ঢাকা, বাংলাদেশ ।
  সোমবার, ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬,  ২৯ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম :
শত কোটি টাকার সম্পদ, রিট ফাইল চেপে রাখা ও প্রশাসনের নীরবতার অভিযোগ রাজনৈতিক দুর্বৃত্তায়ন ও চাঁদাবাজি কঠোর হাতে দমন করা হবে: আইনমন্ত্রী ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের নতুন অধ্যায় চায় বাংলাদেশ: পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী ডেঙ্গুতে আরও ৬ প্রাণহানি, এক দিনে হাসপাতালে ১৫৬১ জন ভর্তি গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করতে স্থানীয় সরকার ব্যবস্থা জোরদার করতে হবে: রাষ্ট্রপতি আসিফ মাহমুদের বিরুদ্ধে ১১ হাজার কোটি টাকা পাচারের অভিযোগ: দুদক ‘বারবার মিথ্যা মামলা না দিয়ে আমাকে একবারে গুলি করে মেরে ফেলেন’ ২১ সেপ্টেম্বর যুক্তরাষ্ট্র সফরে যাচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বাংলাদেশে নতুন গ্যাসক্ষেত্র অনুসন্ধানে বিনিয়োগে আগ্রহী মার্কিন কোম্পানি শেভরন পাবনায় ডিবির ওসির প্রত্যাহারে সাংবাদিকদের ২৪ ঘণ্টার আলটিমেটাম

দাকোপে পেট্রোল পাম্প নেই, জ্বালানি সংকটে জনজীবন বিপর্যস্ত


  • আপলোড সময় : শনিবার ০৪ এপ্রিল, ২০২৬ সময় : ৩:২৪ পিএম

খুলনার উপকূলীয় উপজেলা দাকোপে জ্বালানি তেলের তীব্র সংকট জনজীবনকে কার্যত স্থবির করে তুলেছে। নয়টি ইউনিয়ন ও একটি পৌরসভা নিয়ে গঠিত এই উপজেলার কোথাও কোনো নিবন্ধিত পেট্রোল পাম্প না থাকায় দীর্ঘদিন ধরেই স্থানীয় মানুষ খোলা বাজারের ওপর নির্ভরশীল ছিলেন। তবে গত কয়েক সপ্তাহ ধরে খোলা বাজারেও পেট্রোল ও অকটেনের সরবরাহ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় পরিস্থিতি ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। এতে সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়েছেন মোটরসাইকেল চালক, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, কৃষক এবং জরুরি সেবা প্রদানকারীরা।

দাকোপ উপজেলার সদর চালনা বাজারসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় সরেজমিনে ঘুরে দেখা গেছে, যেখানে আগে ছোট দোকানগুলোতে বোতলে করে পেট্রোল বিক্রি হতো, এখন সেখানে তেলের কোনো চিহ্ন নেই। অধিকাংশ দোকানই বন্ধ হয়ে আছে অথবা খালি বোতল ঝুলিয়ে রাখা হয়েছে। কিছু দোকানে সীমিত পরিমাণে তেল পাওয়া গেলেও দাম এত বেশি যে সাধারণ মানুষের পক্ষে তা কেনা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে।

স্থানীয়রা জানান, আগে খুলনা শহর কিংবা মোংলা এলাকা থেকে ড্রামে করে তেল এনে খোলা বাজারে বিক্রি করা হতো। এই অনানুষ্ঠানিক সরবরাহ ব্যবস্থার ওপরই নির্ভর করত পুরো উপজেলা। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে সেই সরবরাহ চেইন ভেঙে পড়েছে। খুলনার বিভিন্ন পেট্রোল পাম্পেও এখন তেলের সংকট দেখা দেওয়ায় সেখান থেকেও পর্যাপ্ত তেল পাওয়া যাচ্ছে না।

ফলে দাকোপে তৈরি হয়েছে এক ধরনের জ্বালানি হাহাকার। জরুরি প্রয়োজনে মোটরসাইকেল চালকরা তাদের যানবাহন ব্যবহার করতে পারছেন না। অনেককে কয়েক কিলোমিটার পথ বাইক ঠেলে নিয়ে যেতে দেখা গেছে। এতে সময় ও শ্রমের অপচয়ের পাশাপাশি বাড়ছে মানুষের দুর্ভোগ।

