প্রায় এক দশক পর মিয়ানমারের ধর্মীয় সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠী রোহিঙ্গাদের গণহত্যা মামলার শুনানি শুরু হচ্ছে জাতিসংঘের আন্তর্জাতিক আদালত ইন্টারন্যাশনাল কোর্ট অব জাস্টিস (আইসিজি)-তে। এই আদালতকে সাধারণত ‘বৈশ্বিক আদালত’ বা ওয়ার্ল্ড কোর্ট হিসেবে অভিহিত করা হয়।
মামলার শুনানি শুরু হয়েছে নেদারল্যান্ডসের হেগ শহরে, সোমবার স্থানীয় সময় বেলা ১০টা থেকে (বাংলাদেশ সময় বেলা ৩টা)। এই শুনানি তিন সপ্তাহ ধরে চলবে।
জাতিসংঘের আদালতে রোহিঙ্গা গণহত্যা মামলাটি নথিভুক্ত করা হয়, যা তদন্ত করেছে ‘ইউএন ইন্ডিপেন্ডেন্ট ইনভেস্টিগেটিভ মেকানিজম ফর মিয়ানমার’। এই দলের প্রধান নিকোলাস কৌমজিয়ান বার্তাসংস্থা রয়টার্সকে তথ্য নিশ্চিত করেছেন।
২০১৭ সালের জুলাইয়ে বাংলাদেশের সীমান্তবর্তী মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যের কয়েকটি পুলিশ স্টেশন ও সেনা ছাউনিতে বোমা হামলার ঘটনা ঘটে। মিয়ানমারের সরকার সশস্ত্র রোহিঙ্গা গোষ্ঠী আরাকান স্যালভেশন আর্মি (আরসা)-কে এই হামলার জন্য দায়ী করে। এই ঘটনার জের ধরে মিয়ানমারের সেনাবাহিনী ওই মাসে সীমান্তবর্তী রোহিঙ্গা গ্রামগুলোতে অভিযান চালায়।
সেনা অভিযানের নামে সাধারণ রোহিঙ্গাদের ওপর হত্যাযজ্ঞ, ধর্ষণ, লুটপাট এবং অগ্নিসংযোগ চালানো হয়। এর ফলে লাখ লাখ রোহিঙ্গা নিরাপত্তা খুঁজতে সীমান্ত পাড়ি দিয়ে বাংলাদেশসহ আশপাশের বিভিন্ন দেশে পালাতে শুরু করে। বাংলাদেশ সরকারের হিসাব অনুযায়ী, প্রায় ১০ লাখ রোহিঙ্গা মিয়ানমার থেকে বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছিলেন। তারা এখনও বাংলাদেশে অবস্থান করছেন।
২০১৭ সালে বেসামরিক রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে এই অভিযানের পরই জাতিসংঘ একটি অনুসন্ধানী দল পাঠায়। তাদের তদন্ত প্রতিবেদনে সেনাবাহিনীর অভিযানকে ‘গণহত্যামূলক তৎপরতা’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়।
এই প্রতিবেদনের ভিত্তিতে ২০১৯ সালে পশ্চিম আফ্রিকার দেশ গাম্বিয়া মিয়ানমারের সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক আদালতে গণহত্যা মামলা দায়ের করে। এ মামলার শুনানি আজ শুরু হয়েছে।
মিয়ানমারে অভিযানের সময় দেশটির প্রধানমন্ত্রী ছিলেন অং সান সুচি। জাতিসংঘের তদন্ত প্রতিবেদনের সময় তিনি এটি প্রত্যাখ্যান করেছিলেন। গাম্বিয়া মামলা দায়েরের সময়ও সুচি অভিযোগকে ‘অসম্পূর্ণ ও বিভ্রান্তিকর’ বলে উল্লেখ করেছিলেন।
২০২১ সালে সেনা অভ্যুত্থানের পর সুচি ক্ষমতাচ্যুত হন এবং বর্তমানে মিয়ানমারের কারাগারে অবস্থান করছেন। তাকে দুর্নীতির অভিযোগে সেনাবাহিনীর আদালতে বিচার চলছে।
আইসিজি-তে দায়েরকৃত এই মামলার প্রধান তদন্তকারী কর্মকর্তা নিকোলাস কৌজিমান বলেন, “গণহত্যার প্রকৃত সংজ্ঞা কী, কীভাবে গণহত্যা সম্পর্কিত অভিযোগ প্রমাণ করা সম্ভব, এবং এ ধরনের অপরাধের ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার পদ্ধতি—এসবের সমাধান এই মামলা একটি নজির হয়ে থাকবে।”
এ বিচার প্রক্রিয়া আন্তর্জাতিকভাবে মানবাধিকার রক্ষা ও গণহত্যা মামলার প্রমাণ সংগ্রহের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।