আন্তর্জাতিক ডেস্ক
ইরানকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে চলমান সংঘাত ক্রমেই আরও ভয়াবহ রূপ নিচ্ছে। টানা আট দিন ধরে চলা হামলা-পাল্টা হামলার মধ্যেও যুদ্ধ থামার কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। বরং দুই পক্ষই হামলার মাত্রা আরও বাড়িয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে ইরানকে নিঃশর্ত আত্মসমর্পণের আহ্বান জানিয়ে তা প্রত্যাখ্যাত হওয়ার পর আরও কঠোর অবস্থান নিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প।
সাম্প্রতিক বক্তব্যে তিনি ইরানের সম্ভাব্য সব নেতাকে হত্যার হুমকি দিয়েছেন বলে জানিয়েছে রয়টার্স। শনিবার (৭ মার্চ) যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টের বিশেষ বিমান এয়ার ফোর্স ওয়ানে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলার সময় তিনি এই মন্তব্য করেন।
রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সংঘাতের অষ্টম দিনে ট্রাম্প সাংবাদিকদের জানান, ইরানের সঙ্গে কোনো ধরনের আলোচনায় আগ্রহী নন তিনি। তার ভাষায়, যুদ্ধ তখনই শেষ হবে যখন তেহরানের আর কার্যকর কোনো সেনাবাহিনী থাকবে না অথবা ক্ষমতায় কোনো নেতৃত্ব অবশিষ্ট থাকবে না।
ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেন, যদি ইরানের সম্ভাব্য সব নেতা নিহত হন এবং দেশটির সামরিক শক্তি সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে যায়, তাহলে আলোচনার কোনো প্রশ্নই থাকবে না। তিনি আরও বলেন, এমনও সময় আসতে পারে যখন ‘আমরা আত্মসমর্পণ করছি’—এ কথা বলার মতো কেউই আর বেঁচে থাকবে না।
এর আগে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে ইরানকে নিঃশর্ত আত্মসমর্পণের আহ্বান জানান মার্কিন প্রেসিডেন্ট। একই সঙ্গে তিনি জানান, ইরানের পরবর্তী নেতৃত্ব নির্বাচনেও যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা থাকা উচিত বলে মনে করেন তিনি। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনা ছাড়া নতুন কোনো নেতৃত্ব নির্বাচন করা হলে তা গ্রহণযোগ্য হবে না বলেও ইঙ্গিত দেন ট্রাম্প।
ট্রাম্পের এই বক্তব্যের পরপরই তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে ইরান। দেশটির প্রেসিডেন্ট ঘোষণা দিয়েছেন, ইরান কখনোই আত্মসমর্পণ করবে না। তিনি বলেন, দেশের সার্বভৌমত্ব ও স্বাধীনতা রক্ষায় ইরান শেষ পর্যন্ত লড়াই চালিয়ে যাবে।
মধ্যপ্রাচ্যে বর্তমান সংঘাতের সূত্রপাত ঘটে গত ২৮ ফেব্রুয়ারি। ওই দিন ঘোষণা ছাড়াই ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান শুরু করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল। প্রথম দফার হামলাতেই ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি ও তার পরিবারের সদস্যদের হত্যা করা হয় বলে দাবি করা হয়েছে। পাশাপাশি ইরানের সেনাবাহিনীর শীর্ষস্থানীয় কয়েকজন কমান্ডারও নিহত হন।
এই ঘটনার পরপরই পাল্টা প্রতিক্রিয়া জানায় তেহরান। ইসরায়েল অধিকৃত অঞ্চল এবং মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে থাকা মার্কিন স্বার্থসংশ্লিষ্ট স্থাপনাগুলোর ওপর ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা শুরু করে ইরান। টানা নয় দিন ধরে চলা এই হামলা-পাল্টা হামলায় মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি অত্যন্ত উত্তেজনাপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
এদিকে মার্কিন প্রেসিডেন্টের কঠোর হুমকির পর ইরানও নতুন করে হামলার প্রস্তুতি নিচ্ছে বলে বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে। মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনএনকে ইরানের এক শীর্ষ কর্মকর্তা বলেন, যুক্তরাষ্ট্র সরাসরি ইরানি জনগণের বিরুদ্ধে যুদ্ধের বিস্তার ঘটানোর হুমকি দিয়েছে। তাই ইরান এখন যুক্তরাষ্ট্রের অঞ্চল, বাহিনী এবং সহযোগী প্রতিষ্ঠানগুলোর সম্ভাব্য লক্ষ্যবস্তু নিয়ে নতুন করে পর্যালোচনা করছে।
তিনি আরও জানান, যেসব মার্কিন স্থাপনা এখনো ইরানের সশস্ত্র বাহিনীর লক্ষ্যবস্তু তালিকায় নেই, সেগুলোও অন্তর্ভুক্ত করা হতে পারে। পরিস্থিতি অনুযায়ী সেসব লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালানো হবে।
এরই মধ্যে সৌদি আরব, কাতার ও সংযুক্ত আরব আমিরাতসহ মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র দেশগুলোর বিভিন্ন স্থাপনায় নতুন দফায় হামলা চালিয়েছে ইরান। সর্বশেষ হামলায় প্রথমবারের মতো হাইপারসনিক মিসাইল ব্যবহারের ঘোষণাও দিয়েছে দেশটি।
বিশ্লেষকদের মতে, চলমান এই সংঘাত দ্রুত থামানো না গেলে পুরো মধ্যপ্রাচ্য আরও বড় যুদ্ধের ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে।