নড়াইলের সদর উপজেলার মুলিয়া ইউনিয়নের হিজলডাঙ্গা গ্রামে ঐতিহ্যবাহী পৌষ মেলাকে ঘিরে মানুষের ঢল নেমেছে। আজ বুধবার (১৪ জানুয়ারি) পৌষ মাসের শেষ দিনে দিনব্যাপী এই মেলা অনুষ্ঠিত হবে। স্থানীয়দের কাছে এটি ‘পাগলচাঁদের মেলা’ নামে পরিচিত। প্রতি বছর পৌষ সংক্রান্তিকে কেন্দ্র করে এই মেলা ঘিরে এলাকায় উৎসবমুখর পরিবেশ সৃষ্টি হয়।
মেলার প্রায় এক সপ্তাহ আগে থেকেই হিজলডাঙ্গা গ্রামজুড়ে আনন্দের আমেজ বিরাজ করছে। দেশের বিভিন্ন অঞ্চল ছাড়াও ভারত থেকে আত্মীয়-স্বজন ও অতিথিদের আগমনে গ্রামটি যেন আগেভাগেই মেলায় রূপ নিয়েছে। বিশেষ করে পৌষ সংক্রান্তি উপলক্ষে জামাইদের শ্বশুরবাড়িতে আসার দীর্ঘদিনের সামাজিক রীতি এই মেলার অন্যতম বৈশিষ্ট্য হিসেবে পরিচিত।
গ্রামের প্রতিটি বাড়িতে বাড়তি আয়োজন, অতিথি আপ্যায়ন ও পিঠাপুলির ধুম লক্ষ্য করা যাচ্ছে। নতুন জামাইদের বরণ করে নিতে প্রস্তুত শ্বশুরবাড়িগুলো। এতে গ্রামবাংলার হারিয়ে যাওয়া সামাজিক বন্ধন ও পারিবারিক সম্পর্ক নতুন করে প্রাণ ফিরে পাচ্ছে বলে মনে করছেন স্থানীয়রা।
হিজলডাঙ্গা পাগলচাঁদের মাঠে অনুষ্ঠিত এই মেলায় প্রতিবারের মতো এবারও হাজার হাজার ভক্ত ও দর্শনার্থীর সমাগম ঘটবে বলে আশা করা হচ্ছে। মেলায় নানা ধরনের দোকানপাট বসেছে। শিশুদের খেলনা, মিষ্টান্ন, পিঠাপুলি, লোকজ সামগ্রী, হস্তশিল্পসহ বিভিন্ন পণ্যের পসরা সাজানো হয়েছে। পাশাপাশি নাগরদোলা ও বিভিন্ন লোকজ বিনোদনের আয়োজন মেলাকে আরও প্রাণবন্ত করে তুলেছে।
মেলা কমিটির সভাপতি স্বপন কুমার রায় জানান, আধ্যাত্মিক সাধু পাগলচাঁদের স্মরণে প্রায় একশ বছর ধরে এই মেলা অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে। স্থানীয়দের বিশ্বাস, পাগলচাঁদের স্মরণে মানত করলে মনোবাসনা পূরণ হয়। সেই বিশ্বাস থেকেই প্রতিবছর দূরদূরান্ত থেকে ভক্তরা এখানে এসে মানত করেন ও প্রার্থনায় অংশ নেন।
তিনি আরও জানান, মেলার সার্বিক নিরাপত্তা ও শৃঙ্খলা বজায় রাখতে স্বেচ্ছাসেবক দল কাজ করছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে সমন্বয় করে শান্তিপূর্ণভাবে মেলা আয়োজনের প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে।
মুলিয়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান রবীন্দ্রনাথ অধিকারী বলেন, গ্রামবাংলার ঐতিহ্য ও সামাজিক সম্প্রীতির বন্ধন টিকিয়ে রাখতেই এই মেলার আয়োজন করা হয়। শুরুতে এটি মূলত সনাতন ধর্মাবলম্বীদের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলেও সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বর্তমানে সব ধর্মের মানুষের মিলনমেলায় পরিণত হয়েছে।
তিনি বলেন, এই মেলা শুধু বিনোদনের আয়োজন নয়, এটি সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি, সামাজিক সৌহার্দ্য ও ঐতিহ্যের প্রতীক। এ ধরনের আয়োজন নতুন প্রজন্মকে গ্রামবাংলার সংস্কৃতির সঙ্গে পরিচিত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
হিজলডাঙ্গার পাগলচাঁদের মেলা তাই শুধু একটি গ্রামীণ মেলা নয়—এটি নড়াইল অঞ্চলের মানুষের আবেগ, বিশ্বাস, সংস্কৃতি ও মিলনের এক অনন্য উৎসব।
আকাশজমিন / আরআর