ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মোঃ নাসিমুল গনি, পিএইচডি, এএফডব্লিউসি, পিএসসি (অব.)
*ভূমিকা*
বাংলাদেশের এক অবিস্মৃত নায়ক ও বিপ্লবী চরিত্র শহীদ শরীফ ওসমান হাদি যাঁর ওপর ১২ ডিসেম্বর হত্যাচেষ্টা চালানো হয় এবং তিনি ১৮ ডিসেম্বর ২০২৫ সালে শহীদ হন। এই লেখা লিখতে লিখতে, যুদ্ধবিধ্বস্ত এক বাংলাদেশ জুলাই বিপ্লবের এই বীরকে গ্রহণ করার অপেক্ষায় রয়েছে। জুলাই বিপ্লবের পর অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস একাধিকবার উল্লেখ করেছেন যে আমরা এখনো যুদ্ধে আছি। অনেকে একই কথা ভিন্ন ভিন্ন ভাষায় প্রতিধ্বনিত করেছেন। হাদি বিপ্লবোত্তর পরিস্থিতি সম্পর্কে আগাম ভবিষ্যদ্বাণী ও প্রচার চালিয়ে গেছেন এবং ইনকিলাব প্ল্যাটফর্ম থেকে ন্যায়বিচার (ইনসাফ) ও বৈচিত্র্যের মধ্যে ঐক্যের পক্ষে সোচ্চার ছিলেন। একদল তরুণ বিপ্লবী নতুন বন্দোবস্ত, পরিবর্তন এবং ভারতীয় আধিপত্যের বিরুদ্ধে একা পথ চলার সিদ্ধান্ত নেয়। এই আত্মত্যাগী দলটিকে নিয়ে মানুষের অনুভূতি ছিল মিশ্র। গতকাল এনসিপি সমন্বয়ক নাহিদ হোসেনও শহীদ হাদি-পরবর্তী বাস্তবতা যথার্থভাবে তুলে ধরেছেন এবং বিপ্লবী যুদ্ধ পরিচালনার ঐক্য ও পদ্ধতির কথা পুনর্ব্যক্ত করেছেন। হাদির মৃত্যু জুলাই বিপ্লবের একটি মোড় ঘোরানো অধ্যায়। জাতীয় নিরাপত্তা নীতি হলো যেকোনো সরকারের একটি আনুষ্ঠানিক দলিল, যেখানে জাতীয় ভূরাজনৈতিক বাধ্যবাধকতা, নিরাপত্তা হুমকি, সরকারের বিভিন্ন সংস্থা ও জনগণের ভূমিকা ও দায়িত্ব নির্ধারিত থাকে। অজ্ঞাত কারণে এখনো আমাদের ঘোষিত কোনো জাতীয় নিরাপত্তা নীতি নেই। এই নীতিতে বর্তমান ভূগোল, রাজনীতি, ভূ-অর্থনীতি, ১৯৭১-এর মুক্তিযুদ্ধের শিক্ষা, পার্বত্য চট্টগ্রামে দীর্ঘস্থায়ী দমনমূলক অভিযান, যুদ্ধ ব্যতীত অন্যান্য অভিযান, অপ্রচলিত ও মানব নিরাপত্তা হুমকি অন্তর্ভুক্ত হওয়া জরুরি। জুলাই বিপ্লব বাংলাদেশের ভূরাজনৈতিক অবস্থান এবং অন্যায়, মানবাধিকার ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের বিরুদ্ধে সংগ্রামের পরিচয় বদলে দিয়েছে।
*বিপ্লবে শহীদ হাদি কী করেছিলেন?
