ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে রংপুর-৪ (পীরগাছা-কাউনিয়া), রংপুর-৩ (সদর ও রসিক) এবং রংপুর-৬ (পীরগঞ্জ) আসনে ভোট পুনর্গণনার দাবিতে জেলা প্রশাসকের কার্যালয় ঘেরাও করে বিক্ষোভ মিছিল করেছেন পরাজিত বিএনপি প্রার্থীদের কর্মী-সমর্থকরা। রোববার (১৫ ফেব্রুয়ারি) বেলা ১টা থেকে বিকেল সাড়ে ৩টা পর্যন্ত জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের সামনে অবস্থান নিয়ে তারা মিছিল ও স্লোগান দেন। এ সময় আখতার হোসেন ও জেলা প্রশাসককে ‘ভোট চোর’ আখ্যা দিয়ে বিভিন্ন স্লোগান দিতে দেখা যায় বিক্ষুব্ধ নেতাকর্মীদের।
বিক্ষোভ কর্মসূচিতে মহানগর বিএনপির আহ্বায়ক ও রংপুর-৩ আসনের প্রার্থী সামসুজ্জামান সামু, জেলা বিএনপির সাবেক সভাপতি ও রংপুর-৪ আসনের প্রার্থী এমদাদুল হক ভরসা এবং জেলা বিএনপির আহ্বায়ক ও রংপুর-৬ আসনের প্রার্থী সাইফুল ইসলামসহ কয়েক হাজার নেতাকর্মী ও সমর্থক উপস্থিত ছিলেন। কর্মসূচি থেকে তারা রিটার্নিং কর্মকর্তা ঘোষিত ফলাফল প্রত্যাখ্যান করে তিনটি আসনেই ভোট পুনর্গণনার দাবি জানান। একই সঙ্গে দাবি আদায় না হলে কঠোর কর্মসূচি দেওয়ার হুঁশিয়ারি দেন এবং প্রয়োজনে পুরো রংপুর অচল করে দেওয়ার কথাও বলেন।
রংপুর-৪ আসনের বিএনপি প্রার্থী এমদাদুল হক ভরসা অভিযোগ করেন, ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের মাধ্যমে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) প্রার্থী আখতার হোসেনকে জয়ী ঘোষণা করা হয়েছে। তিনি বলেন, নির্বাচনের দিন বিকেল ৩টা থেকে ৫টার মধ্যে তার প্রতিদ্বন্দ্বী পক্ষ মব সৃষ্টি করে এবং প্রশাসনের সহায়তায় ফলাফলকে প্রভাবিত করে। তিনি দাবি করেন, নির্বাচনের ফল ঘোষণার আগে ও পরে বিষয়টি নিয়ে তিনি জেলা প্রশাসকের সঙ্গে দেখা করার চেষ্টা করলেও সফল হননি। তার ভাষ্য অনুযায়ী, ডিসির বাংলোতে গিয়েও তিনি কোনো সাড়া পাননি। ভরসা আরও বলেন, প্রায় ৮ হাজার ৫০০ ভোট বাতিল করা হয়েছে, যা অত্যন্ত সন্দেহজনক। তার দাবি, পুনর্গণনা করা হলে প্রকৃত ফলাফল বেরিয়ে আসবে এবং জনগণের প্রকৃত রায় প্রতিফলিত হবে।
ভোট পুনর্গণনার দাবিতে রংপুর-৩ আসনের প্রার্থী সামসুজ্জামান সামু বলেন, তারা নিয়মতান্ত্রিক পন্থায় আন্দোলন শুরু করেছেন এবং দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত শান্তিপূর্ণ কর্মসূচি অব্যাহত থাকবে। রংপুর-৬ (পীরগঞ্জ) আসনের বিএনপি প্রার্থী সাইফুল ইসলামও একই ধরনের অভিযোগ তুলে ধরেন। তিনি বলেন, উপজেলা প্রশাসন, পুলিশ প্রশাসন এবং জামায়াতে ইসলামীর একটি চক্র ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের মাধ্যমে জনগণের কাঙ্ক্ষিত ফলাফল ছিনতাই করেছে। তিনি পুনর্গণনার মাধ্যমে সুষ্ঠু তদন্ত ও ন্যায়বিচারের দাবি জানান।
