সাতক্ষীরার সুন্দরবনে মধু আহরণের মৌসুম উদ্বোধন করেছেন পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী শেখ ফরিদুল ইসলাম এমপি। বুধবার (১ এপ্রিল) সুন্দরবন পশ্চিম বন বিভাগের সাতক্ষীরা রেঞ্জের নীলডুমুর এলাকায় তিনি উপস্থিত থেকে এ কর্মসূচির উদ্বোধন করেন।
প্রতিমন্ত্রী শেখ ফরিদুল ইসলাম বলেন, বিষ দিয়ে মাছ শিকার করা আত্মহত্যার সমতুল্য এবং এতে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের মৎস্য সম্পদ ধ্বংস হচ্ছে। তিনি হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, যেকোনো মূল্যে সুন্দরবনকে বিষমুক্ত রাখা হবে।
তিনি জানান, সুন্দরবনে বিষ প্রয়োগ বন্ধে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া হবে। প্রতিটি মৎস্য আড়তে নিয়মিত অভিযান চালিয়ে মাছে বিষের উপস্থিতি পরীক্ষা করা হবে। কোনো আড়তে বিষাক্ত মাছ পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্ট আড়ৎদারকে গ্রেফতার করা হবে এবং যারা এসব মাছ সরবরাহ করে তাদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়া হবে। প্রতিমন্ত্রী বলেন, তৃণমূল পর্যায় পর্যন্ত এই অভিযান বিস্তৃত করা হবে।
শেখ ফরিদুল ইসলাম আরও বলেন, সুন্দরবন ব্যবস্থাপনায় নতুন নীতিমালা করা হচ্ছে। আগামী বছর থেকে নির্দিষ্ট সংখ্যার (৫০০টির বেশি নয়) অতিরিক্ত নৌকা সুন্দরবনে প্রবেশ করতে দেওয়া হবে না। যারা অনিয়ম করবে, তাদের তালিকা তৈরি করে ভবিষ্যতে বনে প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হবে। পাশাপাশি প্রবেশ নিয়ন্ত্রণে ফিঙ্গারপ্রিন্টসহ একটি সমন্বিত ডাটাবেজ তৈরি করা হচ্ছে, যাতে কেউ ভিন্ন পরিচয়ে বারবার প্রবেশ করে অপরাধ করতে না পারে।
মধু আহরণকারীদের উদ্দেশে প্রতিমন্ত্রী বলেন, ভেজালমুক্ত মধু সংগ্রহ করতে পারলে তা দেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে এবং আন্তর্জাতিক বাজারেও এর চাহিদা বৃদ্ধি পাবে। তিনি সতর্ক করে বলেন, স্বল্পমেয়াদি লাভের জন্য ভেজাল মধু তৈরি করা যাবে না, বরং দীর্ঘমেয়াদি সম্পদের কথা ভাবতে হবে।
প্রতিমন্ত্রী সামাজিক মূল্যবোধের ওপর গুরুত্ব দিয়ে বলেন, অসৎ পথে উপার্জিত অর্থে কখনোই ভালো ভবিষ্যৎ গড়ে ওঠে না। সুন্দরবনে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড থেকে বিরত থেকে সৎভাবে জীবিকা নির্বাহ করতে হবে। তিনি আরও বলেন, জলদস্যু ও বনদস্যু আমাদের আশেপাশেই বিরাজ করছে। যদি আমরা সামাজিকভাবে সচেতন হই এবং রুখে দাঁড়াই, তারা টিকতে পারবে না। তিনি বলেন, বনদস্যুর বিরুদ্ধে সাহসী ভূমিকা নিয়ে প্রশাসনকে সহযোগিতা করা মৌয়ালদের দায়িত্ব।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন খুলনা অঞ্চলের বন সংরক্ষক ইমরান আহমেদ (সভাপতি), সাতক্ষীরা-৪ আসনের সংসদ সদস্য গাজী নজরুল ইসলাম, জেলা প্রশাসক আফরোজা আখতার, পুলিশ সুপার মো. আরেফিন জুয়েল, জেলা বিএনপির আহবায়ক রাহমাতুল্লাহ পলাশ, যুগ্ম আহবায়ক ড. মনিরুজ্জামান, সদস্য সচিব আবু জাহিদ ডাবলু প্রমুখ।
বন বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, আজ ১ এপ্রিল থেকে সুন্দরবনে মধু সংগ্রহের অনুমতি দেওয়া হয়েছে, যা চলবে টানা দুই মাস। এ বছর সুন্দরবনের সাতক্ষীরা রেঞ্জে এক হাজার ১০০ কুইন্টাল মধু এবং ৬০০ কুইন্টাল মোম আহরণের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে।
বন বিভাগ সূত্রে জানা যায়, ২০২১ সালে সুন্দরবন থেকে ৪,৪৬৩ কুইন্টাল মধু আহরণ করা হয়েছিল। ২০২২ সালে তা কমে দাঁড়ায় ৩,৮০৮ কুইন্টাল। ২০২৩ সালে আরও কমে ২,৮২৫ কুইন্টাল হয়। ২০২৪ সালে কিছুটা বেড়ে ৩,১৮৩ কুইন্টাল আহরণ করা হয়েছিল। ২০২৫ সালে সেটি কমে দাঁড়ায় ২,৭৬০ কুইন্টালে, যা ২০২৪ সালের তুলনায় প্রায় ৩৫ শতাংশ কম। ২০২৪ সালে প্রায় ৮,০০০ মৌয়াল মধু আহরণে নিয়োজিত ছিলেন, যা ২০২৫ সালে নেমে আসে প্রায় ৫,০০০-এ।
স্থানীয় মৌয়ালরা জানিয়েছেন, এবার আরও কম মধু আহরণ হবে। তাদের মতে, এর প্রধান কারণ বনদস্যুর ভয়। সুন্দরবনের বনদস্যু নির্মূলে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর ভূমিকা পর্যাপ্ত নয়।
সুন্দরবন সংলগ্ন শ্যামনগর উপজেলার বুড়িগোয়ালিনী গ্রামের মৌয়াল রমিজউদ্দিন বলেন, ছোটবেলা থেকেই জঙ্গলে যাই। বাঘ-কুমিরের ভয় পাইনি, কিন্তু এখন জঙ্গল মানেই ডাকাতের ভয়। পাশ দিয়েও বনে ঢুকি, কিন্তু নিরাপদ থাকবো কিনা জানি না।
একই এলাকার আরেক মৌয়াল হাশেম গাজী বলেন, আগে মধু আনতে গেলে পরিবার শুধু বাঘের ভয় করতো, এখন ডাকাতের ভয় বড় হয়ে গেছে। অনেক সময় মধু ও টাকা সব ছিনতাই করা হয়। নিরাপত্তা না বাড়ালে মানুষ বনে যেতে চাইবে না।
জেলে-মৌয়াল সাইফুল ইসলাম বলেন, গত বছর আমার দলের দুইজনের কাছ থেকে দস্যুরা সব মাল নিয়ে গেছে। এই অবস্থায় বনে গিয়ে কাজ করা খুব কষ্টকর। আমরা চাই প্রশাসন আমাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করুক।
আকাশজমিন / আরআর