চালনা বাজার ডাকবাংলা মোটরসাইকেল সমিতির কয়েকজন চালক, যেমন ইদ্রিস হাওলাদার ও মহসিন ফরাজি জানান, তাদের জীবিকা পুরোপুরি নির্ভর করে মোটরসাইকেলের ওপর। কিন্তু জ্বালানি না থাকায় তারা কার্যত কর্মহীন হয়ে পড়েছেন। তারা বলেন, “দাকোপে কোনো পাম্প নেই, এটা আমাদের দীর্ঘদিনের সমস্যা। আগে মোংলা বা খুলনা থেকে তেল এনে বিক্রি করা হতো, এখন সেখানেও তেলের সংকট। ফলে আমাদের আয় বন্ধ হয়ে যাচ্ছে।”

এই সংকটের প্রভাব পড়েছে কৃষিখাতেও। কৃষকরা সেচ পাম্প ও অন্যান্য যন্ত্রপাতি চালাতে জ্বালানি না পাওয়ায় উৎপাদন কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে। অনেকেই বাধ্য হয়ে কাজ বন্ধ রেখেছেন অথবা বিকল্প ব্যয়বহুল পদ্ধতির দিকে ঝুঁকছেন।

জরুরি সেবাতেও এর নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। রোগী পরিবহন, ওষুধ সরবরাহ কিংবা অন্যান্য জরুরি কাজে ব্যবহৃত যানবাহনগুলো জ্বালানির অভাবে চলাচল করতে পারছে না। এতে স্বাস্থ্যসেবা ও অন্যান্য জরুরি কার্যক্রমও মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে।

স্থানীয়দের অভিযোগ, এই সংকটকে পুঁজি করে এক শ্রেণির অসাধু ব্যবসায়ী মজুতদারি শুরু করেছে। তারা গোপনে তেল মজুত করে চড়া দামে বিক্রি করছে। সাধারণ ক্রেতাদের কাছে তেল নেই বলে জানালেও পরিচিত বা বিশেষ ক্রেতাদের কাছে বেশি দামে তেল সরবরাহ করা হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

এ ধরনের অনিয়ম রোধে প্রশাসনের কার্যকর তদারকি না থাকায় পরিস্থিতি আরও খারাপ হচ্ছে বলে মনে করছেন স্থানীয়রা। তারা দ্রুত বাজার মনিটরিং জোরদার এবং মজুতদারদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন।

দাকোপবাসীর দীর্ঘদিনের দাবি, উপজেলায় অন্তত একটি সরকারি বা অনুমোদিত বেসরকারি পেট্রোল পাম্প স্থাপন করা হোক। তাদের মতে, একটি পাম্প থাকলে এ ধরনের সংকট অনেকাংশে এড়ানো সম্ভব হতো। বর্তমানে পাম্প না থাকায় কয়েকগুণ বেশি দামে এবং অনিরাপদভাবে খোলা বাজার থেকে তেল কিনতে হচ্ছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, উপকূলীয় ও দুর্গম এলাকায় জ্বালানি সরবরাহের জন্য একটি স্থায়ী অবকাঠামো গড়ে তোলা জরুরি। নতুবা এসব অঞ্চলে বারবার এমন সংকট দেখা দেবে, যা স্থানীয় অর্থনীতি ও জনজীবনের ওপর দীর্ঘমেয়াদি নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে।

এদিকে ভুক্তভোগী দাকোপবাসী উপজেলা প্রশাসনের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন। তারা দ্রুত জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করার পাশাপাশি বাজারে কঠোর নজরদারি চালানোর আহ্বান জানিয়েছেন। একই সঙ্গে একটি স্থায়ী পেট্রোল পাম্প স্থাপনের জন্য সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন।

পরিস্থিতি দ্রুত স্বাভাবিক না হলে দাকোপ উপজেলার যোগাযোগ ব্যবস্থা সম্পূর্ণ ভেঙে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। এতে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কৃষি ও ব্যবসা—সব খাতেই বড় ধরনের ক্ষতির সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে।

সব মিলিয়ে, দাকোপের জ্বালানি সংকট এখন শুধু একটি স্থানীয় সমস্যা নয়, এটি একটি বড় অবকাঠামোগত দুর্বলতার প্রতিফলন। এই সংকট সমাধানে দ্রুত ও সমন্বিত উদ্যোগ নেওয়া না হলে ভবিষ্যতে এর প্রভাব আরও গভীর হতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।

আকাশজমিন / আরআর 


এ সম্পর্কিত আরো খবর