ঢাকা, বাংলাদেশ ।
  রবিবার, ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬,  ২৯ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম :
রাজনৈতিক দুর্বৃত্তায়ন ও চাঁদাবাজি কঠোর হাতে দমন করা হবে: আইনমন্ত্রী ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের নতুন অধ্যায় চায় বাংলাদেশ: পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী ডেঙ্গুতে আরও ৬ প্রাণহানি, এক দিনে হাসপাতালে ১৫৬১ জন ভর্তি গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করতে স্থানীয় সরকার ব্যবস্থা জোরদার করতে হবে: রাষ্ট্রপতি আসিফ মাহমুদের বিরুদ্ধে ১১ হাজার কোটি টাকা পাচারের অভিযোগ: দুদক ‘বারবার মিথ্যা মামলা না দিয়ে আমাকে একবারে গুলি করে মেরে ফেলেন’ ২১ সেপ্টেম্বর যুক্তরাষ্ট্র সফরে যাচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বাংলাদেশে নতুন গ্যাসক্ষেত্র অনুসন্ধানে বিনিয়োগে আগ্রহী মার্কিন কোম্পানি শেভরন পাবনায় ডিবির ওসির প্রত্যাহারে সাংবাদিকদের ২৪ ঘণ্টার আলটিমেটাম গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠায় শক্তিশালী স্থানীয় সরকারের বিকল্প নেই: ড. আবদুল মঈন খান

সেন্ট মার্টিনের জীবনবৈচিত্র্য রক্ষায় মহাপরিকল্পনা

চার কিলোমিটারে সীমিত হবে পর্যটক চলাচল


  • আপলোড সময় : রবিবার ১১ জানুয়ারী, ২০২৬ সময় : ৪:০৭ পিএম

অনলাইন রিপোর্টার

অতিরিক্ত পর্যটকের চাপে দেশের একমাত্র প্রবালদ্বীপ সেন্ট মার্টিন সংকটে পড়ে। হারিয়ে যাওয়া জীববৈচিত্র্য পুনরুদ্ধারে সরকার নিয়ন্ত্রিত পর্যটন কার্যক্রম চালুর উদ্যোগ নিয়েছে। সংরক্ষণের জন্য প্রস্তুত করা খসড়া মহাপরিকল্পনায় দ্বীপের মাত্র চার কিলোমিটারের মধ্যে পর্যটকদের চলাচল সীমিত করার প্রস্তাব করা হয়েছে।

পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে পর্যটকের সংখ্যা নির্দিষ্ট করার আগে সেন্ট মার্টিনে রাতযাপনকারী পর্যটকের সংখ্যা ছিল ৭ হাজার ১৯৩। এটি দ্বীপের ধারণক্ষমতার দ্বিগুণ। অতিরিক্ত পর্যটন ও নৌযানের দূষণ এবং সৈকতে আবর্জনা বৃদ্ধির কারণে প্রবালের অস্তিত্ব হুমকির মুখে।

২০২০ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমুদ্রবিজ্ঞান ও ভূতত্ত্ব বিভাগের এক গবেষণায় দেখা যায়, ১৯৮০ থেকে ২০১৮ সালের মধ্যে সেন্ট মার্টিন দ্বীপে প্রবাল প্রজাতির সংখ্যা ১৪১ থেকে কমে ৪০টি। আন্তর্জাতিক Ocean Science Journal-এ প্রকাশিত ২০২০ সালের গবেষণা অনুযায়ী, ২০৪৫ সালের মধ্যে দ্বীপটি পুরোপুরি প্রবালশূন্য হতে পারে।

মহাপরিকল্পনায় দ্বীপকে আট বর্গকিলোমিটার এলাকা হিসেবে চারটি জোনে ভাগ করার প্রস্তাব রাখা হয়েছে। প্রথম জোন ‘সাধারণ ব্যবহার এলাকা’ নামে পরিচিত। এই জোনে পর্যটকদের রাতযাপন এবং হোটেল ও রিসোর্ট থাকবে। মহাপরিকল্পনায় বলা হয়েছে, প্রতিদিন সর্বোচ্চ ৯০০ জন পর্যটক এখানে থাকতে পারবেন। সাতটি পাড়া নিয়ে গঠিত জোন-১ পর্যটক ও সাধারণ অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের জন্য উন্মুক্ত হলেও, সৈকতে যানবাহন চালানো, রাতে আলো জ্বালানো, প্রবাল সংগ্রহ ও দূষণ নিষিদ্ধ থাকবে।

দ্বিতীয় জোন ‘নিয়ন্ত্রিত সম্পদ এলাকা’। দক্ষিণ অংশের সংবেদনশীল এলাকায় এটি বাফার জোন হিসেবে কাজ করবে। এই এলাকায় পর্যটন অবকাঠামো, কৃষিতে ক্ষতিকর রাসায়নিক ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞা থাকবে। সৈকতে আগুন জ্বালানো ও রান্নাবান্নাও নিষিদ্ধ।

তৃতীয় জোন ‘টেকসই ব্যবস্থাপনা অঞ্চল’ হিসেবে ঘোষণা করা হবে। জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণে এই এলাকা সর্বোচ্চ প্রাধান্য পাবে। এখানে বসতি স্থাপন, অবকাঠামো নির্মাণ বা পরিবেশ বিনষ্ট হওয়ার মতো কার্যক্রম নিষিদ্ধ থাকবে। বিশেষ সুরক্ষার আওতায় থাকবে ম্যানগ্রোভ, ল্যাগুন ও কচ্ছপের প্রজনন স্থান।

