‘আমেরিকা ফার্স্ট’ স্লোগান তুলে বিদেশে যুদ্ধ এড়িয়ে চলার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। কিন্তু এক দশক পর সেই ট্রাম্পই এখন বিদেশে মার্কিন সামরিক শক্তি প্রয়োগে আগের চেয়ে বেশি আগ্রহী বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।
২০১৬ সালে প্রথম প্রেসিডেন্ট পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার সময় ট্রাম্প মার্কিন সামরিক হস্তক্ষেপের তীব্র সমালোচনা করেন। তিনি বলেছিলেন, ‘শাসনব্যবস্থা পরিবর্তন একটি প্রমাণিত, সম্পূর্ণ ব্যর্থ নীতি’ এবং বিদেশি সরকার উৎখাতের চর্চা বন্ধ করার অঙ্গীকার করেছিলেন। ২০২৪ সালের নির্বাচনে তিনি গর্ব করে বলেন, তাঁর আমলে কোনো নতুন যুদ্ধ শুরু হয়নি। একই সঙ্গে সতর্ক করেন, কমলা হ্যারিস জয়ী হলে যুক্তরাষ্ট্র তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধে জড়িয়ে পড়তে পারে।
কিন্তু বর্তমানে চিত্র ভিন্ন। ট্রাম্প এখন ইরানের বিরুদ্ধে পূর্ণ সামরিক শক্তি ব্যবহারের পথে হাঁটছেন এবং সেখানে সরকার পরিবর্তনের আহ্বান জানিয়েছেন। ইরানে সাম্প্রতিক বোমা হামলা ছিল তাঁর দ্বিতীয় মেয়াদের অষ্টম সামরিক অভিযান। এর আগে তিনি ভেনেজুয়েলার সরকারকে অচল করার উদ্যোগ নেন এবং কিউবার শাসককে উৎখাতের হুমকি দেন।
মধ্যরাতে দেওয়া এক ভিডিও বার্তায় ট্রাম্প ইরানের বিরুদ্ধে দীর্ঘ অভিযোগের তালিকা তুলে ধরেন। তিনি পারমাণবিক কর্মসূচি, ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র উন্নয়ন, যুক্তরাষ্ট্রবিরোধী গোষ্ঠীগুলোকে সমর্থন, ১৯৭৯ সালের তেহরানে মার্কিন দূতাবাস দখল এবং সাম্প্রতিক বিক্ষোভ দমনের প্রসঙ্গ উল্লেখ করেন। তবে কেন এই মুহূর্তে সামরিক পদক্ষেপ নেওয়া হলো—সে বিষয়ে স্পষ্ট ব্যাখ্যা দেননি।
ট্রাম্পের বক্তব্যে কিছু অসংগতি নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। গত গ্রীষ্মে ইসরায়েলের সঙ্গে যৌথ হামলার পর তিনি দাবি করেছিলেন, ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়েছে। সাম্প্রতিক ভাষণেও তিনি একই দাবি পুনর্ব্যক্ত করেন। কিন্তু কর্মসূচি ধ্বংস হয়ে থাকলে আবার হামলার প্রয়োজন কেন—সে প্রশ্নের জবাব মেলেনি।
এবার তিনি সরাসরি ইরানে শাসনব্যবস্থা পরিবর্তনের আহ্বান জানান। ইরানিদের উদ্দেশে বলেন, ‘আমরা কাজ শেষ হলে আপনারাই আপনাদের সরকার দখল করুন।’ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তিনি দাবি করেন, হামলায় আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি নিহত হয়েছেন এবং তাঁকে ইতিহাসের ‘সবচেয়ে খারাপ মানুষ’ বলে উল্লেখ করেন। তবে ইরানিরা কীভাবে সরকারের নিয়ন্ত্রণ নেবে, সে বিষয়ে তাঁর বক্তব্য পরিষ্কার নয়।
সমালোচনা ও সমর্থন—দুই দিক থেকেই প্রতিক্রিয়া এসেছে। ক্যাটো ইনস্টিটিউটের গবেষক ব্রেন্ডান পি বাক বলেন, ২০১৬ সালে যে নীতির বিরুদ্ধে ট্রাম্প প্রচার করেছিলেন, এখন সেটিই তাঁর লক্ষ্য। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ট্রাম্পের পুরোনো বক্তব্যও ঘুরে বেড়াচ্ছে—যেখানে তিনি শাসনব্যবস্থা পরিবর্তনের রাজনীতির সমালোচনা করেছিলেন।
ডানপন্থী পডকাস্টার টাকার কার্লসন ও সাবেক কংগ্রেস সদস্য মার্জরি টেইলর গ্রিন হামলার সমালোচনা করেছেন। অন্যদিকে রিপাবলিকান কংগ্রেস সদস্য মার্লিন স্টুটজম্যান মনে করেন, এই পদক্ষেপ ভবিষ্যতের বড় হুমকি ঠেকাবে। ইরানবিষয়ক কঠোর নীতির সমর্থক মার্ক ডুবোভিটজ বলেন, ট্রাম্প সরাসরি শাসনব্যবস্থা পরিবর্তনের ঘোষণা দেননি; বরং বিষয়টি ইরানি জনগণের ওপর ছেড়ে দিয়েছেন।
বিশ্লেষকদের মতে, ট্রাম্পের প্রথম ও দ্বিতীয় মেয়াদের মধ্যে বড় পার্থক্য দেখা যাচ্ছে। প্রথম মেয়াদে অভিজ্ঞ সামরিক ও প্রশাসনিক কর্মকর্তারা তাঁকে সংযত করতেন। এবার তাঁর চারপাশে আছেন এমন উপদেষ্টারা, যারা সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে বেশি মনোযোগী।
২০২০ সালে ইরানের জেনারেল কাসেম সোলাইমানিকে হত্যার পর বড় প্রতিক্রিয়া না হওয়ায় ট্রাম্প আরও আত্মবিশ্বাসী হন। তবে আফগানিস্তান ও ইরাকের মতো দীর্ঘস্থায়ী স্থলযুদ্ধে তিনি এখনো জড়াননি। আপাতত আকাশপথের শক্তি ব্যবহারে সীমাবদ্ধ থাকতে চাইছেন।
এই কৌশলের ফল নির্ভর করবে পরবর্তী পরিস্থিতির ওপর। সরকার পতন হলেও নতুন শাসনব্যবস্থা যুক্তরাষ্ট্রপন্থী হবে কি না, কিংবা বিশৃঙ্খলা তৈরি হবে কি না—সে প্রশ্ন এখনো উন্মুক্ত।
আকাশজমিন / আরআর