আরব উপসাগরীয় অঞ্চলের জ্বালানি ও বেসামরিক স্থাপনাগুলোতে সাম্প্রতিক ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলার পেছনে ইসরায়েল জড়িত—এমন অভিযোগ তুলেছে ইরান। তেহরানের দাবি, এসব হামলা একটি পরিকল্পিত কৌশলের অংশ, যার লক্ষ্য আঞ্চলিক ক্ষোভ উসকে দেওয়া এবং আরব দেশগুলোকে ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধে টেনে আনা।
ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা মিডল ইস্ট আইকে জানান, সৌদি আরবে সংঘটিত বেশ কয়েকটি ড্রোন হামলার পেছনে ইসরায়েলের হাত রয়েছে। তিনি দাবি করেন, ওমানের অন্তত একটি হামলার ক্ষেত্রেও একই দায় প্রযোজ্য। নাম প্রকাশ না করার শর্তে ওই কর্মকর্তা বলেন, “আমি সুনির্দিষ্টভাবে বলতে পারি, বেশ কিছু হামলা আমাদের (ইরান) পক্ষ থেকে চালানো হয়নি।”
তবে তিনি নির্দিষ্ট করে বলেননি, কোন কোন হামলার জন্য ইসরায়েল দায়ী। সৌদি আরব অন্তত পাঁচবার ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলার শিকার হয়েছে বলে জানা গেছে। এর মধ্যে প্রিন্স সুলতান বিমানঘাঁটি, রাস তানুবা তেল শোধনাগার এবং রিয়াদে অবস্থিত মার্কিন দূতাবাস উল্লেখযোগ্য। ওমানের দুকম বন্দরেও দুবার হামলার ঘটনা ঘটেছে। ২০১৯ সাল থেকে এই বন্দর মার্কিন নৌবাহিনীর ব্যবহারের সুযোগ পেয়ে আসছে।
ইরানি ওই কর্মকর্তা কোনো ইরান-সমর্থিত গোষ্ঠীর সম্পৃক্ততার বিষয়ে মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানান। তবে গত বুধবার পর্যন্ত ইরাকের শিয়া গোষ্ঠীগুলো কোনো আন্তসীমান্ত হামলা চালায়নি বলে দাবি করা হয়েছে। তারা তাদের প্রতিক্রিয়া ইরাকের অভ্যন্তরে মার্কিন স্থাপনাতেই সীমিত রেখেছে।
গত শনিবার থেকে ইরান মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে মার্কিন স্থাপনাগুলোকে লক্ষ্য করে হামলা চালাচ্ছে। তেহরানের ভাষ্য অনুযায়ী, এটি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের বিশাল যৌথ আগ্রাসনের প্রতিশোধ। ওই হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি নিহত হন বলে দাবি করা হয়েছে।
প্রথমদিকে ইরান মার্কিন সামরিক স্থাপনায় হামলা চালালেও পরবর্তীতে উপসাগরীয় দেশগুলো অভিযোগ করে যে বেসামরিক অবকাঠামোও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। হোটেল, বিমানবন্দর ও জ্বালানিকেন্দ্রেও হামলার ঘটনা ঘটেছে। তবে ইরানি কর্মকর্তারা উপসাগরীয় জ্বালানিকেন্দ্রে সরাসরি হামলার অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।
সংঘাতের পাঁচ দিনে সৌদি আরব ও কাতারের তেল ও গ্যাস রপ্তানির সক্ষমতা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে জানা গেছে। দুবাইয়ের ‘নিরাপদ আশ্রয়’ হিসেবে যে ভাবমূর্তি ছিল, তাতেও আঘাত লেগেছে।
ইরানের দুটি পৃথক সূত্র মিডল ইস্ট আইকে জানিয়েছে, ইসরায়েলের বিদেশি গোয়েন্দা সংস্থা ‘মোসাদ’ কিছু ড্রোন হামলার সঙ্গে জড়িত থাকতে পারে। তাদের দাবি, ইরানের ভেতরেও মোসাদের তৎপরতা শনাক্ত করা হয়েছে। কর্তৃপক্ষ সম্ভাব্য গুদাম ও অপারেশনাল রুম খুঁজে বের করার চেষ্টা করছে, যেখানে ড্রোন মজুত থাকতে পারে।
ইরানি একটি সূত্র জানায়, “এই অঞ্চলের অন্যান্য দেশে মোসাদের এমন গুদাম থাকলে আমরা অবাক হব না। ইসরায়েল আমাদের উপসাগরীয় প্রতিবেশীদের লক্ষ্যবস্তু বানাতে এগুলো ব্যবহার করছে।”