চতুর্থ জোন ছেঁড়াদিয়া দ্বীপ সংলগ্ন এলাকা। অনুমোদিত ব্যক্তি ছাড়া সাধারণ মানুষের প্রবেশ নিয়ন্ত্রিত থাকবে। এক কিলোমিটারের মধ্যে মাছ ধরা, দূষণ এবং বন্য প্রাণীকে বিরক্ত করা নিষিদ্ধ থাকবে।

মহাপরিকল্পনায় বলা হয়েছে, প্রতি পাঁচ বছর পরপর দ্বীপের পরিবেশ সংরক্ষণ পরিস্থিতি বিবেচনা করে পর্যটকের সংখ্যা বৃদ্ধি করা যেতে পারে।

সেন্টার ফর এনভায়রনমেন্টাল অ্যান্ড জিওগ্রাফিক ইনফরমেশন সার্ভিসেস (সিইজিআইস)-এর জ্যেষ্ঠ গবেষক এইচ এম নুরুল ইসলাম জানান, জোনিং করা হয়েছে দ্বীপ ব্যবস্থাপনার সুবিধার্থে। জোন-১-এ সব হোটেল ও রিসোর্ট থাকবে। অন্য তিন জোনে থাকা হোটেল ও রিসোর্টকে জোন-১-এ স্থানান্তর করা হবে। প্রয়োজনে সরকার ক্ষতিপূরণ দেবে। পর্যটকরা অন্য তিন জোনে দিনে ঘুরতে পারবে, কিন্তু রাতযাপন শুধুমাত্র জোন-১-এ করতে হবে।

পর্যটকরা জোন-৪-এ ৫০০ থেকে ১০০০ মিটার দূরত্ব থেকে ছেঁড়াদিয়া দ্বীপ দেখতে পারবেন, তবে দ্বীপে অবতরণ করা যাবে না। মহাপরিকল্পনা ১০ বছরের মেয়াদি। প্রথম পাঁচ বছরে কার্যক্রম বাস্তবায়ন হবে। ব্যয় ধরা হয়েছে ৫৫ কোটি টাকা। পরবর্তী পাঁচ বছরে পদক্ষেপগুলোর পর্যবেক্ষণ ও ব্যবস্থাপনা করা হবে।

সেন্ট মার্টিনে ১ হাজার ৪৪৫টি পরিবার বসবাস করে। মোট জনসংখ্যা ৯ হাজার ৮৮৫। প্রতিটি পরিবারের গড় সদস্যসংখ্যা ৬.৮৪। আয়ের প্রধান উৎস মাছ ধরা (৬১%) ও পর্যটন (৩১%)। মাসিক গড় আয় ৬ হাজার ৪৪৮ টাকা। দ্বীপের ৭০% মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে বসবাস করে।

পর্যটন ও মাছ ধরা নিয়ন্ত্রিত হলে আয়ের ওপর প্রভাব পড়বে। অক্টোবর থেকে মার্চ পর্যটন মৌসুম। দ্বীপে ১০৯টি হোটেল ও রিসোর্ট আছে।

পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান বলেন, সেন্ট মার্টিন রক্ষার জন্য নিয়ন্ত্রিত পর্যটন ছাড়া বিকল্প নেই। স্থানীয় জনগোষ্ঠীকেন্দ্রিক পর্যটন এবং বিকল্প কর্মসংস্থান নিশ্চিত করতে মৎস্য ও কৃষি মন্ত্রণালয় প্রকল্প হাতে নেবে। বাংলাদেশ সরকারের জলবায়ু তহবিল থেকেও প্রকল্প গ্রহণ করা হয়েছে।

মহাপরিকল্পনায় বলা হয়েছে, গত ১৮ বছরে সবুজ আচ্ছাদিত এলাকা ২৩.৮% কমেছে, কৃষিজমি ৭.৮% কমেছে। পর্যটন অবকাঠামো ২০০৫ সালে ৪৫.২৬ হেক্টর থেকে ২০২৩ সালে ৮৬.১৩ হেক্টরে বৃদ্ধি পেয়েছে। ম্যানগ্রোভ বন কমেছে ৩%। কৃষিজমি ধীরে ধীরে কমছে, যা পরিবেশগত চ্যালেঞ্জ সৃষ্টি করছে।

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ওশানোগ্রাফিক বিভাগের অধ্যাপক মোহাম্মদ মোসলেম উদ্দিন বলেন, মাস্টারপ্ল্যান দীর্ঘমেয়াদি ফলাফল অর্জনের জন্য তৈরি করা হয়েছে। আন্তর্জাতিক কনভেনশন ও জাতিসংঘের নির্দেশনার সঙ্গে সমন্বয় করে সেন্ট মার্টিন সংরক্ষণ করা হচ্ছে। তিনি উদাহরণ দিয়েছেন, ভারতের লাকসার দ্বীপে পর্যটক নিষিদ্ধ করা হয়েছে।

তিনি বলেন, স্থানীয় জনগোষ্ঠীকে সম্পৃক্ত করলে মাস্টারপ্ল্যানের লক্ষ্য অর্জন সহজ হবে। সেন্ট মার্টিনের সংরক্ষণে স্থানীয় অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা গুরুত্বপূর্ণ।

 

 

 


এ সম্পর্কিত আরো খবর