শহীদ হাদি ছিলেন জুলাই বিপ্লবের সম্মুখসারির এক ক্যারিশমাটিক যোদ্ধা, নেতা ও সংগঠক। তিনি বিভিন্ন সময়ে উপরোক্ত সব বিষয়েই কথা বলেছেন। আমরা অনেকেই তাঁর চিন্তা, ধারণা ও দৃঢ় বিশ্বাসকে উপেক্ষা করেছি। বিপ্লবোত্তর সময়ে, যখন পাল্টা-বিপ্লবী কর্মকাণ্ড অনিবার্য, তখন জুলাইয়ের বিপ্লবী যোদ্ধারা গতি হারান। তাদের অনেকেই মুক্তিযুদ্ধের সময় ও পরবর্তী কালে সংঘটিত একই কৌশলগত ভুল পুনরাবৃত্তি করেন। হাদি ও ইনকিলাব প্ল্যাটফর্ম ব্যতিক্রমভাবে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত বিপ্লবের মশাল বহন করে গেছে। তারা নির্দোষ আওয়ামী লীগ সমর্থকসহ সকলকে অন্তর্ভুক্ত করে একটি নতুন বাংলাদেশ ও নতুন ব্যবস্থার কথা বলেছেন। একজন বিপ্লবী হিসেবে তিনি ও তাঁর সহযোদ্ধারা প্রতিশোধ, ঘৃণা ও রক্তপাতের পরিবর্তে ভালোবাসা, ধৈর্য, মানবতা ও ক্ষমার পথ বেছে নিয়েছিলেন। তিনি আমাদের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের আদর্শ ভালোবাসতেন। শুনেছি জাতি তাঁকে নজরুলের কবরের পাশে সমাহিত করে সম্মান জানিয়েছে। এটাই হাদির নতুন বাংলাদেশ।
*অতীতের পর্যালোচনা*
মুক্তিযুদ্ধের সময় ও পরবর্তী কালে প্রবাসী সরকার এবং পরবর্তীতে মুজিব সরকার বিপ্লব ও স্বাধীনতার চেতনা সমুন্নত রাখতে ব্যর্থ হয় এবং একটি বিপ্লবী জাতীয় ঐক্য সরকার গঠন করেনি। ফলে রাজনৈতিক ঐক্য ও ঐতিহাসিক সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংহতি ভেঙে পড়ে। পাল্টা-বিপ্লবী শক্তি সফল হয় এবং মুক্তিযোদ্ধারা পরাজিত হয়। জুলাই বিপ্লব জনগণের আশা ও আকাঙ্ক্ষা জাগিয়েছে। কিন্তু আমরা আবারও একই কৌশলগত ভুল করেছি সংবিধান বাতিল না করে জাতীয় বিপ্লবী ঐক্য সরকার গঠন না করা। এর ফলে প্রশাসন ও রাজনীতি পরিচালনায় নরম ক্ষমতার ব্যবহার, আইনশৃঙ্খলার অবনতি, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক বিভাজন, বিপ্লবীদের হত্যা যার মধ্যে মুখপাত্র ও পরিবর্তনের প্রতীক শহীদ হাদিও অন্তর্ভুক্ত। মাত্র দেড় বছরের মধ্যেই সারা দেশে পাল্টা-বিপ্লবী তৎপরতা ছড়িয়ে পড়েছে। বিপ্লব পরাজয়ের পথে, কারণ বিপ্লবীরা গতি হারিয়েছে এবং তাদের মধ্যে বিভাজন চরমে।
*কেন আমরা এখনো বিপ্লবী যুদ্ধে আছি?*
জুলাই বিপ্লবের পর বাংলাদেশ এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। জাতীয় নিরাপত্তা এখন প্রচলিত ও অপ্রচলিত উভয় হুমকিকেই অন্তর্ভুক্ত করে। সেনাবাহিনী ছাত্র ও জনগণের পাশে থাকায় প্রচলিত হুমকি তেমনভাবে মাথাচাড়া দিতে পারেনি। প্রতিবেশী শক্তিরাও আকস্মিক ধাক্কার কারণে তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া দেখাতে পারেনি। কিন্তু অপ্রচলিত নিরাপত্তা হুমকি ও অপারেটররা শুরু থেকেই পাল্টা-বিপ্লবী তৎপরতা চালাচ্ছে। বিচার বিভাগ, আমলাতন্ত্র, রাজনৈতিক দল, পুলিশ, সামরিক আমলাতন্ত্র, গোয়েন্দা সংস্থা ও ডিপ স্টেটের ভেতরের অপারেটরদের সহায়তায় নীরব