১০ হাজার টাকা পর্যন্ত কৃষি ও পল্লি ঋণের বিস্তারিত তথ্য চেয়ে দেশের ব্যাংকগুলোর কাছে চিঠি পাঠিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। তবে হঠাৎ করে এ ধরনের তথ্য চাওয়ার বিষয়ে কিছুই জানেন না বলে জানিয়েছেন কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর আহসান এইচ মনসুর। এ নিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের ভেতরেই তৈরি হয়েছে ধোঁয়াশা ও নানা প্রশ্ন।
গত বৃহস্পতিবার (২৯ জানুয়ারি) অফিস সময় শেষ হওয়ার পর বাংলাদেশ ব্যাংকের কৃষিঋণ বিভাগ থেকে ই-মেইলের মাধ্যমে ব্যাংকগুলোকে এ সংক্রান্ত চিঠি পাঠানো হয়। চিঠিতে রবিবার (১ ফেব্রুয়ারি) দুপুর ১২টার মধ্যে সর্বোচ্চ ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত কৃষি ও পল্লি ঋণের মোট আসল, সুদ বা মুনাফা এবং বকেয়া স্থিতির বিস্তারিত তথ্য পাঠাতে বলা হয়। তথ্যগুলো ২০২৫ সালের ৩১ ডিসেম্বর তারিখ ভিত্তিক হতে বলা হয়েছে।
চিঠিতে উল্লেখ করা হয়, বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের একজন সদস্যের ‘জরুরি নির্দেশনা’র পরিপ্রেক্ষিতেই এ তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে ই-মেইলের মাধ্যমে তথ্য পাঠাতে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে অনুরোধ জানানো হয়।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক আরিফ হোসেন খান বলেন, পরিচালনা পর্ষদের একজন সদস্যের চাহিদার ভিত্তিতেই এই তথ্য চাওয়া হয়েছে। তবে কেন এমন তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে, সে বিষয়ে তিনি বিস্তারিত কিছু জানাননি।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট বিভাগের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ডিরেক্টর স্যারের নির্দেশেই ১০ হাজার টাকার নিচের কৃষিঋণের তথ্য চাইতে বলা হয়েছে। সেই নির্দেশনা অনুযায়ীই ব্যাংকগুলোকে ই-মেইল করা হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, নির্দেশনা দেওয়া ওই পরিচালক হলেন রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়ন অধ্যয়ন বিভাগের অধ্যাপক এবং বেসরকারি গবেষণা সংস্থা উন্নয়ন অন্বেষণের চেয়ারপারসন।
তবে বিষয়টি নিয়ে বিস্ময় প্রকাশ করে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর আহসান এইচ মনসুর বলেন, ব্যাংকগুলোর কাছে কৃষিঋণের তথ্য চাওয়া হয়েছে কিনা, সে বিষয়ে তিনি অবগত নন। তিনি বলেন, “আমি বিষয়টি খোঁজ নিয়ে দেখবো।”
একটি বেসরকারি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) বলেন, কেন্দ্রীয় ব্যাংক নিয়মিতই বিভিন্ন তথ্য চায়। তবে এবার খুব অল্প নোটিশে এবং ই-মেইলের মাধ্যমে তথ্য চাওয়াটা কিছুটা ভিন্ন মনে হয়েছে।
সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, এ ধরনের তথ্য সংগ্রহের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রচলিত প্রশাসনিক প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয়নি। সাধারণত সংশ্লিষ্ট বিভাগ থেকে নির্বাহী পরিচালক, ডেপুটি গভর্নর হয়ে গভর্নরের কাছে নোট উপস্থাপন করা হয় অথবা পরিচালনা পর্ষদের বৈঠকে বিষয়টি আলোচনা হয়। কিন্তু এক্ষেত্রে সে ধরনের কোনো আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয়নি।
রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটও এই উদ্যোগকে ঘিরে প্রশ্ন তৈরি করেছে। রাজশাহীর এক জনসভায় বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান কৃষকদের জন্য সর্বোচ্চ ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত কৃষিঋণ সুদসহ মওকুফের ঘোষণা দেন। জনসভা শেষ হওয়ার পরপরই কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কৃষিঋণ বিভাগে তৎপরতা শুরু হয় বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
রাষ্ট্রায়ত্ত একটি ব্যাংকের এমডি বলেন, ১০ হাজার টাকার নিচে কৃষিঋণ নেওয়া গ্রাহক সংখ্যায় অনেক বেশি। এসব ঋণের বিপরীতে বকেয়া টাকার পরিমাণও বিপুল। রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের চাপে ঋণ মওকুফ হলে তা ব্যাংক ও আমানতকারীদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াতে পারে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, বাংলাদেশ ব্যাংক একটি স্বাধীন ও নিরপেক্ষ প্রতিষ্ঠান। নির্বাচনি প্রতিশ্রুতির পরপরই কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এমন তৎপরতা প্রাতিষ্ঠানিক নিরপেক্ষতা, প্রশাসনিক শৃঙ্খলা এবং ভবিষ্যৎ নীতিনির্ধারণ নিয়ে নতুন করে প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।