ঢাকা, বাংলাদেশ ।
  সোমবার, ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬,  ৩০ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম :
শত কোটি টাকার সম্পদ, রিট ফাইল চেপে রাখা ও প্রশাসনের নীরবতার অভিযোগ রাজনৈতিক দুর্বৃত্তায়ন ও চাঁদাবাজি কঠোর হাতে দমন করা হবে: আইনমন্ত্রী ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের নতুন অধ্যায় চায় বাংলাদেশ: পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী ডেঙ্গুতে আরও ৬ প্রাণহানি, এক দিনে হাসপাতালে ১৫৬১ জন ভর্তি গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করতে স্থানীয় সরকার ব্যবস্থা জোরদার করতে হবে: রাষ্ট্রপতি আসিফ মাহমুদের বিরুদ্ধে ১১ হাজার কোটি টাকা পাচারের অভিযোগ: দুদক ‘বারবার মিথ্যা মামলা না দিয়ে আমাকে একবারে গুলি করে মেরে ফেলেন’ ২১ সেপ্টেম্বর যুক্তরাষ্ট্র সফরে যাচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বাংলাদেশে নতুন গ্যাসক্ষেত্র অনুসন্ধানে বিনিয়োগে আগ্রহী মার্কিন কোম্পানি শেভরন পাবনায় ডিবির ওসির প্রত্যাহারে সাংবাদিকদের ২৪ ঘণ্টার আলটিমেটাম

আমিরাত কেন ইরানের নিশানায়, নেপথ্যে কি বিশ্বাসঘাতকতা?


  • আপলোড সময় : শনিবার ২৮ ফেব্রুয়ারী, ২০২৬ সময় : ৮:৫৫ পিএম

যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইলের সাম্প্রতিক হামলার জবাবে ইরান এবার সরাসরি পাল্টা আঘাত হেনেছে মধ্যপ্রাচ্যের একাধিক দেশে। তেহরানের এই সামরিক প্রতিক্রিয়া শুধু ইসরাইলের সীমানায় সীমাবদ্ধ থাকেনি; বরং উপসাগরীয় অঞ্চলে মার্কিন সামরিক উপস্থিতি রয়েছে—এমন স্থাপনাগুলোকে লক্ষ্য করে একযোগে হামলা চালানো হয়েছে। বাহরাইন, কুয়েত, কাতার ও সৌদি আরবের পাশাপাশি ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র হামলার শিকার হয়েছে সংযুক্ত আরব আমিরাতও। রাজধানী আবুধাবিতে প্রাণ হারিয়েছেন একজন ব্যক্তি। এই ঘটনার পর বিশ্লেষকদের সামনে বড় প্রশ্ন—আরব দেশগুলোর মধ্যে আমিরাতকেই কেন এত গুরুত্ব দিয়ে নিশানা করল ইরান?

এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হলে ফিরে যেতে হবে ২০২০ সালে। সেই বছরের সেপ্টেম্বরে ঐতিহাসিক ‘আব্রাহাম অ্যাকর্ড’ স্বাক্ষরের মাধ্যমে ইসরায়েলের সঙ্গে দীর্ঘদিনের কূটনৈতিক দূরত্ব কমিয়ে সম্পর্ক স্বাভাবিক করে সংযুক্ত আরব আমিরাত ও বাহরাইন। যদিও উপসাগরীয় দেশগুলো আগে থেকেই অনানুষ্ঠানিকভাবে ইসরায়েলের সঙ্গে যোগাযোগ রাখত, তবে এই চুক্তির মাধ্যমে তা প্রকাশ্য ও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পায়। বিশেষ করে ২০১৫ সালে আবুধাবিতে ইসরায়েলের প্রথম কূটনৈতিক মিশন খোলার পর দুই দেশের ঘনিষ্ঠতা দ্রুত বাড়তে থাকে। তেহরান বরাবরই এই প্রক্রিয়াকে নিজেদের আঞ্চলিক প্রভাবের বিরুদ্ধে একটি কৌশলগত পদক্ষেপ হিসেবে দেখেছে।

বর্তমানে বাণিজ্যিক ও সামরিক—উভয় ক্ষেত্রেই আমিরাত-ইসরায়েল সম্পর্ক নতুন উচ্চতায় পৌঁছেছে। তুরস্কের পর মধ্যপ্রাচ্যে ইসরাইলের দ্বিতীয় বৃহত্তম বাণিজ্য অংশীদার এখন সংযুক্ত আরব আমিরাত। ২০২৩ সালের হিসাব অনুযায়ী, প্রায় এক হাজার ইসরায়েলি প্রতিষ্ঠান আমিরাতে ব্যবসায়িক কার্যক্রম পরিচালনা করছে। প্রযুক্তি, প্রতিরক্ষা, সাইবার নিরাপত্তা, কৃষি ও জ্বালানি খাতে দুই দেশের যৌথ উদ্যোগ দ্রুত সম্প্রসারিত হয়েছে।

