আন্তর্জাতিক ডেস্ক
ইরানে ভয়াবহ অর্থনৈতিক সংকটকে কেন্দ্র করে শুরু হওয়া সরকারবিরোধী বিক্ষোভ গত দুই সপ্তাহে রূপ নিয়েছে নজিরবিহীন সহিংসতায়। দেশটির বিভিন্ন শহরে আইনশৃঙ্খলাবাহিনীর সঙ্গে বিক্ষোভকারীদের সংঘর্ষে এখন পর্যন্ত অন্তত ১৯২ জন নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছেন আরও হাজার হাজার মানুষ। নরওয়ে-ভিত্তিক ইরানি মানবাধিকার সংস্থা ইরান হিউম্যান রাইটসের (আইএইচআর) সর্বশেষ হালনাগাদ প্রতিবেদনে এই ভয়াবহ চিত্র উঠে এসেছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি, মূল্যস্ফীতি, কর্মসংস্থানের সংকট ও সরকারের অর্থনৈতিক নীতির বিরুদ্ধে শুরু হওয়া এই আন্দোলন ক্রমেই সহিংস রূপ ধারণ করছে। প্রথমদিকে সীমিত পরিসরে শুরু হলেও বর্তমানে এটি ইরানের ইতিহাসে অন্যতম বড় সরকারবিরোধী বিক্ষোভে পরিণত হয়েছে। এর আগে সংস্থাটি জানিয়েছিল, বিক্ষোভে ৫১ জন নিহত হয়েছেন। তবে সাম্প্রতিক যাচাই-বাছাই শেষে নিহতের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৯২ জনে।
ইরান হিউম্যান রাইটস জানিয়েছে, নিহতদের অধিকাংশই সাধারণ বিক্ষোভকারী। আইনশৃঙ্খলাবাহিনীর গুলিতে, মারধরে কিংবা সংঘর্ষে তারা প্রাণ হারিয়েছেন। সংস্থাটি আরও সতর্ক করে বলেছে, সাম্প্রতিক কয়েক দিন ধরে ইরানে ইন্টারনেট সংযোগ ব্যাপকভাবে সীমিত থাকায় তথ্য সংগ্রহ ও যাচাই ব্যাহত হচ্ছে। ফলে প্রকৃত নিহতের সংখ্যা আরও বেশি হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
এদিকে, ইরানের সরকার বিক্ষোভের পেছনে বিদেশি শক্তির উসকানি ও মদদের অভিযোগ তুলেছে। সরকারি ভাষ্য অনুযায়ী, বাইরের শক্তির সমর্থনে বিভিন্ন গোষ্ঠী দেশের ভেতরে দাঙ্গা সৃষ্টি করছে। এই অভিযোগের পর আইনশৃঙ্খলাবাহিনী কঠোর অবস্থানে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছে। রোববার দেশটির জাতীয় পুলিশ জানিয়েছে, রাজধানী তেহরানসহ বিভিন্ন এলাকায় কয়েকশ বিক্ষোভকারীকে আটক করা হয়েছে।
রাষ্ট্রায়ত্ত গণমাধ্যমে প্রচারিত খবরে বলা হয়েছে, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে নিরাপত্তা বাহিনীকে সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থানে রাখা হয়েছে। একই সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা ও সরকারি ভবনের নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে। কোথাও কোথাও সেনাবাহিনী ও বিপ্লবী গার্ড বাহিনীকেও মোতায়েন করা হয়েছে বলে বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে।
চলমান পরিস্থিতির মধ্যে ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান রোববার রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে জাতির উদ্দেশে বক্তব্য দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন। রাষ্ট্রায়ত্ত টেলিভিশনের খবরে বলা হয়েছে, তিনি দেশের অর্থনৈতিক সংকট, সরকারের পরিকল্পনা এবং জনগণের দাবির বিষয়ে বিস্তারিত কথা বলবেন। ভর্তুকি ব্যবস্থার সংস্কারসহ সরকারের প্রধান অর্থনৈতিক পরিকল্পনার বর্তমান অবস্থা তুলে ধরবেন তিনি।
রাষ্ট্রায়ত্ত সম্প্রচারমাধ্যম আইআরআইবি জানিয়েছে, জাতীয় গণমাধ্যমের সঙ্গে এক কথোপকথনে প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান সাম্প্রতিক ঘটনাবলি নিয়ে সরকারের অবস্থান ব্যাখ্যা করেছেন। একই সঙ্গে জনগণের ক্ষোভ ও দাবি কীভাবে মোকাবিলা করা হবে, সে বিষয়েও দিকনির্দেশনা দিয়েছেন। সাক্ষাৎকারটি রোববার পরে সম্প্রচার করা হবে বলে জানানো হয়েছে।
অন্যদিকে, ইরানে চলমান সরকারবিরোধী আন্দোলন আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও ব্যাপক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেছে। ইসরায়েলের পররাষ্ট্রমন্ত্রী গিদিওন সার দাবি করেছেন, ইরানে নজিরবিহীন এই বিক্ষোভ দমনে দেশটির বিপ্লবী গার্ড বাহিনী ব্যাপক ও কঠোর অভিযান শুরু করেছে। তিনি ইউরোপীয় ইউনিয়নের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেছেন, ইরানের বিপ্লবী গার্ড বাহিনীকে সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে তালিকাভুক্ত করার এখনই সময়।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে গিদিওন সার জানান, সফররত জার্মানির স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আলেক্সান্ডার ডোব্রিন্টকে তিনি বিষয়টি অবহিত করেছেন। তার মতে, ইউরোপীয় ইউনিয়নের উচিত দ্রুত সিদ্ধান্ত নিয়ে বিপ্লবী গার্ড বাহিনীকে সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে ঘোষণা করা।
বিশ্লেষকদের মতে, ইরানের চলমান অস্থিরতা শুধু অভ্যন্তরীণ রাজনীতি নয়, বরং মধ্যপ্রাচ্যের সামগ্রিক নিরাপত্তা পরিস্থিতিকেও প্রভাবিত করতে পারে। অর্থনৈতিক সংকট থেকে জন্ম নেওয়া এই বিক্ষোভ এখন রাজনৈতিক রূপ নিচ্ছে, যা সরকার ও জনগণের মধ্যকার দূরত্ব আরও বাড়িয়ে তুলছে।
মানবাধিকার সংস্থাগুলো বারবার সংযম প্রদর্শনের আহ্বান জানালেও মাঠপর্যায়ে সহিংসতা থামার কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। বরং সময়ের সঙ্গে সঙ্গে হতাহতের সংখ্যা বাড়ছে এবং পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠছে। ইন্টারনেট বন্ধ, গণগ্রেপ্তার ও কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থার মধ্যেও বিক্ষোভ থামছে না, যা ইরানের ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ সৃষ্টি করছে।
সূত্র: এএফপি
আকাশজমিন / আরআর