মুন্সীগঞ্জ সিভিল সার্জন কার্যালয়ের স্টেনোটাইপিস্ট মো: মিজানুর রহমানের বিরুদ্ধে ঘুষ গ্রহণ ও বিভিন্ন অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। দীর্ঘ প্রায় ৩৫ বছর ধরে তিনি ওই কার্যালয়ে কর্মরত রয়েছেন। সম্প্রতি তাকে ঘুষ নেওয়ার একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর বিষয়টি নিয়ে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়েছে।
গত মঙ্গলবার (১০ মার্চ) সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি ৪২ সেকেন্ডের ভিডিওতে দেখা যায়, মো: মিজানুর রহমান একজন ব্যক্তির সঙ্গে টাকার বিষয়ে কথা বলছেন। ভিডিওতে তাকে বলতে শোনা যায়, “কত আনছেন?” জবাবে অপর ব্যক্তি বলেন, “৫০ আনছি স্যার।” তখন মিজানুর রহমান বলেন, “আমি তো ৭০ আনতে বলছি, ৫০ হবে না।” পরে অপর ব্যক্তি বলেন, “না স্যার, আপাতত ৫০ নিতে বলছে।” এ সময় মিজানুর রহমান বলেন, “ও আচ্ছা, ঠিক আছে।”
ভিডিওটি ছড়িয়ে পড়ার পর মুন্সীগঞ্জ সিভিল সার্জন কার্যালয়ের বিভিন্ন অনিয়ম ও ঘুষ বাণিজ্য নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়। অভিযোগ রয়েছে, জেলার বিভিন্ন ডায়াগনস্টিক সেন্টার ও ক্লিনিকের লাইসেন্স প্রদান ও নবায়ন প্রক্রিয়ায় তার প্রভাব রয়েছে। লাইসেন্স বা নবায়নের জন্য সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর মালিকদের কাছ থেকে মোটা অঙ্কের অর্থ নেওয়া হয় বলে অভিযোগ উঠেছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক সিভিল সার্জন কার্যালয়ের একাধিক কর্মচারী জানান, জেলার প্রায় ৯০ শতাংশ ডায়াগনস্টিক সেন্টার ও ক্লিনিকের লাইসেন্স নিয়মিত নবায়ন করা নেই। তবে নির্দিষ্ট অঙ্কের টাকার বিনিময়ে সমঝোতা হলে নবায়ন ছাড়াই এসব প্রতিষ্ঠান পরিচালনার সুযোগ দেওয়া হয় বলে তারা দাবি করেন।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক ডায়াগনস্টিক সেন্টার মালিক বলেন, “লাইসেন্স নবায়নের জন্য দীর্ঘদিন চেষ্টা করেও কাজ হয়নি। পরে মিজান সাহেবের সঙ্গে ৮০ হাজার টাকায় সমঝোতা করার পর লাইসেন্স নবায়ন সম্ভব হয়। এরপর পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র পেতেও প্রায় ৪৫ হাজার টাকা ব্যয় করতে হয়েছে।”
সিভিল সার্জন কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, মো. মিজানুর রহমান ১৯৮৮ সালের দিকে স্টেনোটাইপিস্ট পদে মুন্সীগঞ্জ সিভিল সার্জন কার্যালয়ে যোগদান করেন। ১৯৯৯ সালে তাকে ঢাকায় বদলি করা হলেও ২০০১ সালে পুনরায় মুন্সীগঞ্জে ফিরে আসেন।
পরবর্তীতে তাকে পিরোজপুরে বদলি করা হলেও তিনি হাইকোর্টে রিট করে সেই বদলি স্থগিত করেন। সর্বশেষ ২০২৫ সালের ৩ ডিসেম্বর স্বাস্থ্য বিভাগের বিভাগীয় পরিচালক (ঢাকা) এক স্মারকে তাকে মুন্সীগঞ্জ থেকে মাদারীপুর সিভিল সার্জন কার্যালয়ে একই পদে বদলির আদেশ দেন এবং ৫ কর্মদিবসের মধ্যে নতুন কর্মস্থলে যোগদানের নির্দেশ দেওয়া হয়। তবে এবারও তিনি হাইকোর্টে রিট করে মুন্সীগঞ্জেই দায়িত্ব পালন অব্যাহত রাখেন।
এদিকে আরেকটি ঘটনায় জানা যায়, ২০২৪ সালের ২০ সেপ্টেম্বর থেকে ৪ অক্টোবর পর্যন্ত ১৫ দিনের ছুটি নিয়ে ওমরাহ পালনের উদ্দেশ্যে সৌদি আরবে যান মিজানুর রহমান। দেশে ফেরার সময় অবৈধভাবে স্বর্ণ ও সৌদি রিয়াল আনার অভিযোগে তাকে সৌদি আরবে আটক করা হয় এবং প্রায় দুই মাস কারাগারে থাকতে হয়। ফলে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে অফিসে যোগদানও করতে পারেননি তিনি।
এ বিষয়ে মো: মিজানুর রহমানের সঙ্গে কথা বলা হলে তিনি বলেন, ভিডিওটি তিনি দেখেছেন। তার দাবি, ভিডিওতে যে টাকার কথা বলা হচ্ছে সেটি তার বাসা ও দোকান ভাড়ার টাকা।
মুন্সীগঞ্জ সিভিল সার্জন ডাঃ কামরুল জমাদ্দার বলেন, তিনি টাকা নেওয়ার ভিডিওটি দেখেছেন। বিষয়টি তদন্ত করতে তিন সদস্যের একটি কমিটি গঠন করা হবে এবং তদন্তের ভিত্তিতে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
আকাশজমিন
/ আরআর