আন্তর্জাতিক ডেস্ক
ইরান-ইসরাইল ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার চলমান উত্তেজনার মধ্যে বেইজিংয়ের অবস্থান পরিষ্কার করে চীন জানিয়েছে, তারা ইরানকে কোনো ধরণের সামরিক সহায়তা বা অস্ত্র সরবরাহ করবে না। চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, ইরানের প্রতি তাদের সমর্থন কেবল রাজনৈতিক ও নৈতিক পর্যায়ের। তবে চীন দ্ব্যর্থহীন কণ্ঠে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের সামরিক অভিযানের তীব্র নিন্দা জানিয়েছে।
চীনের মতে, ইরানের সঙ্গে পারমাণবিক আলোচনার প্রক্রিয়া সঠিক পথে এগোচ্ছিল। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল এই কূটনৈতিক প্রক্রিয়াকে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে নস্যাৎ করে দিয়ে অঞ্চলটিকে ‘অপরিবর্তনীয়’ সংঘাতের দিকে ঠেলে দিয়েছে। চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ই সোমবার (২ মার্চ) ওমান, ইরান ও ফ্রান্সের পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের সঙ্গে ফোনালাপে বর্তমান পরিস্থিতির ভয়াবহতা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তিনি জানান, চীন এই সংঘাত অবিলম্বে বন্ধ করে আলোচনার টেবিলে ফিরে আসার আহ্বান জানাচ্ছে।
চীন ইরানের আঞ্চলিক সার্বভৌমত্ব ও স্বার্থ রক্ষার অধিকার সমর্থন করলেও কোনো ধরনের পাল্টা প্রতিশোধমূলক হামলার বিষয়ে সরাসরি অনুমোদন দেয়নি। বেইজিং অর্থনৈতিকভাবে ইরানের অন্যতম প্রধান অংশীদার ও মিত্র, কিন্তু সংঘাত বৃদ্ধির কারণে নৌপথ ও জ্বালানি অবকাঠামোর ক্ষতি হলে চীনের বৃহত্তম অর্থনীতির জন্য সমস্যা সৃষ্টি হবে।
উল্লেখ্য, চীনের মোট জ্বালানি তেলের প্রায় ৭০ শতাংশ আমদানি হয়, যার অর্ধেকই আসে হরমুজ প্রণালীর মাধ্যমে। এই নৌপথের নিরাপত্তা চীনের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ইরান ছাড়াও সৌদি আরব, ইরাক এবং কুয়েত থেকে তেল আমদানিতে হরমুজ প্রণালী একটি গুরুত্বপূর্ণ সেতু হিসেবে কাজ করে। এ কারণে আঞ্চলিক অস্থিরতা চীনের জন্য গভীর উদ্বেগের বিষয়।
চীনের এই অবস্থান আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে একটি স্পষ্ট সংকেত হিসেবে দেখা হচ্ছে। তারা চাইছে, পারমাণবিক আলোচনা ও কূটনৈতিক চ্যানেল কার্যকর রাখার মাধ্যমে সমস্যা সমাধান করা হোক। চীনের বক্তব্য থেকে বোঝা যাচ্ছে যে, তারা সামরিক উত্তেজনায় অংশগ্রহণ বা অস্ত্র সরবরাহের মাধ্যমে সংঘাত জোরদার করবে না।
চীনের বিবৃতি অনুযায়ী, তারা যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সামরিক হুমকির বিরুদ্ধে নিন্দা জানিয়েছে, তবে সরাসরি সামরিক প্রতিক্রিয়ার কোনো ঘোষণা দেয়নি। এটি একটি সতর্কবাণীও বটে, যা প্রমাণ করে যে চীন এই অঞ্চলের স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে এবং কূটনৈতিক মাধ্যমে সমস্যার সমাধান করতে আগ্রহী।
বিশ্লেষকরা মনে করছেন, চীনের এমন অবস্থান ইরানকে সামরিকভাবে সমর্থন না করলেও কূটনৈতিকভাবে শক্তি প্রদর্শনের অংশ। এটি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে একটি বার্তা যে, চীন শুধুমাত্র রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক মিত্র হিসেবে কার্যকর থাকবে, সামরিক সহায়তা বা যুদ্ধকে উৎসাহিত করবে না।
অঞ্চলের স্থিতিশীলতা ও নিরাপত্তা চীনের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। চীনের বৃহৎ অর্থনীতি ও বিশ্ব বাণিজ্যের সঙ্গে এই অঞ্চলের সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে। হরমুজ প্রণালীতে অস্থিরতা, তেলের দাম বৃদ্ধি এবং বাণিজ্যিক ক্ষতি চীনের অর্থনীতির ওপর প্রভাব ফেলতে পারে।
চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এও জানিয়েছে, তারা ইরান-যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইল সংঘাতের সমাধানের জন্য সব ধরনের কূটনৈতিক চেষ্টা অব্যাহত রাখবে। বেইজিং আশা করছে, পারস্পরিক আলোচনার মাধ্যমে এই সংকট শান্তিপূর্ণভাবে সমাধান করা সম্ভব হবে।
চীনের এই অবস্থান থেকে স্পষ্ট, তারা ইরানের প্রতি সমর্থন দেখাবে, কিন্তু সামরিক স্তরে কোনো হস্তক্ষেপ করবে না। এটি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের মধ্যে চীনের দায়িত্বশীল কূটনৈতিক ভূমিকাকে প্রমাণ করে।