আন্তর্জাতিক ডেস্ক
মধ্যপ্রাচ্যে ইরানের সঙ্গে চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষেপণাস্ত্রের মজুতের ওপর চাপ তৈরি হয়েছে। এই পরিস্থিতিতে তুলনামূলক কম খরচে আকাশ প্রতিরক্ষা জোরদার করতে ইউক্রেনের তৈরি ইন্টারসেপ্টর বা ‘শাহেদ-হান্টার’ ড্রোন কেনার বিষয়ে আগ্রহ দেখাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র ও উপসাগরীয় দেশগুলো।
প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকদের মতে, আধুনিক যুদ্ধক্ষেত্রে ড্রোন একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। বিশেষ করে ইরানি নকশার ‘শাহেদ’ ড্রোন বিভিন্ন সংঘাতে ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হওয়ায় এগুলো প্রতিহত করার কার্যকর ও কম ব্যয়বহুল প্রযুক্তির প্রয়োজনীয়তা বেড়েছে। এই প্রেক্ষাপটে ইউক্রেনের তৈরি ইন্টারসেপ্টর ড্রোন নতুন একটি সম্ভাবনা তৈরি করেছে।
বর্তমানে ইন্টারসেপ্টর প্রযুক্তির উল্লেখযোগ্য উৎপাদক হিসেবে উঠে এসেছে ইউক্রেন। দেশটি যুক্তরাষ্ট্র ও তার উপসাগরীয় মিত্রদের কাছে এই প্রযুক্তি বিক্রির প্রস্তাব দিয়েছে। এর বিনিময়ে ইউক্রেন এমন কিছু উন্নত অস্ত্র ও সামরিক প্রযুক্তি পেতে আগ্রহী, যেগুলো তারা নিজেদের দেশে তৈরি করতে পারে না।
২০২২ সালে রাশিয়ার পূর্ণমাত্রার আগ্রাসনের পর ইউক্রেন দ্রুত নিজেদের প্রতিরক্ষা শিল্পকে নতুনভাবে গড়ে তোলার উদ্যোগ নেয়। বিশেষ করে ড্রোনভিত্তিক প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার উন্নয়নে দেশটি ব্যাপক বিনিয়োগ করে। এর ফলে তুলনামূলক কম খরচে কার্যকর ড্রোন প্রযুক্তি তৈরি করতে সক্ষম হয়েছে ইউক্রেনীয় প্রতিরক্ষা খাত।
এই প্রযুক্তির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো ইন্টারসেপ্টর ড্রোন, যেগুলো মূলত শত্রুপক্ষের আক্রমণকারী ড্রোন ধ্বংস করার জন্য তৈরি করা হয়েছে। বিশেষ করে ইরানি নকশার ‘শাহেদ’ ড্রোন প্রতিহত করার জন্য এসব ড্রোন ব্যবহার করা হচ্ছে। বর্তমানে রাশিয়া যুদ্ধক্ষেত্রে এই ধরনের ড্রোন ব্যাপকভাবে ব্যবহার করছে।
সাধারণত একটি আক্রমণকারী ড্রোন ধ্বংস করতে পশ্চিমা দেশগুলোর উন্নত আকাশ প্রতিরক্ষা ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করা হয়, যার প্রতিটির মূল্য কয়েক লাখ ডলার পর্যন্ত হতে পারে। ফলে স্বল্পমূল্যের ড্রোন ধ্বংস করতে ব্যয়বহুল ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করা অনেক সময় অর্থনৈতিকভাবে অকার্যকর হয়ে পড়ে। এই সমস্যার সমাধান হিসেবে ইউক্রেনের ইন্টারসেপ্টর ড্রোনকে অনেক বিশেষজ্ঞ কার্যকর বিকল্প হিসেবে দেখছেন।
ইন্টারসেপ্টর ড্রোন নির্মাতা প্রতিষ্ঠান স্কাইফল জানিয়েছে, তারা বর্তমানে প্রতি মাসে প্রায় ৫০ হাজার ড্রোন তৈরি করতে সক্ষম। এর মধ্যে ৫ থেকে ১০ হাজার ড্রোন বিদেশে রফতানি করার সক্ষমতাও রয়েছে বলে জানিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি।
স্কাইফলের পক্ষ থেকে আরও জানানো হয়েছে, বিদেশি বাহিনীর সদস্যদের জন্য ইন্টারসেপ্টর ড্রোন পরিচালনার প্রশিক্ষণ দেওয়ার ব্যবস্থাও রয়েছে। প্রয়োজন হলে মাত্র তিন সপ্তাহের প্রশিক্ষণের মাধ্যমে এসব ড্রোন ব্যবহারে দক্ষ করে তোলা সম্ভব বলে দাবি করেছে প্রতিষ্ঠানটি।
তবে ২০২২ সালে ইউক্রেন যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর দেশটির জন্য অস্ত্র রফতানির ওপর কিছু বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়। সেই কারণে ইউক্রেনের অনেক প্রতিরক্ষা কোম্পানি আন্তর্জাতিক বাজারে সরাসরি প্রবেশ করতে পারেনি। তবুও বিভিন্ন দেশের কাছ থেকে এসব ড্রোনের ব্যাপক আগ্রহের কথা জানাচ্ছে ইউক্রেনীয় প্রতিষ্ঠানগুলো।
ডিফেন্স এক্সপ্রেসের প্রধান সম্পাদক ওলেহ কাটকভ বলেন, প্রযুক্তিগতভাবে অন্য দেশগুলোও ইন্টারসেপ্টর ড্রোন তৈরি করতে সক্ষম। তবে যুদ্ধক্ষেত্রে পরীক্ষিত প্রযুক্তি এবং ব্যাপক উৎপাদন সক্ষমতার দিক থেকে বর্তমানে ইউক্রেন উল্লেখযোগ্য অবস্থানে রয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, যদি যুক্তরাষ্ট্র ও উপসাগরীয় দেশগুলো ইউক্রেনের এই প্রযুক্তি গ্রহণ করে, তাহলে ড্রোন প্রতিরক্ষা ব্যবস্থায় একটি নতুন ধারা তৈরি হতে পারে। এতে কম খরচে আকাশ প্রতিরক্ষা জোরদার করা সম্ভব হবে এবং আধুনিক যুদ্ধক্ষেত্রে ড্রোন হামলা মোকাবিলা আরও কার্যকর হতে পারে।