বিশ্লেষকদের মতে, মোসাদ ইরানের ভেতরে এজেন্ট, তথ্যদাতা ও লজিস্টিকস সাপোর্টের বিস্তৃত নেটওয়ার্ক গড়ে তুলেছে। অতীতে দূরনিয়ন্ত্রিত স্বয়ংক্রিয় অস্ত্র দিয়ে ইরানের শীর্ষ পরমাণু বিজ্ঞানীকে হত্যা, পারমাণবিক কর্মসূচির কম্পিউটারে ম্যালওয়্যার আক্রমণ এবং নথিপত্র চুরির মতো ঘটনা ঘটেছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
অন্য একটি সূত্র জানিয়েছে, ইরান সৌদি আরবকে স্পষ্ট বার্তা দিয়েছে যে সৌদি আরামকোর রাস তানুবা শোধনাগারে হামলার পেছনে তারা ছিল না। রাস তানুবা দেশটির বৃহত্তম শোধনাগার ও গুরুত্বপূর্ণ তেল রপ্তানি টার্মিনাল।
এদিকে, উপসাগরীয় সহযোগিতা সংস্থার ছয় সদস্যের জোট ‘জিসিসি’র ভেতর থেকেও ইরানের বিরুদ্ধে আত্মরক্ষামূলক ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান উঠেছে। ভার্চ্যুয়াল বৈঠকে জিসিসির পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা বলেন, আঞ্চলিক নিরাপত্তা রক্ষায় ‘ইরানি হামলার জবাব দেওয়ার বিকল্প’ বিবেচনায় রয়েছে।
ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান উপসাগরীয় দেশগুলোর উদ্বেগ কমানোর চেষ্টা করে বলেন, তেহরান প্রতিবেশীদের সার্বভৌমত্বকে সম্মান করে এবং কেবল আত্মরক্ষামূলক পদক্ষেপ নিচ্ছে। তিনি বলেন, “আমরা আপনাদের সঙ্গে নিয়ে কূটনীতির মাধ্যমে যুদ্ধ এড়ানোর চেষ্টা করেছি। কিন্তু আমেরিকা-জায়নবাদী সামরিক আগ্রাসন আমাদের আত্মরক্ষা ছাড়া আর পথ রাখেনি।”
তেহরান পলিটেকনিক ইউনিভার্সিটির সহকারী অধ্যাপক সৈয়দ ইমামিয়ান বলেন, ইরান ও উপসাগরীয় দেশগুলোর মধ্যে দীর্ঘ কূটনৈতিক প্রচেষ্টার প্রেক্ষাপটে এসব হামলার পেছনে ইসরায়েলের সংশ্লিষ্টতার সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যায় না। তাঁর মতে, ইরান সাধারণত যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল-সংশ্লিষ্ট স্থাপনাকে লক্ষ্য করে; বেসামরিক ও অ-মার্কিন স্থাপনায় হামলা হলে তা হয় কারিগরি ত্রুটি, নয়তো অন্য পক্ষের উসকানি হতে পারে।
কাতারের সাবেক প্রধানমন্ত্রী হামাদ বিন জাসিম বিন জাবের আল-থানি জিসিসিকে ইরানের সঙ্গে সরাসরি সংঘাতে না জড়ানোর আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি সতর্ক করে বলেন, সরাসরি সংঘাত উভয় পক্ষের সম্পদ নিঃশেষ করবে এবং বাইরের শক্তিগুলোকে প্রভাব বিস্তারের সুযোগ দেবে।
ইসলামিক ওয়ার্ল্ড এডুকেশনাল, সায়েন্টিফিক অ্যান্ড কালচারাল অর্গানাইজেশনের মহাসচিব আবদুল আজিজ আলতুওয়াইজিরি বলেন, উপসাগরীয় দেশে ড্রোন হামলার ঘটনা অনেক সন্দেহের জন্ম দিচ্ছে। তাঁর মতে, ইসরায়েল অঞ্চলটিকে বৃহত্তর সংঘাতে ঠেলে দিতে পারে।
ন্যাশনাল ইরানিয়ান আমেরিকান কাউন্সিলের জ্যেষ্ঠ গবেষণাবিশ্লেষক সিনা তুসি বলেন, উপসাগরীয় দেশগুলো সরাসরি ইরানের বিপক্ষে অবস্থান নিলে তা ইসরায়েলের কৌশলগত স্বার্থ রক্ষা করবে। এতে সংঘাত আঞ্চলিক রূপ নেবে এবং তেহরান আরও বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়বে।
বিশ্লেষকদের মতে, সাম্প্রতিক উত্তেজনার মধ্যেও ইরান উপসাগরীয় দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক মেরামতে বিনিয়োগ করেছে। সরাসরি যুদ্ধ সেই কূটনৈতিক অর্জনকে ধ্বংস করে দিতে পারে। ফলে অঞ্চলটি এক অনিয়ন্ত্রিত সংঘাতের দিকে এগোতে পারে, যার প্রভাব বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারেও পড়বে।