দীর্ঘ আট মাস কারাভোগ ও নানা প্রশাসনিক প্রক্রিয়া শেষে অবশেষে নিজ দেশে ফিরেছেন ভারতের নাগরিক ফাল্গুনী রায়। রবিবার (৮ মার্চ) আন্তর্জাতিক নারী দিবসের দিনে চুয়াডাঙ্গার দর্শনা সীমান্ত দিয়ে তাকে ভারতের অভিবাসন পুলিশের কাছে হস্তান্তর করা হয়।
জানা গেছে, ভারতের উত্তর ২৪ পরগনা জেলার বনগা এলাকার বাসিন্দা ফাল্গুনী রায় (২৯) প্রথম স্বামী ও সন্তানের খোঁজে বৈধ পাসপোর্ট ও ভিসা নিয়ে বাংলাদেশে এসেছিলেন। তবে সেই খোঁজ শেষ পর্যন্ত তাকে ঠেলে দেয় প্রতারণা, অপমান এবং কারাবাসের কঠিন বাস্তবতায়।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, প্রায় ১০ থেকে ১১ বছর আগে বাংলাদেশের পিরোজপুর জেলার স্বরূপকাঠি উপজেলার বাসিন্দা গৌরাঙ্গ সরকার নিজের পরিচয় গোপন করে ভারতে যান। সেখানে গিয়ে তিনি ফাল্গুনী রায়কে বিয়ে করেন। বিয়ের পর তাদের সংসারে একটি পুত্রসন্তানের জন্ম হয় এবং কয়েক বছর স্বাভাবিকভাবেই সংসার জীবন কাটছিল।
কিন্তু প্রায় পাঁচ থেকে ছয় বছর পর হঠাৎ করেই গৌরাঙ্গ সরকার তাদের সন্তানকে নিয়ে বাংলাদেশে চলে আসেন এবং স্ত্রীর সঙ্গে সব ধরনের যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেন। এরপর দীর্ঘ সময় ধরে স্বামী ও সন্তানের কোনো খোঁজ না পেয়ে ফাল্গুনী রায় দুশ্চিন্তা ও অনিশ্চয়তার মধ্যে জীবন কাটাতে থাকেন।
এক পর্যায়ে প্রতিবেশী প্রসেনজিতের সঙ্গে নতুন করে সংসার শুরু করলেও প্রথম স্বামী ও সন্তানের সঙ্গে একবার দেখা করার আকাঙ্ক্ষা তার মনে থেকেই যায়। সেই ইচ্ছা থেকেই লিয়ন (৫৮ বিজিবি)-এর সদস্যরা তাকে আটক করেন। পরে তাকে মহেশপুর থানায় সোপর্দ করা হয়।
পরবর্তীতে আদালত দুটি পৃথক মামলায় তাকে বিভিন্ন মেয়াদে সাজা দেন। সেই সাজা ভোগ করতে গিয়ে তাকে ঝিনাইদহ ও চুয়াডাঙ্গা জেলা কারাগারে প্রায় আট মাস কাটাতে হয়।
দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়া, প্রশাসনিক জটিলতা এবং দুই দেশের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের আনুষ্ঠানিক কার্যক্রম সম্পন্ন হওয়ার পর অবশেষে তার নিজ দেশে ফেরার পথ সুগম হয়। এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশ অ্যামেচার রেডিও অ্যাসোসিয়েশন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।
রবিবার (৮ মার্চ) বেলা সাড়ে ১১টার দিকে চুয়াডাঙ্গার দর্শনা জয়নগর সীমান্তের শূন্যরেখায় আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে তাকে ভারতের অভিবাসন পুলিশের কাছে হস্তান্তর করা হয়।
দর্শনা ইমিগ্রেশন চেকপোস্ট পুলিশ, বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) এবং ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বিএসএফ)-এর সদস্যদের উপস্থিতিতে এই হস্তান্তর প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়।
দর্শনা ইমিগ্রেশন চেকপোস্টের উপ-পরিদর্শক (এসআই) তুহিন জানান, ফাল্গুনী রায় ভারতের উত্তর ২৪ পরগনা জেলার বনগা থানার টেংরা কলোনি এলাকার মৃত বিশ্বনাথ রায়ের মেয়ে। দীর্ঘ আট মাস সাজাভোগ শেষে বিজিবি ও বিএসএফের পতাকা বৈঠকের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী তাকে নিজ দেশে ফেরত পাঠানো হয়েছে।
হস্তান্তরের সময় বিজিবির পক্ষে উপস্থিত ছিলেন দর্শনা ক্যাম্পের সুবেদার মো. এনামুল হক এবং ভারতের বিএসএফের পক্ষে গেদে ক্যাম্পের সহকারী কমান্ড্যান্ট রাজেশ কুমার।
আন্তর্জাতিক নারী দিবসের দিনে ফাল্গুনী রায়ের এই ঘরে ফেরা যেন এক নারীর সংগ্রাম, প্রতারণা ও সীমান্তের কঠিন বাস্তবতার বিরুদ্ধে লড়াইয়ের প্রতীক হয়ে উঠেছে।