শফিকুল আলম ভুইয়া রূপগঞ্জ( নারায়ণগঞ্জ)প্রতিনিধিঃ
ঢাকা
আন্তর্জাতিক বাণিজ্য মেলায় এবারো কয়েদিদের হাতে বানানো চার
শতাধিকের বেশি পণ্য বিক্রি
হচ্ছে। এসব পণ্যে ক্রেতা-দর্শনার্থীদের নজর কাড়ছে। বিক্রি
হচ্ছে প্রচুর পরিমাণে। রাখিরো নিরাপদ, দেখাবো আলোর পথ এই
প্রতিপাদ্যকে সামনে রেখে দেশের ২৭টি
কারাগারের দন্ড-প্রাপ্ত কয়েদিরা
এসব পণ্য তৈরি করেছেন।
এসব পণ্য ‘কারা অধিদপ্তর বাংলাদেশ
জেল‘ কারাপণ্য নামে পরিচিত। নকশি
কাঁথাসহ বেশ কিছু পণ্যের
চাহিদা রয়েছে বেশ।
কয়েদিদের
তৈরি বিভিন্ন ধরণের পণ্যের মধ্যে রয়েছে টি-শার্ট, প্লাস্টিকের
তৈরি গৃহস্থালি পণ্য, নকশিকাঁথা, আচার, জুতা, উলের তৈরি পোশাক,
আসবাবপত্র, মোড়া, ভ্যানিটি ব্যাগ, ফুলদানি, নৌকা, স্কুল ব্যাগ, গেঞ্জি, ফুলের ঝুড়ি, পাপোশ, জলচৌকি, পুতুল, লুঙ্গি, গামছা, বেডশিট, টিসুবক্স, জুতা, একতারা, শাড়ি, ড্রেসিংটেবিল ও দোলনা। বাংলাদেশ
জেলের উদ্যোগে দেওয়া স্টলে এসব পণ্য পাওয়া
যাচ্ছে। কয়েদিদের তৈরি পণ্যের মান
দেশের শীর্ষস্থানীয় বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের পণ্যের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে চলছে। ক্রেতারাও
কম দামে উন্নতমানের পণ্য
কিনতে পেরে সন্তুষ্টি প্রকাশ
করেছেন।
সরেজমিনে
গিয়ে দেখা গেছে, এবারো
মেলা প্রাঙ্গণের পূর্বপাশে 'কারাপণ্য বাংলাদেশ জেল' নামে প্যাভিলিয়ন
সাজানো হয়েছে। এর প্রধান ফটক
করা হয়েছে কেন্দ্রীয় কারাগারের আদলে। বাইরে থেকে দেখলে মনে
হবে এ যেন মিনি
জেলখানা। তবে ভেতরে প্রবেশ
করলেই পাল্টে যাবে ধারণা। পুরো
প্যাভিলিয়ন সেজেছে বাঁশ, বেত, কাঠ, পাট,
চামড়া ও পুতির তৈরি
বাহারি গৃহস্থালি ও গৃহসজ্জার সামগ্রীক
বাহারি পণ্যে। বিশেষ করে জামদানি শাড়ি
ও নকশিকাঁথার প্রতি ক্রেতাদের আগ্রহ চোখে পড়ার মতো।
গতকাল ১২জানুয়ারি সোমবার কারাবন্দিদের তৈরি পণ্যের প্যাভিলিয়নে
ব্যাপক ভিড় দেখা গেছে। বিক্রিও
হয়েছে প্রচুর।
কয়েদিদের
মধ্যে পণ্য তৈরির প্রশিক্ষণ
দেওয়া হয়। কয়েদিরা নিজ
নিজ এলাকার ঐতিহ্যবাহী পণ্য তৈরি করে
লাভবান হচ্ছেন। জেলখানায় থেকেও পরিবার পরিজনের দায়ভার কিছুটা হলেও গ্রহণ করতে
পারছেন। কারাপণ্য এখন ব্যাবসায়িক দিক
থেকে আলোর মুখ দেখছে
বলে জানান তিনি। কয়েদিদের পুনর্বাসিত ও স্বাবলম্বী করতে
জেল কর্তৃপক্ষ বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। তার মধ্যে পণ্য
তৈরির প্রশিক্ষণ অন্যতম। কারাগার এখন বন্দিশালা নয়,
সংশোধনাগার।
প্যাভিলিয়নে
দায়িত্বপ্রাপ্তরা বলেছেন, বিভিন্ন অপরাধে দ-প্রাপ্ত কয়েদিরা
কারাগারে বসে এসব পণ্য
তৈরি করেছেন। কারাপণ্য হিসেবেই এসব পণ্য পরিচিত।
কারাগারের বিক্রয়কেন্দ্রে সব সময় এসব
পণ্য পাওয়া যায়। তবে প্রচার
ও প্রসারের জন্য বাণিজ্য মেলায়
কয়েদিদের উৎপাদিত পণ্য প্রদর্শন ও
বিক্রি করা হচ্ছে। কয়েদিদের
তৈরি বিভিন্ন পণ্যের মধ্যে মোড়া ৩০০ থেকে
১ হাজার ৪০০ টাকা, টি-শার্ট ২০০ থেকে ৬০০
টাকা, নকশিকাঁথা ১ হাজার ২০০
থেকে ৫ হাজার টাকা,
পুঁতির ফুলের ঝুড়ি ১০০ থেকে
৩০০ টাকা, সিংহাসন চেয়ার ৯৫০ থেকে ১
হাজার ৮০০ টাকা, বেতের
মোড়া ৯৫০ থেকে ১
হাজার ৮০০ টাকা, শতরঞ্জি
২ হাজার ৮০০ টাকা থেকে
৬ হাজার ৩৭৭ টাকা, জামদানি
