সাজ্জাদুল আলম খান, ভালুকা (ময়মনসিংহ)
ময়মনসিংহ বন বিভাগের অধীনে ভালুকা রেঞ্জের কাদিগড় বিট প্রকৃতিপ্রেমীদের জন্য এক অনন্য গন্তব্যস্থল। প্রাকৃতিক বন এবং মানবসৃষ্ট বনের অপূর্ব সমন্বয়ে গড়ে ওঠা এই অঞ্চলটি যেন সবুজের এক জীবন্ত পাঠশালা। চোখ জুড়ে মনমোহিনী গজারী, সেগুনের বাগান ও ঘন সবুজের আবরণ মুহূর্তেই কারো হৃদয় টেনে নেয় প্রকৃতির গভীরে।
বহু বছর আগে পরিকল্পিতভাবে রোপণকৃত মিনজিরি, অর্জুন ও সেগুন বাগানগুলো আজ প্রায় সম্পূর্ণ প্রাকৃতিক বনের রূপ নিয়েছে। উঁচু গাছের ফাঁক দিয়ে সূর্যের আলো প্রবাহিত হয়, বাতাসে পাতার মর্মর আর পাখিদের অবিরাম কিচিরমিচির মিলেমিশে সৃষ্টি করেছে এক মোহময় পরিবেশ। প্রকৃতির এই সান্নিধ্যে এসে সবুজের সমারোহ এবং মনভোলানো পাখির কিচিরমিচিরতায় প্রকৃতিপ্রেমী মানুষ বিমোহিত হয়।
কাদিগড় জাতীয় উদ্যানে নিয়মিত দেখা মেলে হনুমান ও বানরের দল। ভাগ্য ভালো হলে গাছের ডালে তাদের লাফালাফি দেখা যায়। এছাড়া বনে বিচরণ করে শিয়াল, শজারু, মেছো বিড়াল, বনবিড়াল, বাগডাশ ও বেজী। বিভিন্ন প্রজাতির সাপ, ব্যাঙ, তক্ষক ও গুইসাপও এই বনের প্রাণবন্ত অংশ। রঙিন প্রজাপতির উড়াউড়ি এবং হরেক রকম পাখির কিচিরমিচির বনটিকে করে তুলেছে আরও জীবন্ত।
অবস্থানগত দিক থেকে কাদিগড় জাতীয় উদ্যান ময়মনসিংহ শহর থেকে প্রায় ৫৬ কিলোমিটার দক্ষিণে, ভাওয়াল জাতীয় উদ্যান থেকে ৪৫ কিলোমিটার উত্তরে এবং ভালুকা সদর থেকে প্রায় ২০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত।
যোগাযোগ ব্যবস্থা তুলনামূলক সহজ। ঢাকা থেকে ময়মনসিংহগামী বাসে সিডস্টোর বাজারে নেমে সেখান থেকে সিএনজি যোগে প্রায় ১০ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে ১৫০ টাকা ভাড়ায় কাদিগড় জাতীয় উদ্যানে পৌঁছানো যায়। তবে বর্ষাকালে কাঁচা রাস্তার কারণে কিছুটা চলাচলে অসুবিধা হয়।
শুষ্ক মৌসুমে কাদিগড় বিট বনভোজনপ্রেমীদের মিলনকেন্দ্র হয়ে ওঠে। পরিবার, বন্ধু ও বিভিন্ন সংগঠনের মানুষ এখানে এসে প্রকৃতির কোলে সময় কাটায়। সবুজই প্রাণের স্পন্দন, বেঁচে থাকার মূলমন্ত্র—এই উপলব্ধিই নতুন করে জাগে কাদিগড়ের বনে এসে।
লোকমুখে প্রচলিত আছে, একসময় এই জঙ্গলের কাঠ ও গাছ সরকারি টেন্ডারের মাধ্যমে কাদির মিয়া নামে এক কাঠ ব্যবসায়ী কিনতেন। তার একক আধিপত্যের কারণে অন্য কেউ টেন্ডারে অংশ নিতে পারত না। দাপুটে এই প্রভাবের কারণে এলাকাটি পরিচিত হয়ে ওঠে ‘কাদির মিয়ার জঙ্গল’ নামে, যা সময়ের সঙ্গে পরিবর্তিত হয়ে আজকের কাদিগড় জাতীয় উদ্যান হিসেবে পরিচিত।
প্রায় ৯৫০ একর আয়তনের এই জাতীয় উদ্যানে পর্যটকদের জন্য নির্মাণ করা হয়েছে একটি ওয়াচ টাওয়ার, দুটি ইকো কটেজ, দুটি গোলঘর, পিকনিক স্পট এবং পুকুরপাড়। পরিকল্পিত সংরক্ষণ ও পর্যটন ব্যবস্থাপনা জোরদার হলে কাদিগড় জাতীয় উদ্যান ভবিষ্যতে ময়মনসিংহ অঞ্চলের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ইকো-ট্যুরিজম গন্তব্য হতে পারে।
সবুজের মাঝে নিজেকে হারিয়ে দিতে চাইলে, প্রকৃতির কাছ থেকে একটু নিঃশ্বাস নিতে চাইলে কাদিগড় জাতীয় উদ্যান হতে পারে নিখুঁত ঠিকানা।
আকাশজমিন / আরআর