সিরাজগঞ্জ প্রতিনিধি / : 156
রেজাউল করিম ঝন্টু, সিরাজগঞ্জ
সিরাজগঞ্জ জেলা বরই চাষে এক নতুন সাফল্যের নজির সৃষ্টি করেছে। চলতি মৌসুমে বরইয়ের আবাদ ও ফলন লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে গেছে। কৃষকরা ব্যাপক উৎসাহ-উদ্দীপনার মধ্য দিয়ে এই অর্থকরী ফসলের মাধ্যমে নিজেদের জীবনে সচ্ছলতার আলো দেখছেন। বিশেষ করে সিরাজগঞ্জের চরাঞ্চল ও উঁচু দোআঁশ মাটির অঞ্চলগুলোতে বাণিজ্যিকভাবে বাগান গড়ে উঠেছে, যা কৃষির দৃষ্টিতে বড় পরিবর্তন বয়ে এনেছে।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জন্য জেলার ৯টি উপজেলায় মোট ২৯২ হেক্টর জমিতে বরই চাষের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল। কিন্তু মাঠ পর্যায়ের প্রতিবেদন বলছে, কৃষকেরা এই লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে অনেক বেশি জমিতে বরই চাষ করেছেন। উল্লাপাড়া, কামারখন্দ, কাজিপুর, রায়গঞ্জ ও সিরাজগঞ্জ সদর উপজেলার চরাঞ্চলগুলোতে বরইয়ের বাগান সবচেয়ে বেশি। যমুনা নদীর তীরবর্তী উঁচু ও দোআঁশ মাটি বরই চাষের জন্য অত্যন্ত উপযোগী হওয়ায় এসব এলাকায় ব্যাপক বাণিজ্যিক বাগান গড়ে উঠেছে।
বরই চাষে মূলত আধুনিক ও উচ্চফলনশীল জাত ব্যবহৃত হচ্ছে। উল্লেখযোগ্য জাতগুলো হলো ভারত সুন্দরী, আপেল কুল, কাশ্মীরি ও বাউকুল। এই জাতগুলো অধিক ফলনদায়ী হওয়ায় কৃষকদের মধ্যে ব্যাপক জনপ্রিয়তা পেয়েছে।
কৃষকরা জানান, বরইয়ের চারা সাধারণত নভেম্বর থেকে ডিসেম্বর মাসের মধ্যে রোপণ করা হয়। তবে হাইব্রিড জাতের প্রবর্তনের ফলে বর্তমানে প্রায় সারা বছরই চাষাবাদ সম্ভব হচ্ছে। একটি বাগান থেকে টানা ৫ থেকে ৬ বছর ফলন পাওয়া যায়। সেচ, ইউরিয়া, পটাশ ও প্রয়োজনীয় কীটনাশক ব্যবহার করে ফসল সুরক্ষিত রাখা হয়। ফলনের ভারে ডাল ভেঙে না পড়ে সেজন্য বাঁশ ও খুঁটি দিয়ে বিশেষ মাচা বা সাপোর্ট তৈরি করা হয়। পাখির আক্রমণ থেকে রক্ষার জন্য অনেক বাগানে নেট ব্যবহারও হচ্ছে।
বর্তমানে স্থানীয় বাজারে বরইয়ের চাহিদা ব্যাপক। পাইকাররা বাগান থেকে সরাসরি বরই সংগ্রহ করে ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন শহরে বিক্রি করছেন। জাতভেদে প্রতি কেজি বরইয়ের দাম ১৬০ থেকে ২০০ টাকা পর্যন্ত যাচ্ছে। বিশেষ করে 'ভারত সুন্দরী' ও 'কাশ্মীরি' জাতের চাহিদা সবচেয়ে বেশি।
রতনকান্দি গ্রামের কলেজ ছাত্র রুহুল আমিন বলেন, গত কয়েক বছর ধরে তার পরিবার বরই চাষ করছেন। আগের বছরের তুলনায় এবারের ফলন অনেক ভালো হয়েছে। খরচ কম ও লাভ বেশি হওয়ায় বরই চাষে তারা সন্তুষ্ট।
সিরাজগঞ্জ জেলা কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগের উপ-পরিচালক এ কে এম মঞ্জুরে মওলা জানান, কৃষকদের প্রয়োজনীয় কারিগরি সহায়তা ও পরামর্শ দিয়ে চাষাবাদে সহযোগিতা করা হচ্ছে। তিনি বলেন, “এবার সিরাজগঞ্জে বরইয়ের বাম্পার ফলন হয়েছে। ভালো বাজারমূল্য কৃষকদের লাভবান করেছে, যা গ্রামীণ অর্থনীতির উন্নয়নে ইতিবাচক প্রভাব ফেলেছে।”
বরই চাষের সাফল্যের ফলে সিরাজগঞ্জে কৃষকদের জীবনমান উন্নত হচ্ছে এবং তারা নতুন করে আত্মবিশ্বাস ফিরে পাচ্ছেন। বরইয়ের বাণিজ্যিক গুরুত্ব বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে স্থানীয় অর্থনীতির চাকা সচল হচ্ছে।