সিরাজগঞ্জ প্রতিনিধি / : 74
রেজাউল করিম ঝন্টু , সিরাজগঞ্জ
সিরাজগঞ্জের চরাঞ্চলবাসীর অর্থনীতি এখন এক বিশাল পরিবর্তনের মুখোমুখি। যমুনা নদী, যে নদীর ঢেউয়ে একসময় চরে বসবাসকারীরা কাঁপত, আজ তার নাব্যতা হারিয়ে এক বিরাট ফসলের মাঠে পরিণত হয়েছে। নদীর চিরচেনা গর্জন ও জলপ্রবাহ ধীরে ধীরে কমে যাওয়ায় চরাঞ্চলের জীবনযাত্রা ও পেশায় এসেছে আমূল পরিবর্তন। জেলেরা তাদের প্রাচীন পেশা ছেড়ে কৃষিকাজে মন দিয়েছেন। তবে নদীর এই রূপান্তর নদীজীবী, পরিবেশ ও নদী-সংক্রান্ত চ্যালেঞ্জও তৈরি করছে।
সরেজমিনে দেখা যায়, সিরাজগঞ্জের শাহজাদপুর, বেলকুচি, কাজিপুর, চৌহালী ও সদর উপজেলার যমুনা তীরবর্তী বিস্তীর্ণ এলাকায় এখন প্রায় একধরণের ধুধু বালুচর। কয়েক যুগ আগে যে ভয়াবহ ভাঙন ও নাব্যতার সংকট ছিল, তা অনেকাংশে কমে গেছে। যমুনা সেতুর উত্তর ও দক্ষিণ তীরে জেগে ওঠা এসব চরে এখন হরেক রকম ফসল যেমন বোরো ধান, তিল, কাউন, বাদাম, গম ও মসুর ধরা দিচ্ছে।
চরাঞ্চলের কৃষকরা জানান, এই চরের জমিতে চাষাবাদের খরচ তুলনামূলকভাবে কম। পলি পড়া উর্বর মাটিতে ফলন ভালো হওয়ায় তারা লাভের মুখ দেখছেন। নদীর তলদেশে জেগে ওঠা স্থানে বড় বড় গরু-মহিষের খামারও গড়ে উঠেছে। তবে নদীর পরিবর্তনের সবচেয়ে ক্ষতিকর প্রভাব পড়েছে মৎস্য সম্পদে। যমুনার বিখ্যাত ইলিশ, চিংড়ি, বোয়াল ও পাবদা মাছ প্রায় বিলুপ্তির পথে। ফলে দীর্ঘদিনের পেশা ছেড়ে জেলেরা এখন দিনমজুর বা কৃষক হিসেবে জীবিকা নির্বাহ করছেন।
নদীর তলদেশ ভরাট হওয়ায় নৌ-চলাচলও ব্যাহত হচ্ছে। চরবাসীকে যাতায়াতে সীমাহীন দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে। স্থানীয় প্রবীণ মাঝি অভিযোগ করেন, যেখানে একসময় বড় বড় ফেরি চলত, এখন সেখানে গরু বাঁধা থাকে। স্রোতের ভয়ও কমেছে, তবে মাইলের পর মাইল হেঁটে পার হওয়াই একমাত্র উপায়।
সিরাজগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মোখলেছুর রহমান বলেন, যমুনার গতিপথ পরিবর্তন প্রধান কারণেই এই নাব্যতা সংকট দেখা দিয়েছে। ইতিপূর্বে বিভিন্ন চ্যানেলে ড্রেজিং করে প্রবাহ সচল করার চেষ্টা করা হয়েছিল। তিনি জানান, নিয়মিত ও সুপরিকল্পিত ড্রেজিং করলে যমুনা নদীকে আবার তার স্বাভাবিক রূপে ফেরানো সম্ভব।
চরাঞ্চলের এই পরিবর্তন শুধু অর্থনৈতিক দিকেই সীমাবদ্ধ নয়; এটি পরিবেশ, জলবায়ু, জীববৈচিত্র্য ও সামাজিক জীবনেও বড় প্রভাব ফেলছে। নদী থেকে দূরে সরানো জেলেদের জীবিকা এখন নতুন চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। অন্যদিকে নতুন কৃষি জমিতে চাষাবাদে লোকজনের আগ্রহ বাড়লেও পরিবেশগত প্রভাব ও জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব বিবেচনা করা জরুরি।
সিরাজগঞ্জের চরাঞ্চলবাসী আশা করছেন, নদী ও চরের সংযোগ ও ব্যবস্থাপনা ঠিকঠাক হলে পুনরায় নাব্যতা বৃদ্ধি পাবে এবং মাছ, জলজ প্রাণী ও নৌপরিবহন পুনরায় সচল হবে। এ ছাড়া সরকারি সহায়তা ও কৃষি প্রশিক্ষণ দিয়ে চরাঞ্চলের মানুষকে নতুন জীবনধারায় অভ্যস্ত করতে হবে।
চরের জমিতে ফসল ও খামারের ফলে চরাঞ্চলের অর্থনীতিতে ইতিমধ্যেই ইতিবাচক প্রভাব দেখা দিয়েছে। খরচ কম এবং ফলন ভালো হওয়ায় কৃষকেরা লাভের মুখ দেখছেন। তবে নদীর প্রকৃতির পরিবর্তন ও মৎস্য সম্পদের সংকট এই অঞ্চলের বাসিন্দাদের জন্য এক দীর্ঘমেয়াদী চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
নদী ও চরাঞ্চলের এই পরিবর্তন সিরাজগঞ্জের মানুষের জীবনযাত্রায় নাটকীয় প্রভাব ফেলেছে। একদিকে খামার ও ফসল থেকে আয়ের সুযোগ, অন্যদিকে মাছের অভাব ও যাতায়াতের অসুবিধা। পরিস্থিতি সমাধানের জন্য স্থানীয় প্রশাসন ও পানি উন্নয়ন বোর্ডের সমন্বিত উদ্যোগের প্রয়োজন।
আকাশজমিন / আরআর