ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বগুড়া-২ (শিবগঞ্জ) আসনে নাগরিক ঐক্যের সভাপতি ও মনোনীত প্রার্থী মাহমুদুর রহমান মান্নার প্রার্থিতা ঢাকায় আপিলের মাধ্যমে ফিরে পাওয়ার মধ্য দিয়ে নির্বাচনী রাজনীতিতে নতুন করে আলোচনার সৃষ্টি হয়েছে। নির্বাচন কমিশন তার মনোনয়ন বৈধ ঘোষণা করার পর রোববার বিকেলে দেওয়া প্রতিক্রিয়ায় তিনি বলেন, বগুড়ায় কোন এক পার্থী তার বিরুদ্ধে করা ষড়যন্ত্র শেষ পর্যন্ত টেকেনি। আল্লাহর ওপর পূর্ণ ভরসার কথা উল্লেখ করে তিনি জানান, শুরু থেকেই তার বিশ্বাস ছিল—এই অন্যায় সিদ্ধান্ত টিকে থাকবে না। প্রার্থিতা ফিরে পাওয়াকে তিনি শুধু ব্যক্তিগত বিজয় নয়, বরং গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার জয় হিসেবে দেখছেন। তার ভাষায়, মনোনয়ন যাচাইয়ের উদ্দেশ্য কাউকে নির্বাচন থেকে বাদ দেওয়া নয়, বরং আইনি কাঠামোর মধ্যে থেকে ন্যায়সংগত সুযোগ নিশ্চিত করা। তার এই প্রত্যাবর্তন বগুড়া-২ আসনের নির্বাচনী সমীকরণে নতুন মাত্রা যোগ করেছে। একই সঙ্গে এটি নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা ও গণতন্ত্রে ন্যায়বিচারের গুরুত্ব নিয়ে নতুন করে আলোচনা তৈরি করেছে।
তিনি বলেন, মনোনয়ন যাচাই-বাছাইয়ের উদ্দেশ্য কখনোই কাউকে বাদ দেওয়া নয়। বরং কোথাও ভুলত্রুটি থাকলে তা সংশোধনের সুযোগ দেওয়াই এর মূল লক্ষ্য। আইন অনুযায়ী মনোনয়নপত্রে কোনো ত্রুটি থাকলে তাৎক্ষণিকভাবে সংশোধন কিংবা নির্ধারিত সময় দিয়ে তা ঠিক করার সুযোগ রয়েছে। এমনকি হলফনামায় ভুল থাকলেও সম্পূরক হলফনামা দাখিলের বিধান রয়েছে। অথচ সেই সুযোগ না দিয়েই যেভাবে মনোনয়ন বাতিলের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল, তা স্বাভাবিক কোনো প্রক্রিয়ার অংশ ছিল না।
মাহমুদুর রহমান মান্না বলেন, আমি আগেও বগুড়া থেকে নির্বাচন করেছি। এবারও একই আসন থেকে নির্বাচনে অংশ নিচ্ছি। অথচ আমাকে প্রতিযোগিতা থেকে বাদ দিতে যে কূটকৌশল নেওয়া হয়েছিল, তা অত্যন্ত অশুভ ইঙ্গিত বহন করে। বিষয়টি যখন জটিল আকার ধারণ করে, তখন জেলা প্রশাসন বিষয়টি নির্বাচন কমিশনের কাছে পাঠায়। না হলে মনোনয়ন বাতিল হওয়ার কোনো যৌক্তিক কারণ ছিল না।
তিনি বলেন, রক্ত দিয়ে, জীবন দিয়ে আমরা যে অধিকারের জন্য সংগ্রাম করেছি, সেই গণতন্ত্রকে যদি ব্যঙ্গ করার মতো ঘটনা ঘটতে থাকে, তাহলে দুঃখ প্রকাশ ছাড়া কিছুই করার থাকে না। ক্ষমতা অর্জনের জন্য এ ধরনের পথ কখনোই গণতন্ত্রের পথ হতে পারে না। দল বা ব্যক্তি যত বড়ই হোক না কেন, সমগ্র রাষ্ট্র ও জনগণের কাছে সবাই ছোট। এই মানসিকতা না থাকলে গণতন্ত্র কার্যকর হয় না।
ব্যাংক ঋণসংক্রান্ত অভিযোগ প্রসঙ্গে মাহমুদুর রহমান মান্না বলেন, আমার বিরুদ্ধে খেলাপি হওয়ার যে অভিযোগ তোলা হয়েছিল, তা সম্পূর্ণ মিথ্যা এবং ভিত্তিহীন। ইসলামী ব্যাংকের বগুড়া বড়গোলা শাখার এক কর্মকর্তার মাধ্যমে একটি ভুয়া নোটিশ তৈরি করা হয়েছিল। বিষয়টি জানতে পারার পর ওই কর্মকর্তা নিজেই ইসলামী ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। পরে সংশ্লিষ্ট ওই ব্যাংক কর্মকর্তাকে শাস্তিমূলকভাবে স্ট্যান্ড রিলিজ ও ট্রান্সফার করা হয়। দুঃখজনক বিষয় হলো, এ সংক্রান্ত তথ্য গণমাধ্যমে সেভাবে প্রকাশ পায়নি।
তিনি বলেন, রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা থাকবে—এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু কোমরের নিচে আঘাত করে কাউকে হারানোর চেষ্টা রাজনীতি নয়। ষড়যন্ত্র করে কখনো টেকসই বিজয় অর্জন করা যায় না। গণতন্ত্রের লড়াই দীর্ঘস্থায়ী হলে শেষ পর্যন্ত ষড়যন্ত্র টিকে না। আজকের নির্বাচন কমিশনের সিদ্ধান্তই তার বাস্তব প্রমাণ।
নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা প্রসঙ্গে সন্তোষ প্রকাশ করে মাহমুদুর রহমান মান্না বলেন, নির্বাচন কমিশন অন্তর্ভুক্তিমূলক রাজনীতির পক্ষে অবস্থান নিয়েছে। প্রতিপক্ষকে বাদ দিয়েই বিজয় অর্জনের মানসিকতা গণতন্ত্রকে রুদ্ধ করে দেয়। তবে প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে আমার কিছু শঙ্কা রয়েছে। পুলিশ এখন পর্যন্ত সক্রিয় বা প্রোঅ্যাকটিভ ভূমিকা পালন করছে না। অনেক জায়গায় নীরবতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে, যা সুষ্ঠু নির্বাচনের পরিবেশের জন্য আশঙ্কাজনক।
বিএনপির সমর্থন প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এখনো তাদের মনোনয়ন দেওয়া প্রার্থী মনোনয়ন প্রত্যাহার করেননি। তবে আমি আশা প্রকাশ করি, যেহেতু আমাকে আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা দেওয়া হয়েছিল, সেক্ষেত্রে মনোনয়ন প্রত্যাহার করাই স্বাভাবিক নিয়ম হবে। গণতান্ত্রিক শিষ্টাচার অনুযায়ী সেটাই প্রত্যাশিত।
তিনি আরও বলেন, এই নির্বাচন শুধু একটি আসনের লড়াই নয়, এটি গণতন্ত্র, ন্যায়বিচার ও রাজনৈতিক নৈতিকতার পরীক্ষাও বটে। জনগণই শেষ পর্যন্ত সিদ্ধান্ত নেবে, কারা গণতন্ত্রের পক্ষে আর কারা ষড়যন্ত্রের পথে হাঁটছে। আমি বিশ্বাস করি, জনগণ সত্য ও ন্যায়ের পক্ষেই থাকবে।
আকাশজমিন / আরআর