তবে ইরানের জন্য সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে সামরিক সহযোগিতা। যৌথ নৌ মহড়া, উন্নত আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ক্রয়, গোয়েন্দা তথ্য বিনিময় এবং অস্ত্র উন্নয়ন—এসব ক্ষেত্রে আমিরাত ও ইসরাইলের অংশীদারিত্বকে তেহরান নিজেদের নিরাপত্তার জন্য সরাসরি হুমকি হিসেবে বিবেচনা করছে। বিশ্লেষকদের মতে, ইসরায়েলকে উপসাগরীয় অঞ্চলে কৌশলগতভাবে জায়গা করে দেওয়ার মাধ্যমে আমিরাত কার্যত ইরানের বিরুদ্ধে একটি নতুন নিরাপত্তা বলয় গড়ে তুলেছে।

ইরানের দৃষ্টিতে, সাম্প্রতিক মার্কিন ও ইসরাইলি হামলায় আমিরাতের নীরব সমর্থন কিংবা পরোক্ষ সহযোগিতা থাকতে পারে—এমন সন্দেহও জোরালো হয়েছে। যদিও আমিরাত সরকার প্রকাশ্যে কোনো পক্ষ নেয়নি, তবুও তাদের ভূখণ্ডে মার্কিন সামরিক স্থাপনার উপস্থিতি তেহরানের সন্দেহ আরও বাড়িয়েছে। ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোর (আইআরজিসি) দাবি করেছে, তারা কৌশলগত লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হেনেছে এবং বিশেষভাবে মার্কিন সামরিক সংশ্লিষ্ট স্থাপনাগুলোকে নিশানা করা হয়েছে।

এই হামলা কেবল সামরিক পদক্ষেপ নয়, বরং একটি সুস্পষ্ট রাজনৈতিক বার্তা বলেই মনে করছেন বিশ্লেষকরা। তেহরান ইঙ্গিত দিচ্ছে—যেসব দেশ যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক অবকাঠামোকে আশ্রয় দেবে কিংবা ইসরাইলের সঙ্গে নিরাপত্তা সহযোগিতা জোরদার করবে, তারা সরাসরি ঝুঁকির মুখে পড়বে। অর্থাৎ কূটনৈতিক সম্পর্ক বা অর্থনৈতিক অংশীদারিত্ব কোনো দেশের জন্য নিরাপত্তার নিশ্চয়তা নয়, যদি তা ইরানের নিরাপত্তা স্বার্থের বিপরীতে যায়।

বহু বছর ধরে সংযুক্ত আরব আমিরাত নিজেকে মধ্যপ্রাচ্যের স্থিতিশীল ও আধুনিক অর্থনৈতিক কেন্দ্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে। দুবাই ও আবুধাবি বৈশ্বিক বাণিজ্য, পর্যটন ও ট্রানজিট হাব হিসেবে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পেয়েছে। কিন্তু সাম্প্রতিক হামলার পর সেই স্থিতিশীলতার ভাবমূর্তি বড় ধাক্কা খেয়েছে। রাজধানী আবুধাবিতে একাধিক বিস্ফোরণের ঘটনায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। জরুরি সতর্কতা জারি করা হয় দেশের আকাশপথে। বহু আন্তর্জাতিক ফ্লাইট বাতিল বা স্থগিত করা হয়েছে, যা বিমান চলাচল খাতকে বড় চাপে ফেলেছে।

অর্থনৈতিক প্রভাবও স্পষ্ট হতে শুরু করেছে। আঞ্চলিক শেয়ারবাজারে অস্থিরতা দেখা দিয়েছে, তেলের দামে ওঠানামা শুরু হয়েছে। মধ্যপ্রাচ্য বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহের অন্যতম কেন্দ্র হওয়ায় সংঘাত দীর্ঘায়িত হলে আন্তর্জাতিক বাজারেও বড় ধরনের প্রভাব পড়তে পারে। বিশেষজ্ঞরা আশঙ্কা করছেন, যদি পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে না আসে, তাহলে এটি ধীরে ধীরে একটি সর্বাত্মক আঞ্চলিক যুদ্ধে রূপ নিতে পারে।

এদিকে আমিরাত এতদিন যুক্তরাষ্ট্রের ঘনিষ্ঠ নিরাপত্তা সহযোগী হয়েও ইরানের সঙ্গে সীমিত অর্থনৈতিক যোগাযোগ বজায় রাখার কৌশল নিয়েছিল। দু’পক্ষের মধ্যে বাণিজ্য ও কূটনৈতিক যোগাযোগ পুরোপুরি বন্ধ হয়নি। কিন্তু সাম্প্রতিক হামলার পর সেই সূক্ষ্ম ভারসাম্য ভেঙে পড়েছে বলেই ধারণা করা হচ্ছে।

সব মিলিয়ে, ইরানের হামলা শুধু তাৎক্ষণিক সামরিক প্রতিক্রিয়া নয়; এটি একটি কৌশলগত সংকেত। ইসরাইলের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা এবং মার্কিন সামরিক উপস্থিতির কারণে আমিরাত এখন সরাসরি সংঘাতের কেন্দ্রে। আন্তর্জাতিক মহল পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে। প্রশ্ন এখন একটাই—এই উত্তেজনা কি সীমিত থাকবে, নাকি মধ্যপ্রাচ্যকে আরও গভীর অস্থিরতার দিকে ঠেলে দেবে?

আকাশজমিন / আরআর     


এ সম্পর্কিত আরো খবর