সিরাজগঞ্জ প্রতিনিধি / : 93
সিরাজগঞ্জের গ্রামবাংলা ফাগুনে যেন প্রকৃতির অপরূপ সাজে রঙিন হয়ে ওঠে। সবুজ পাতার মাঝে মুকুল ও শিমুল ফুলের ছোঁয়া বসন্তের আগমনের প্রতীক। বিশেষ করে গাঢ় লাল শিমুল ফুলের ঝলক বসন্তের প্রাকৃতিক সৌন্দর্যকে আরও উজ্জ্বল করে তোলে। কোকিলের কুহু ডাক আর বাতাসে ভেসে থাকা শিমুলের মৃদু সুবাস প্রকৃতিকে বিমোহিত করে। কিন্তু কালের বিবর্তনে ফাগুনের এই চোখ ধাঁধানো শিমুল গাছ এখন বিলুপ্তির পথে। সিরাজগঞ্জের বিভিন্ন গ্রামে এর সংখ্যা দিনদিন কমছে।
দীর্ঘদিন আগে জেলার গ্রামে বাড়ির আনাচে-কানাচে, রাস্তায় ও পতিত ভিটায় প্রচুর শিমুল গাছ দেখা যেত। প্রাকৃতিকভাবে তুলা আহরণের অন্যতম প্রধান অবলম্বন শিমুল গাছ। এই গাছের প্রায় সব অংশেরই রয়েছে ভেষজগুণ। শীতের শেষে পাতা ঝরে পড়ে, বসন্তের শুরুতেই গাছে ফুল ফোটে এবং এরপর ফল ধরে। চৈত্র মাসের শেষে ফল পুষ্ট হয়। বৈশাখে ফল পেকে শুকিয়ে যায় এবং বাতাসে উড়ে গিয়ে বীজ ছড়িয়ে পড়ে। এই প্রক্রিয়ায় নতুন গাছ জন্মায়।
তবে শখ করে কেউ এই গাছ রোপণ করে না। সাধারণত প্রাকৃতিকভাবেই এ গাছ বেড়ে ওঠে। গাছের ছাল, পাতা ও ফুল গবাদিপশুর খাদ্য হিসেবে ব্যবহৃত হয়। অতীতে শিমুলের কাঠ প্যাকিং বাক্স, ইটভাটার জ্বালানি, দিয়াশলাই ও ছোট ডিঙ্গি নৌকা তৈরিতে ব্যবহৃত হতো। কিন্তু প্রয়োজনীয়তার সত্ত্বেও এর যথাযথ রোপণ করা হয়নি। ফলে আজ শিমুল গাছ বিলুপ্তির পথে। প্রবীণরা স্মরণ করেন, “গ্রামে শিমুল ছিল প্রচুর, এখন আর দেখা যায় না।”
তাড়াশ সদরের তোষক তৈরিকারক ও বিক্রেতা মজিদ জানান, বর্তমান বাজারে শিমুল তুলার দাম সাড়ে ৪০০ থেকে ৫০০ টাকা প্রতি কেজি, আর গার্মেন্টসের জুট দিয়ে তৈরি তুলা প্রতি কেজি ৭৫–৮০ টাকা (তোষক), ১৭০ টাকা (লেপ), কাপাশ তুলা ২৬০ টাকা এবং পজ্ঞের তুলা ২২০ টাকা, ফোম ১৯০ টাকা প্রতি কেজি বিক্রি হচ্ছে।
সিরাজগঞ্জ জেলা সহকারী বন সংরক্ষক মোহাম্মাদ হোসেন জানান, দেশের কোথাও শিমুলগাছ বা তুলা বাণিজ্যিকভাবে চাষ করা হয় না। প্রাকৃতিকভাবে বেড়ে ওঠার কারণে শিমুল ধীরে ধীরে হারিয়ে যাচ্ছে। তিনি আরও বলেন, “আমরা তুলা চাষ বৃদ্ধি করার জন্য স্বল্প আকারে হলেও চারা তৈরি করে জনগণের মাঝে বিতরণ করি। যদি বাণিজ্যিকভাবে চাষ করা হয়, মানুষ আসল তুলার গুণমান বুঝতে পারবে।”
শিমুলের বিলুপ্তি শুধু প্রাকৃতিক ও অর্থনৈতিক ক্ষতি নয়, এটি দেশের সাংস্কৃতিক ও ঐতিহ্যগত সম্পদও। বন সংরক্ষণ ও তুলা চাষ বৃদ্ধি করে এই গাছকে সংরক্ষণ করা একান্ত প্রয়োজন।
আকাশজমিন / আরআর