আন্তর্জাতিক ডেস্ক
বিশ্বজুড়ে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা এতদিন যা ধরা হতো, বাস্তবে তা অনেক বেশি হতে পারে। এতে উপকূলীয় অঞ্চলে বসবাসকারী কোটি কোটি মানুষ আগের ধারণার তুলনায় আরও ঝুঁকিতে পড়তে পারেন।
নেদারল্যান্ডসের ওয়াগেনিনজেন বিশ্ববিদ্যালয়ের দুই গবেষকের সম্প্রতি পরিচালিত একটি গবেষণা বিজ্ঞান সাময়িকী নেচারে প্রকাশিত হয়েছে। গবেষণায় ২০০৯ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে প্রকাশিত ৩৮৫টি সমুদ্রপৃষ্ঠ ও উপকূলীয় বন্যা সংক্রান্ত গবেষণা বিশ্লেষণ করা হয়েছে।
গবেষকরা দেখেছেন, অধিকাংশ গবেষণায় সমুদ্রপৃষ্ঠের প্রকৃত উচ্চতা মাপার পরিবর্তে গাণিতিক মডেলের ওপর নির্ভর করা হয়েছে। এসব মডেল পৃথিবীর ঘূর্ণন, মহাকর্ষ এবং অন্যান্য তাত্ত্বিক উপাদানের ওপর ভিত্তি করে সমুদ্রপৃষ্ঠের অবস্থান অনুমান করে, কিন্তু জোয়ার-ভাটা, স্রোত, বাতাস ও তাপমাত্রার মতো বাস্তব উপাদান পুরোপুরি বিবেচনায় নেয় না। ফলে অনেক ক্ষেত্রে প্রকৃত সমুদ্রপৃষ্ঠ পূর্বের হিসাবের তুলনায় অনেক বেশি হতে পারে।
গবেষকদের হিসাব অনুযায়ী, যদি সমুদ্রপৃষ্ঠ তিন ফুট বাড়ে, তবে পূর্ব ধারণার তুলনায় প্রায় ৩৭ শতাংশ বেশি ভূমি পানির নিচে চলে যেতে পারে। এতে বিশ্বজুড়ে প্রায় সাত কোটি ৭০ লাখ থেকে ১৩ কোটি ২০ লাখ মানুষ প্লাবনের ঝুঁকিতে পড়তে পারেন।
গবেষণায় আরও বলা হয়েছে, গড়ে উপকূলীয় এলাকায় সমুদ্রপৃষ্ঠের প্রকৃত উচ্চতা আগের মডেলের তুলনায় প্রায় এক ফুট বেশি। এ পার্থক্য সবচেয়ে বেশি দেখা গেছে আফ্রিকা, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া এবং প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের কিছু দেশে। এখানে সরাসরি সমুদ্রপৃষ্ঠ পরিমাপের যন্ত্র কম থাকায় মডেলের ওপর বেশি নির্ভর করতে হয়।
উত্তর আমেরিকার পশ্চিম উপকূলেও সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা কম ধরা হয়েছিল। বিশেষ করে ক্যালিফোর্নিয়ার উপকূলে প্রকৃত সমুদ্রপৃষ্ঠ আগের হিসাবের তুলনায় প্রায় ০.২৫ থেকে ২ মিটার পর্যন্ত বেশি হতে পারে।
গবেষকরা বলছেন, সমুদ্রপৃষ্ঠের প্রকৃত উচ্চতা বিবেচনায় নিয়ে উপকূলীয় শহরগুলোর পরিকল্পনা ও ঝুঁকি মূল্যায়ন নতুন করে হালনাগাদ করা জরুরি। এতে ভবিষ্যতে সম্ভাব্য ক্ষতি মোকাবিলায় কার্যকর প্রস্তুতি নেওয়া সহজ হবে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, সমুদ্রপৃষ্ঠের এই বাস্তব পরিমাপ উপকূলীয় নগর ও শিল্পাঞ্চলের জন্য গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশক হতে পারে। সমুদ্রপৃষ্ঠ বেড়ে গেলে উপকূলীয় বন্যা, ঘূর্ণিঝড় এবং লবণাক্ত জল প্রবাহের মাত্রা বৃদ্ধি পাবে। ফলে নদী মুখের শহর, সমুদ্রপৃষ্ঠের কাছাকাছি নগরায়ন ও কৃষিভূমি বিপদের মুখে পড়বে।
গবেষণাটি আন্তর্জাতিকভাবে উপকূলীয় ঝুঁকি, নগর পরিকল্পনা এবং জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মূল্যায়নের ক্ষেত্রে নতুন দৃষ্টিকোণ প্রদান করবে। এছাড়া এটি বিশ্বব্যাপী মানববসতি, অর্থনীতি এবং নিরাপত্তার ওপর সম্ভাব্য প্রভাবের বিষয়ে সতর্ক করবে।
সূত্র: লস অ্যাঞ্জেলেস টাইমস