক ‘বারবার মিথ্যা মামলা না দিয়ে আমাকে একবারে গুলি করে মেরে ফেলেন’ ২১ সেপ্টেম্বর যুক্তরাষ্ট্র সফরে যাচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বাংলাদেশে নতুন গ্যাসক্ষেত্র অনুসন্ধানে বিনিয়োগে আগ্রহী মার্কিন কোম্পানি শেভরন পাবনায় ডিবির ওসির প্রত্যাহারে সাংবাদিকদের ২৪ ঘণ্টার আলটিমেটাম গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠায় শক্তিশালী স্থানীয় সরকারের বিকল্প নেই: ড. আবদুল মঈন খান

আসিম মুনির: পাকিস্তানের নতুন ফিল্ড মার্শাল ও ‘সুলতান’


ফিল্ড মার্শাল সৈয়দ আসিম মুনির

  • আপলোড সময় : বুধবার ০৩ ডিসেম্বর, ২০২৫ সময় : ৪:৪৮ পিএম

আসিম মুনির: পাকিস্তানের নতুন ‘সুলতান’

পাকিস্তানের সামরিক ইতিহাসে ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনির একটি নতুন অধ্যায় শুরু করেছেন। ৫৭ বছর বয়সী এই সেনা কর্মকর্তা বর্তমানে পাকিস্তানের সামরিক শক্তির সবকটি শাখার ওপর নিয়ন্ত্রণ ও তত্ত্বাবধানে রয়েছেন। দেশটির সংবিধানের ২৭তম সংশোধনীর মাধ্যমে তিনি কার্যত আইনের ঊর্ধ্বে উঠে আজীবনের জন্য সুসংহত ক্ষমতা পেয়েছেন।

আসিম মুনির সেনাপ্রধান থেকে চিফ অফ ডিফেন্স ফোর্সেস (সশস্ত্র বাহিনীর প্রধান) হয়েছেন, যা আগে পাকিস্তানে কখনও ছিল না। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তাকে ‘প্রিয় বন্ধু’ হিসেবে বিবেচনা করেন, চীনের প্রেসিডেন্ট সি চিন পিং তাকে ‘আয়রন ব্রাদার’ বলেন। অন্যদিকে, ভারতের চোখে তিনি ‘সবচেয়ে বড় হুমকি’, এবং আফগান তালেবানের কাছে ‘এক নম্বর শত্রু’।

জন্ম ও শৈশব

১৯৬৮ সালে রাওয়ালপিন্ডিতে মুসলিম সম্ভ্রান্ত পরিবারে জন্ম আসিম মুনিরের। তাঁর পরিবার ১৯৪৭ সালের ভারত বিভাজনের পর পাঞ্জাবের জলন্ধর থেকে পাকিস্তানে আসে এবং প্রথমে টোবা টেক সিংয়ে, পরে রাওয়ালপিন্ডির ধেরি হাসানাবাদে স্থায়ী হয়।

ছোটবেলায় গ্রামীণ পরিবেশে বেড়ে ওঠা আসিম মুনিরের পড়াশোনা হয়েছিল স্থানীয় স্কুলে, যেখানে তিনি ক্রিকেটের প্রতি বিশেষ আগ্রহী ছিলেন। ফাস্ট বোলিংয়ে দক্ষতার পরিচয় দিয়ে তিনি শারীরিক সক্ষমতা ও প্রতিযোগিতামূলক মনোভাব দেখিয়েছিলেন। ধর্মীয় শিক্ষার প্রতি তাঁর আগ্রহও ছিল তীব্র।

তার বাবা সৈয়দ সরওয়ার মুনির ছিলেন রাওয়ালপিন্ডির এফজি টেকনিক্যাল হাইস্কুলের প্রিন্সিপাল এবং একজন ইমাম। এই পারিবারিক পরিবেশে ইসলামি মূল্যবোধ ও শৃঙ্খলা গভীরভাবে রচিত হয়। তাঁর স্ত্রী সৈয়দা ইরুম আসিম ও তিন সন্তান রাওয়ালপিন্ডিতে বসবাস করেন। সামাজিক মাধ্যমে কিছুদিন আগে যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকত্ব গ্রহণের খবর ছড়িয়ে পড়লেও এর সত্যতা যাচাই করা যায়নি।

শিক্ষা ও ক্যারিয়ার

আসিম মুনির প্রাথমিক শিক্ষা পেয়েছেন রাওয়ালপিন্ডির মারকাজ মাদ্রাসা দারুল তাওহিদে। পরে তিনি পাকিস্তান মিলিটারি একাডেমি থেকে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন এবং অসাধারণ কৃতিত্বের জন্য ‘সোর্ড অব অনার’ লাভ করেন।

সেনাপ্রধান হওয়া

২০২২ সালের এপ্রিলে পাকিস্তানের পার্লামেন্টে আস্থা ভোটে ইমরান খান সরকারের পতনের পর সেনাবাহিনীর নিয়ন্ত্রণ আরও দৃঢ় হয়। সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল কামার জাভেদ বাজওয়ার মেয়াদ শেষ হবার পর আসিম মুনিরকে সেনাপ্রধান হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। যুক্তরাষ্ট্রের বিশেষ আগ্রহ ও সমর্থনও ছিল এর পেছনে বড় প্রভাব।

