রাজবাড়ীর দৌলতদিয়ায় পদ্মা নদীতে ডুবে যাওয়া যাত্রীবাহী বাসটি উদ্ধারে তৎপরতা জোরদার করা হয়েছে। উদ্ধারকারী জাহাজ ‘হামজা’র ক্রেন দিয়ে বাসটি ধীরে ধীরে পানির নিচ থেকে তোলা হচ্ছে। বুধবার রাত সাড়ে ১১টার দিকে বাসটির সামনের অংশ পানির ওপর ওঠানো হলে একের পর এক মরদেহ বের করতে দেখা যায় ফায়ার সার্ভিসের ডুবুরি দলকে।
দুর্ঘটনার পর থেকেই নিখোঁজ যাত্রীদের স্বজনরা ঘাট এলাকায় ভিড় করছেন। তাদের কান্না ও আহাজারিতে পুরো এলাকা ভারী হয়ে উঠেছে। উদ্ধারকাজ যত এগোচ্ছে, ততই বাড়ছে স্বজনদের উৎকণ্ঠা ও শোক।
উদ্ধারকারীরা জানান, বাসটির সামনের অংশ তুলতে সক্ষম হলেও পুরো বাসটি এখনো পানির নিচে রয়েছে। পানির গভীরতা ও স্রোতের কারণে উদ্ধারকাজে নানা ধরনের বাধার সম্মুখীন হতে হচ্ছে। তবুও ডুবুরি দল নিরবচ্ছিন্নভাবে কাজ চালিয়ে যাচ্ছে।
বাসটির দরজা ভেঙে গেছে এবং ভেতর থেকে বিভিন্ন ব্যক্তিগত সামগ্রী ভেসে উঠতে দেখা গেছে। এর মধ্যে রয়েছে স্কুল ব্যাগ, জুতা-স্যান্ডেল, ভ্যানিটি ব্যাগসহ বিভিন্ন জিনিসপত্র। এসব দৃশ্য দুর্ঘটনার ভয়াবহতা আরও স্পষ্ট করে তুলেছে।
উদ্ধার কাজে সহযোগিতার জন্য ঘটনাস্থলে তিনটি অ্যাম্বুলেন্স প্রস্তুত রাখা হয়েছে। উদ্ধার হওয়া আহত বা মৃত ব্যক্তিদের দ্রুত হাসপাতালে নেওয়ার জন্য এই ব্যবস্থা রাখা হয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
নিখোঁজদের স্বজনদের আর্তনাদ ঘটনাস্থলের পরিবেশকে আরও ভারী করে তুলেছে। পদ্মার পাড়ে ছোট বোন ফাতেমা তুজ জোহরা ও জামাই কাজী সাইফ আহমেদের খোঁজে এসেছেন রোকন নামের এক ব্যক্তি। তিনি জানান, তার বন্ধুর ছোট বোন ও তার জামাই বিকেল সাড়ে ৩টার বাসে রাজবাড়ী থেকে ঢাকার উদ্দেশ্যে রওনা হন। পরে বাসটি নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে নদীতে তলিয়ে যায়। সন্ধ্যা থেকে তারা ঘাট এলাকায় অবস্থান করলেও এখনো তাদের কোনো খোঁজ পাওয়া যায়নি।
আরেক স্বজন শরিফুল ইসলাম জানান, তার পরিবারের পাঁচজন সদস্য একই বাসে ছিলেন। দুর্ঘটনার পর তার স্ত্রী, মেয়ে ও ভাগ্নি সাঁতরে পাড়ে উঠতে পারলেও সাত বছরের ছেলে সন্তান এবং এগারো বছর বয়সী ভাগ্নে এখনো নিখোঁজ রয়েছে। কান্নাজড়িত কণ্ঠে তিনি বলেন, “আমার টাকার দরকার নেই, আমার সন্তানের লাশটা আমাকে বুঝিয়ে দিক। আমার সব শেষ হয়ে গেছে।”
নবীজ উদ্দিন নামের আরেক ব্যক্তি তার দুই নাতি-নাতনির খোঁজে অপেক্ষা করছেন। তিনি আবেগাপ্লুত কণ্ঠে বলেন, “আমার নাতি ও নাতনি বাসের মধ্যে ছিল। আমি তাদের জন্য অপেক্ষা করছি। আল্লাহ আমার দুইটারে ফিরিয়ে দাও।”
উদ্ধারকারী দল জানিয়েছে, বাসটি সম্পূর্ণভাবে তোলা না হলে ভেতরে কতজন আটকে আছেন তা নিশ্চিতভাবে বলা যাচ্ছে না। তবে আশঙ্কা করা হচ্ছে, বাসের ভেতরে এখনও একাধিক যাত্রী আটকে থাকতে পারেন।
ফায়ার সার্ভিসের ডুবুরি দল এবং সংশ্লিষ্ট উদ্ধারকর্মীরা সমন্বিতভাবে কাজ করছেন। তাদের লক্ষ্য দ্রুত সময়ের মধ্যে বাসটি পুরোপুরি উদ্ধার করা এবং নিখোঁজদের সন্ধান পাওয়া।
স্থানীয়রা জানান, ফেরিঘাট এলাকায় নিরাপত্তা ব্যবস্থার ঘাটতি রয়েছে। পন্টুনে ওঠানামার সময় যানবাহনের চাপ ও বিশৃঙ্খলা প্রায়ই দেখা যায়, যা বড় ধরনের দুর্ঘটনার ঝুঁকি তৈরি করে। এই ঘটনার পর তারা নিরাপত্তা জোরদারের দাবি জানিয়েছেন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ফেরিঘাট এলাকায় যানবাহন ওঠানামার সময় কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা এবং সুনির্দিষ্ট নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা থাকা জরুরি। চালকদের সতর্কতা ও সঠিক নির্দেশনা মেনে চলাও এ ধরনের দুর্ঘটনা এড়াতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
এই মর্মান্তিক দুর্ঘটনা আবারও প্রমাণ করেছে, সামান্য অসাবধানতা বা অব্যবস্থাপনা কত বড় বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে। নিখোঁজদের স্বজনরা এখনো আশায় বুক বেঁধে আছেন, কিন্তু উদ্ধার হওয়া মরদেহের সংখ্যা বাড়তে থাকায় সেই আশার আলো ক্রমেই ক্ষীণ হয়ে আসছে।
উদ্ধার অভিযান শেষ না হওয়া পর্যন্ত প্রকৃত হতাহতের সংখ্যা জানা যাবে না। তবে এই দুর্ঘটনা ইতোমধ্যেই পুরো দেশকে শোকাহত করেছে।