আন্তর্জাতিক ডেস্ক:
মধ্যপ্রাচ্যে ক্রমবর্ধমান উত্তেজনার মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে কঠোর হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেছে ইরান। যুদ্ধ পরিস্থিতি সৃষ্টি হলে মার্কিন সেনাদের ওপর সরাসরি হামলা চালানো এবং তাদের সামরিক সরঞ্জাম গুঁড়িয়ে দেওয়ার হুমকি দিয়েছেন ইরানের সশস্ত্র বাহিনীর জ্যেষ্ঠ মুখপাত্র ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আব্দুলফজল সেকারচি। শুক্রবার (২৭ ফেব্রুয়ারি) দেওয়া এক বক্তব্যে তিনি বলেন, ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক পদক্ষেপ নেওয়া হলে তার কঠোর জবাব দেওয়া হবে।
এর আগে বৃহস্পতিবার যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ঘোষণা দেন, ইরান তাদের শর্ত অনুযায়ী চুক্তিতে সম্মত না হলে সামরিক ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারে। এই মন্তব্যের পরপরই দুই দেশের মধ্যে উত্তেজনা আরও বেড়ে যায়। আন্তর্জাতিক মহল আশঙ্কা করছে, কূটনৈতিক প্রচেষ্টা ব্যর্থ হলে পরিস্থিতি দ্রুত সংঘাতে রূপ নিতে পারে।
ইরানের সামরিক বাহিনীর জ্যেষ্ঠ মুখপাত্র বলেন, “যদি কোনো যুদ্ধ বাঁধে, মার্কিন সেনা এবং তাদের সামরিক সরঞ্জাম ধ্বংস করা হবে। এ অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের যেসব সামরিক অবকাঠামো রয়েছে, সেগুলো ইরানি সেনাদের ফায়ারিং রেঞ্জের মধ্যে থাকবে।” তাঁর এই বক্তব্যে স্পষ্ট ইঙ্গিত রয়েছে যে, ইরান সম্ভাব্য সংঘাতের জন্য প্রস্তুত রয়েছে এবং যুক্তরাষ্ট্রের উপস্থিতিকে তারা সরাসরি লক্ষ্যবস্তু হিসেবে বিবেচনা করছে।
ডোনাল্ড ট্রাম্পের ধারাবাহিক হুমকি সম্পর্কে মন্তব্য করতে গিয়ে আব্দুলফজল সেকারচি বলেন, “ডোনাল্ড ট্রাম্প যে ঘনঘন হুমকি-ধামকি দিচ্ছেন, তা কেবলই ফাঁকা আওয়াজ এবং আকাশকুসুম কল্পনা।” তাঁর দাবি, ইরানের সামরিক সক্ষমতা সম্পর্কে সঠিক ধারণা থাকলে যুক্তরাষ্ট্র কখনো যুদ্ধের হুমকি দিত না। তিনি আরও বলেন, ইরান আত্মরক্ষার জন্য সম্পূর্ণ প্রস্তুত এবং যেকোনো আগ্রাসনের জবাব শক্তভাবে দেওয়া হবে।
মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন সেনাদের উপস্থিতি, যুদ্ধজাহাজ ও যুদ্ধবিমান মোতায়েনের বিষয়েও নজর রাখছে ইরান। জ্যেষ্ঠ এই মুখপাত্র জানান, যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক চলাচল ও প্রস্তুতি খুব কাছ থেকে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। তিনি বলেন, “আমরা এ অঞ্চলে তাদের প্রতিটি পদক্ষেপ নজরদারিতে রেখেছি।” এতে বোঝা যায়, পরিস্থিতি দ্রুত অবনতির দিকে গেলে তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ার জন্য ইরান প্রস্তুত রয়েছে।
বর্তমান উত্তেজনার কেন্দ্রে রয়েছে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি ও আঞ্চলিক প্রভাব বিস্তার নিয়ে বিরোধ। যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘদিন ধরেই দাবি করে আসছে, ইরানকে তাদের পারমাণবিক কার্যক্রম পুরোপুরি বন্ধ করতে হবে। পাশাপাশি দেশটির প্রধান পারমাণবিক স্থাপনাগুলো ভেঙে ফেলার শর্তও দিয়েছে ওয়াশিংটন। অন্যদিকে ইরান বলছে, তারা শান্তিপূর্ণ পারমাণবিক কর্মসূচির অধিকার রাখে এবং আন্তর্জাতিক আইনের আওতায় থেকে কার্যক্রম পরিচালনা করছে।
বিশ্লেষকদের মতে, দুই দেশের মধ্যে আস্থার সংকট গভীর। অতীতে স্বাক্ষরিত চুক্তি থেকে যুক্তরাষ্ট্র সরে আসার পর সম্পর্ক আরও অবনতির দিকে যায়। বর্তমানে নতুন করে আলোচনার চেষ্টা হলেও কঠোর শর্ত আরোপ ও পাল্টা হুমকির কারণে সমাধানের পথ সংকুচিত হয়ে পড়েছে।
ইরানের সামরিক বাহিনীর পক্ষ থেকে আরও বলা হয়েছে, ইরান ও তাদের সহযোগীদের বিরুদ্ধে কোনো উস্কানিমূলক পদক্ষেপ নেওয়া হলে তার উপযুক্ত জবাব দেওয়া হবে। যদিও যুক্তরাষ্ট্র ইরান-সমর্থিত গোষ্ঠীগুলোর কার্যক্রম নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে আসছে, তবুও সরাসরি সামরিক সংঘাতে জড়ানোর বিষয়ে এখনো আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেয়নি।
আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকরা বলছেন, মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে বড় ধরনের সংঘাত শুরু হলে তার প্রভাব বিশ্ব অর্থনীতিতে পড়বে। বিশেষ করে জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থা বিঘ্নিত হতে পারে, যা বৈশ্বিক বাজারে তেলের দাম বাড়িয়ে দিতে পারে। এছাড়া আঞ্চলিক নিরাপত্তা পরিস্থিতি অস্থিতিশীল হয়ে উঠতে পারে।
কূটনৈতিক মহলে এখনো আশা করা হচ্ছে, সরাসরি সংঘাতে যাওয়ার আগে দুই পক্ষ আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের চেষ্টা করবে। তবে সামরিক প্রস্তুতি ও কড়া বক্তব্য পরিস্থিতিকে অনিশ্চয়তার দিকে ঠেলে দিচ্ছে। উভয় দেশই নিজেদের অবস্থানে অনড় থাকায় সংকট নিরসনে আন্তর্জাতিক মধ্যস্থতার প্রয়োজন হতে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
বর্তমানে দৃষ্টি নিবদ্ধ রয়েছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের পরবর্তী পদক্ষেপের দিকে। যুদ্ধংদেহী বক্তব্য বাস্তবে রূপ নেবে, নাকি কূটনৈতিক সমাধানের পথ খুলবে—তা সময়ই বলে দেবে। তবে আপাতত স্পষ্ট যে, মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি অত্যন্ত স্পর্শকাতর এবং সামান্য উস্কানিতেই তা বড় সংঘাতে পরিণত হতে পারে।
সূত্র: তেহরান টাইমস