আক্রমণ শুরু হয়। অন্তর্বর্তী সরকার প্রয়োজনীয় জাতীয় নিরাপত্তা নীতি কাঠামো দাঁড় করাতে পারেনি। ড. ইউনূস ও অল্প কয়েকজন উপদেষ্টা পাল্টা-বিপ্লব সাময়িকভাবে ঠেকাতে পারলেও মোড় ঘোরাতে পারেননি। রাজনৈতিক শক্তিগুলো ছিল অপরিণত ও বিভক্ত। অনেক তরুণ বিপ্লবী ক্ষমতা, মর্যাদা ও সুবিধার লোভে পড়ে যায়। প্রবীণ রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক নেতৃত্বও বিপ্লবের ধাক্কা সামলাতে ব্যর্থ হয়। এতে নতুন বাংলাদেশের পথ প্রায় বন্ধ হয়ে যায়।
*দেশের বর্তমান পরিবেশ*
পর্যাপ্ত প্রস্তুতি, প্রশিক্ষণ, নির্বাচন বাস্তবায়ন পদ্ধতি ও পূর্ণ আইনশৃঙ্খলা ছাড়া নির্বাচন ঘোষণা জাতীয় নিরাপত্তার জন্য হুমকি। পুলিশ, বিচার বিভাগ ও প্রশাসনের বিশ্বাসযোগ্যতা প্রশ্নবিদ্ধ। অস্ত্র চোরাচালান, কালো টাকার ব্যবহার, নির্বাচন কমিশনের প্রতি অনাস্থা, স্বৈরাচারের সমর্থক ও ডিপ স্টেট অপারেটরদের উপস্থিতি সবই বিপজ্জনক। শেখ হাসিনার বিচার অসম্পূর্ণ, ভারত কর্তৃক তাঁর প্রত্যাবর্তন না হওয়া এসব সার্বভৌমত্বের জন্য হুমকি। কোনো অবস্থাতেই নিরাপদ ও সমতাভিত্তিক নির্বাচন নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। তাড়াহুড়ো সিদ্ধান্ত দেশকে অরাজকতায় ঠেলে দিতে পারে। ড. ইউনূস সরকারের অর্জিত স্থিতিশীলতা দ্রুত হারিয়ে যেতে পারে। ক্ষমতা হস্তান্তরের অতিরিক্ত তাড়াহুড়ো জাতির সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।
*সুপারিশসমূহ*
১. অবিলম্বে জাতীয় বিপ্লবী ঐক্য সরকার গঠন
২. সংসদ নির্বাচনের আগে দ্রুততম সময়ে জাতীয় নিরাপত্তা নীতি প্রণয়ন
৩. নির্বাচন কমিশনের মাধ্যমে নির্বাচন ব্যবস্থার ফরেনসিক অডিট
৪. ফেব্রুয়ারি ২০২৬-এ জুলাই চার্টার ও ঘোষণার অনুমোদন ভোট
৫. শেখ হাসিনা ও হাদি হত্যাকারীদের ফিরিয়ে আনতে কূটনৈতিক তৎপরতা
৬. দীর্ঘমেয়াদি হাইব্রিড যুদ্ধবিরোধী জাতীয় অভিযান
৭. সব রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনের সংবিধানে আধিপত্যবিরোধী দর্শন অন্তর্ভুক্তি
৮. এক বছরব্যাপী জাতীয় জুলাই বিপ্লব প্রচারণা
৯. শহীদ হাদিকে সর্বোচ্চ বেসামরিক বীরত্ব পদক প্রদান ও শিক্ষাক্রমে অন্তর্ভুক্তি
১০. শহীদ হাদির ভাষণ অনুবাদ করে বিশ্বব্যাপী প্রচার
*উপসংহার*
ভারতের সংসদীয় কমিটির সদস্য শশী কাপুর সম্প্রতি জুলাই বিপ্লবের পর ভারতের কৌশল পরিবর্তনের কথা বলেছেন। বাংলাদেশের নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জ ও জাতীয় নিরাপত্তা নীতি প্রণয়ন অত্যন্ত জরুরি। অন্যথায় পাল্টা-বিপ্লবী শক্তি বিজয়ী হবে। শহীদ হাদি ও অন্যান্য শহীদের আত্মত্যাগ বৃথা যেতে দেওয়া যায় না। নতুন বাংলাদেশের জন্য তাঁদের ত্যাগ রক্ষা করা আমাদের নৈতিক দায়িত্ব।
ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মোঃ নাসিমুল গনি, পিএইচডি, এএফডব্লিউসি, পিএসসি (অব.)
লেখক ও সমসাময়িক ভূরাজনীতি পর্যবেক্ষক