২০২৫ সালের মে মাসে ভারতের সঙ্গে চার দিনের ‘অপারেশন বুনিয়ান উল মারসুস’ সংঘাতের সময় মুনির পাকিস্তানের সামরিক বাহিনী নেতৃত্ব দেন। একই বছরের ২০ মে, পাকিস্তানের ইতিহাসে দ্বিতীয়বারের মতো ফিল্ড মার্শাল পদে উন্নীত হন আসিম মুনির। এই পদ পাকিস্তানে আইয়ুব খানের পর দ্বিতীয়।

ফিল্ড মার্শাল পদ হল পাঁচ তারকা সামরিক পদমর্যাদা, যা সেনাবাহিনীর সর্বোচ্চ ও সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ পদ। এটি সাধারণত ব্যতিক্রমী সামরিক অবদানের জন্য প্রদান করা হয় এবং যুদ্ধকালীন বা বিশেষ প্রয়োজনে ব্যবহৃত হয়।

সংবিধান সংশোধন ও ক্ষমতার বিস্তার

১২ নভেম্বর ২০২৫ পাকিস্তানের জাতীয় সংসদে সংবিধানের ২৪৩ নম্বর ধারা সংশোধনী overwhelmingly পাস হয় এবং প্রেসিডেন্ট আসিফ আলী জারদারি সেটি আইনে পরিণত করেন। এর ফলে মুনির সেনাপ্রধান হিসেবে নৌ ও বিমানবাহিনীরও তত্ত্বাবধান পান।

বিশেষভাবে তার জন্য একটি নতুন পদ তৈরি করা হয়েছে, যা তিন বাহিনীর প্রধানের উপর থেকে ক্ষমতা কেন্দ্রীয় করে দেয়। এই সংশোধনী মুনিরকে আইনি রক্ষাকবচ প্রদান করে, যার ফলে তাঁর বিরুদ্ধে আদালতে মামলা করা প্রায় অসম্ভব।

মুনিরের ফিল্ড মার্শাল পদবি ও পোশাক আজীবনের জন্য। অবসরগ্রহণের পরও তাঁকে দায়িত্ব দেওয়া হতে পারে। এই পদক্ষেপকে অনেকেই পাকিস্তানে সেনাবাহিনীর হাতে রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক ক্ষমতার ব্যাপক হস্তান্তর হিসেবে দেখছেন।

আন্তর্জাতিক সম্পর্ক ও কূটনীতি

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে মুনিরের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে। ২০২৫ সালের জুনে ওভাল অফিসে ট্রাম্পের আমন্ত্রণে মধ্যাহ্নভোজে অংশ নেন মুনির। সেখানে ইরান, চীন ও সন্ত্রাসবিরোধী সহযোগিতার বিষয়ে আলোচনা হয়। ট্রাম্প মুনিরকে ‘বিশ্বাসযোগ্য ও কার্যকর সামরিক অংশীদার’ হিসেবে দেখেন।

চীনের সঙ্গে সামরিক ও কূটনৈতিক সম্পর্ক মুনিরের আমলে দৃঢ় হয়েছে। তিনি ২০২৫ সালে চীন সফর করেন এবং সিপিইসির নিরাপত্তা, ফ্রি ট্রেড চুক্তি এবং আঞ্চলিক সন্ত্রাসবিরোধী উদ্যোগে সমন্বয় করেন।

ভারতের সঙ্গে দ্বন্দ্ব ও কাশ্মীর

২০২৫ সালের সংঘাতের সময় মুনির ভারতের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিয়েছিলেন। সিন্ধু নদীতে বাঁধ নির্মাণ করলে পাকিস্তান ‘কঠোর পদক্ষেপ’ নেবে বলে হুঁশিয়ারি দেন। কাশ্মীর ইস্যুতে পাকিস্তানের স্থায়ী অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করেন এবং দেশকে ‘সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে শেষ দুর্গ’ হিসেবে অভিহিত করেন।

ইমরান খানের সঙ্গে সম্পর্ক

ইমরান খান ও আসিম মুনিরের সম্পর্ক উত্তপ্ত। কারাগারে থাকা সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান মুনিরের বিরুদ্ধে দমনমূলক নীতির অভিযোগ করেন। তিনি ও তার দল পিটিআই-এর কর্মীদের ওপর মুনিরের মানসিক ও শারীরিক অত্যাচারের কথা উল্লেখ করেন।

পাকিস্তানের ভবিষ্যৎ মুনিরের হাতে

২৭তম সংবিধান সংশোধনী মুনিরকে আজীবন ক্ষমতা দিয়েছে এবং অপসারণ প্রায় অসম্ভব করে তুলেছে। এর ফলে পাকিস্তানের রাজনৈতিক, সামরিক ও অর্থনৈতিক ভবিষ্যৎ তার কৌশলগত সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করছে।

বিশ্লেষকরা মনে করেন, মুনির যদি শান্তি ও স্থিতিশীলতার পথে থাকেন, তিনি আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার জন্য ইতিবাচক ভূমিকা পালন করবেন। অন্যদিকে যদি সংঘাত বাড়ান, তাহলে ২০২৫ সালের যুদ্ধ শুধুমাত্র ‘প্রারম্ভিক ট্রেলার’ হিসেবে বিবেচিত হবে।


এ সম্পর্কিত আরো খবর