শাড়ি ৪ হাজার ৫০০
থেকে ৬ হাজার টাকায়
বিক্রি হচ্ছে। এই স্টলে ২৫
টাকা থেকে শুরু করে
২৫ হাজার টাকা মূল্যের কারাপণ্য
বিক্রি হচ্ছে।
এসব কারাপণ্য তৈরিতে সরকারি অর্থে জোগান দিয়ে কাঁচামাল কেনা হয়। জেল কর্তৃপক্ষ কাঁচামাল কয়েদিদের মধ্যে সরবরাহ করে থাকে। পণ্য বিক্রির লভ্যাংশের অর্ধেক সংশ্লিষ্ট কয়েদিদের দেওয়া হয়। কোনো কোনো ক্ষেত্রে তাদের ইচ্ছা অনুযায়ী ব্যাংক অ্যাকাউন্টে কিংবা বিকাশে পরিবারের সদস্যদের দেওয়া হয়। জানা গেছে, এই শিল্পের সঙ্গে জড়িত কয়েদিদের অনেকে কারাদন্ড শেষে বাড়ি ফিরে এটাকে পেশা হিসেবে নিচ্ছেন। তাতে তারা খুব সহজেই স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারছেন।
স্টলের
কর্মকর্তাদের কাছে মেলায় আসা
ক্রেতা ও দর্শনার্থীরা এসব
কয়েদি শ্রমজীবী মানুষের জীবনের কথা শুনছেন। তাদের
প্রতি সহমর্মী হচ্ছেন। কারাপণ্যের দাম তুলনামূলক কম
থাকায় ভালো বিক্রি হচ্ছে।
সকাল থেকে রাত পর্যন্ত
কারাপণ্যের স্টলে ক্রেতাদের উপচে পড়া ভিড়
থাকে। গৃহস্থালি ও নিত্যদিনের ব্যবহৃত
পণ্য বিক্রি হচ্ছে প্রচুর।
মানিকগঞ্জ
থেকে স্বপরিবারে মেলায় ঘুরতে আসা গৃহবধূ মালেকা
আক্তার বলেন, কয়েদিদের তৈরি
জিনিসগুলো সুন্দর, আকর্ষণীয় এবং ইউনিক। গুণমান
ভালো থাকায় বেশ কিছু পণ্য
কিনেছি।
গাজীপুর
টঙ্গী থেকে শিক্ষিকা কাশফিয়া
মঞ্জু জুয়েনা মেলায় ঘুরতে এসেছেন । তিনি বলেন,
কারাপণ্যগুলো নিপুণ হাতে তৈরি করা।
বিশেষ করে নকশিকাঁথার তুলনা
নেই। তিনি মেলা থেকে
নকশিকাঁথাসহ তিনটি পণ্য কিনেছেন বলে
জানান।
কারাপণ্য প্যাভিলিয়নের দায়িত্বে থাকা ডেপুটি জেলার তানজিল বলেন, আমাদের উদ্দেশ্য শুধু পণ্য বিক্রি নয়। সমাজকেও আমাদের কিছু দেওয়ার আছে। কারাবন্দিরা যদি কারাগারে থেকে এত সুন্দর ও নিখুঁতভাবে পণ্য তৈরি করতে পারেন, তাহলে যারা বাইরে আছেন, তারা চাইলে আরও ভালো কিছু করতে পারেন। কারাগারে তৈরি পণ্যের উদ্দেশ্য শুধু বিক্রি নয়, কারাবন্দিদের সংশোধন করা ও সাজা শেষে তারা যেন স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারেন, সেই ব্যবস্থা করা। ৩৮টি ট্রেডে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে ৬৯ হাজার কারাবন্দিকে। বর্তমানে ১৮ হাজার কারাবন্দি সক্রিয়ভাবে কাজ করছেন। তাদের হাতে তৈরি পণ্য দিয়ে মেলায় কারাপণ্য প্যাভিলিয়ন সাজানো হয়েছে। প্রতিবারই মেলায় পণ্য বিক্রির লভ্যাংশের ৫০ শতাংশ কারাবন্দিদের এবং আর বাকি ৫০ ভাগ সরকারি কোষাগারে জমা দেওয়া হয়। বন্দিরা এ অর্থ খরচ করতে পারেন এবং পরিবারের কাছে পাঠাতেও পারেন।
ডেপুটি
জেলার ইয়াছমিন আক্তার জুই বলেন, কয়েদিদের
প্রশিক্ষণ দিয়ে দক্ষ কারিগর
ও উদ্যোক্তা হিসেবে গড়ে তোলা হচ্ছে।
ডেপুটি জেলার আব্দুল মোহাইয়ম বলেন, কারাপণ্য তৈরি করে কয়েদি
ও তাদের পরিবারের সদস্যরা স্বাবলম্বী হচ্ছে। তাতে অপরাধ প্রবণতা
কমে যাচ্ছে। ফলে কারাগার থেকে
মুক্ত হওয়ার পর কয়েদিদের সমাজে
গ্রহণযোগ্যতা বাড়ছে।
রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর(ইপিবি) সচিব তরফদার সোহেল রহমান বলেন, প্রতিবছরই কারাপণ্যের স্টল মেলায় থাকে। এবারও রয়েছে। কয়েদিদের তৈরি পণ্যে সাধারণ মানুষের বেশ আগ্রহ থাকে। কেনাবেচাও হয় প্রচুর।
আকাশজমিন / আরআর