পরে বিএনপির প্রার্থীরা জেলা রিটার্নিং কর্মকর্তা ও জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ এনামুল আহসানের কাছে লিখিত অভিযোগ ও স্মারকলিপি জমা দেন। রংপুর-৩, রংপুর-৪ এবং রংপুর-৬ আসনে ভোট পুনর্গণনার আনুষ্ঠানিক আবেদনপত্রও প্রদান করা হয়। এ সময় জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে এবং বিক্ষুব্ধ নেতাকর্মীদের একটি অংশ প্রশাসকের প্রতি ক্ষোভ প্রকাশ করেন। একপর্যায়ে রংপুর-৪ আসনের প্রার্থী এমদাদুল হক ভরসা আবেগাপ্লুত হয়ে জেলা প্রশাসককে উদ্দেশ করে কঠোর ভাষায় বক্তব্য দেন এবং আল্লাহর কাছে বিচার দেওয়ার কথা উল্লেখ করেন। তিনি অভিযোগ করেন, তার পরিবারকে কাঁদিয়ে তার ভোট ছিনতাই করা হয়েছে।
এ ঘটনায় জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ এনামুল আহসান তাৎক্ষণিক কোনো প্রতিক্রিয়া জানাননি। তবে তিনি নিশ্চিত করেছেন যে, বিএনপি প্রার্থীদের লিখিত অভিযোগ গ্রহণ করা হয়েছে এবং বিষয়টি নির্বাচন কমিশনের কাছে পরবর্তী নির্দেশনার জন্য পাঠানো হয়েছে। তিনি বলেন, কমিশনের নির্দেশনা অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এর আগে গত দুই দিন ধরে রংপুর-৪ ও রংপুর-৬ আসনের বিভিন্ন এলাকায় সড়ক অবরোধ, বিক্ষোভ মিছিল ও প্রতিবাদ সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। এসব কর্মসূচিতে এমদাদুল হক ভরসা ও সাইফুল ইসলামের সমর্থকরা সক্রিয় অংশগ্রহণ করেন। এতে কয়েকটি এলাকায় উত্তেজনা সৃষ্টি হয়।
অন্যদিকে রংপুর-৪ আসনের বিজয়ী প্রার্থী আখতার হোসেন অভিযোগ করেছেন, বিএনপি প্রার্থীর কর্মী-সমর্থকরা হারাগাছ, পীরগাছা ও কাউনিয়ার বিভিন্ন এলাকায় এনসিপির নেতাকর্মীদের ওপর হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাট চালিয়েছেন। শনিবার দুপুরে ফেসবুকে দেওয়া এক পোস্টে তিনি লেখেন, হারাগাছে ভরসার ভাড়া করা লোকজন নির্বাচনী আচরণবিধি লঙ্ঘন করছে। তিনি প্রশাসনের প্রতি আহ্বান জানান আলোচনার মাধ্যমে আইনগতভাবে সমস্যার সমাধান করতে এবং সময়ক্ষেপণ না করতে।
আখতার হোসেন আরও দাবি করেন, ভরসার নেতাকর্মীরা সাধারণ মানুষকে লোভ ও ভয় দেখিয়ে বিভ্রান্ত করছে। তার মতে, অনেক দিনমজুর ও খেটে খাওয়া মানুষকে দিনহাজিরার বিনিময়ে এনে কর্মসূচিতে অংশ নিতে বাধ্য করা হচ্ছে। তিনি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর প্রতি অনুরোধ জানান যেন নিরীহ মানুষদের বিরুদ্ধে কোনো ধরনের বলপ্রয়োগ না করা হয় এবং যারা ভাঙচুর বা সহিংসতায় জড়িত শুধু তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হয়।
উল্লেখ্য, গত ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে রংপুর-৩ আসনে জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী মাহবুবুর রহমান বেলাল ১ লাখ ৭৮ হাজার ৬৪ ভোট পেয়ে নির্বাচিত হন। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপির সামসুজ্জামান সামু পান ৮৪ হাজার ৫৭৮ ভোট। রংপুর-৪ আসনে এনসিপির আখতার হোসেন শাপলা কলি প্রতীকে ১ লাখ ৪৯ হাজার ৯৬৬ ভোট পেয়ে নির্বাচিত হন। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী এমদাদুল হক ভরসা পান ১ লাখ ৪০ হাজার ৫৬৪ ভোট। রংপুর-৬ আসনে জামায়াতে ইসলামীর নুরুল আমীন ১ লাখ ২০ হাজার ১২৮ ভোট পেয়ে বিজয়ী হন। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী সাইফুল ইসলাম পান ১ লাখ ১৭ হাজার ৭০৩ ভোট। ফলাফল ঘোষণার পর থেকেই তিন আসনে রাজনৈতিক উত্তেজনা বিরাজ করছে।