সিরাজগঞ্জ প্রতিনিধি / : 166
রেজাউল করিম ঝন্টু ,সিরাজগঞ্জ
সিরাজগঞ্জের তাড়াশ উপজেলায় দেড়শ বছরের ঐতিহ্যবাহী বারুহাস মেলা গতকাল শুক্রবার শুরু হয়েছে। স্থানীয়রা এই মেলাকে গ্রামীণ সম্প্রতির মিলন মেলা হিসেবে মনে করেন। এটি একটি গ্রামীণ সংস্কৃতি, যা বহু বছর আগে থেকে প্রচলিত। বারুহাস মেলার শুরু প্রায় দেড়শত বছর আগে, জমিদার আমলে চলনবিল অঞ্চলে গড়ে ওঠে। মেলা স্থানীয় গ্রামীণ সমাজের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক মিলনের একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হিসেবে বিবেচিত হয়।
মেলার আয়োজক সূত্রে জানা গেছে, প্রতিবছর চৈত্র চন্দ্রিমার ১৩ তারিখে চলনবিল অঞ্চলের তাড়াশ উপজেলা সদর থেকে ১৬ কিলোমিটার পশ্চিমে, জমিদার খ্যাত বারুহাস বাজার চত্বরে মেলা অনুষ্ঠিত হয়। এ বছরের মেলা শুক্রবার (৩ এপ্রিল) শুরু হয়েছে। মেলার মূল দিন শেষ হওয়ার পরপরই শনিবার অনুষ্ঠিত হয় বউ মেলা, যেখানে গ্রাম ও আশেপাশের গ্রামগুলোর নারী তার প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র কেনাকাটা করে। মেলার একটি বিশেষ রেওয়াজ হলো ঝি জামাইকে বাড়িতে আনানো, যা বহুদিন ধরে চলমান।
স্থানীয়দের মতে, বারুহাস মেলার মূল উদ্দেশ্য সম্প্রতির মিলন। এটি শুধু কেনাকাটার মেলা নয়, বরং সামাজিক সম্পর্ক ও প্রতিবেশীদের সঙ্গে বন্ধুত্ব বৃদ্ধির ক্ষেত্র হিসেবেও ব্যবহৃত হয়। ৭০ থেকে ৯০-এর দশকে মেলার সুনাম উত্তরবঙ্গ জুড়ে ছড়িয়ে গিয়েছিল। অনেক দূর-দূরান্তের মানুষও মেলায় আসতেন। বগুড়া, শেরপুর, সিরাজগঞ্জ, নাটোর ও পাবনা থেকে দর্শনার্থীরা মহিষ ও গরুর গাড়ীর বহর নিয়ে মেলায় অংশ নিতেন।
মেলার প্রস্তুতি সাধারণত এক মাস আগে থেকে শুরু হয়। বাড়ির লোক কুটুমকে দাওয়াত করা, ঝি জামাই আনা, বাড়ি লেপা, মুড়ি ভাজা সহ যাবতীয় কাজ সম্পন্ন করতে প্রায় এক মাস আগে থেকে মেয়েরা ব্যস্ত হয়ে পড়েন। মেলায় জামাইদের উপঢোকন বা পরবি দেওয়ার রেওয়াজ বহু বছর ধরে চলে আসছে। জামাইরা সাধ্য অনুযায়ী বড় মাছ, মাংস ও মিষ্টি কিনে শশুর বাড়িতে ফিরে যান।
বর্তমানে বারুহাস মেলার জৌলুস কমে গেছে। এক সময় এটি ২০ থেকে ৩০ গ্রামের মানুষের সবচেয়ে বড় উৎসব ছিল। এখন মেলার মূল আকর্ষণ কেন্দ্রিক হয়ে গেছে। জৌলুস কমে যাওয়ার পেছনে মূল কারণগুলোর মধ্যে রয়েছে মেলার নির্ধারিত জায়গার সংকট, পৃষ্ঠপোষকতার অভাব, মানুষের মানসিকতার পরিবর্তন এবং সহজলভ্য বাজার ব্যবস্থা। আজকাল হাতের নাগালে বড় বড় শপিংমল, যেখানে দেশ-বিদেশের আকর্ষণীয় পণ্য সাজানো থাকে।
এ পরিস্থিতি যদি অব্যাহত থাকে, তবে গ্রামীণ জীবনের এই লোকজ সংস্কৃতি হারিয়ে যাবে। দেড়শ বছরের ঐতিহ্যবাহী বারুহাস মেলা ভবিষ্যতে শুধু যাদুঘরে সংরক্ষিত ইতিহাসে রূপান্তরিত হতে পারে। তাই এই মেলাকে টিকিয়ে রাখা সময়ের দাবি।
মেলার আয়োজন শুধু সামাজিক নয়, অর্থনৈতিক দিক থেকেও গুরুত্বপূর্ণ। স্থানীয় উদ্যোক্তারা বিভিন্ন পণ্য বিক্রি করে থাকে, যা এলাকার মানুষের জন্য আয় ও বিনোদনের উৎস হিসেবে কাজ করে। মেলার সময় স্থানীয় কৃষক ও হস্তশিল্পীরা তাদের পণ্য প্রদর্শন ও বিক্রি করতে পারেন।
স্থানীয়রা জানান, মেলার মাধ্যমে গ্রামের মানুষদের মধ্যে পারস্পরিক সম্পর্ক ও সহযোগিতা বৃদ্ধি পায়। বিশেষ করে বউ মেলায় নারী ও পুরুষরা সামাজিক রীতিনীতি ও সম্প্রতির অংশ হিসেবে মিলিত হন। এটি গ্রামের সামাজিক বন্ধনকে শক্তিশালী করে।
মেলার স্থায়ী আকর্ষণগুলোর মধ্যে রয়েছে খেলাধুলা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, হস্তশিল্পের প্রদর্শনী ও গ্রামীণ খাওয়া-দাওয়ার স্টল। বিশেষ করে শিশু ও কিশোরদের জন্য মেলার সময় বিভিন্ন মজাদার কার্যক্রম অনুষ্ঠিত হয়, যা তাদের গ্রামীণ জীবন ও সংস্কৃতির সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেয়।
মেলার ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যায়, জমিদার আমলে এই মেলা মূলত সামাজিক এবং ধর্মীয় অনুষ্ঠান হিসেবে শুরু হয়েছিল। এটি গ্রামের মানুষের মিলন, সামাজিক বন্ধন ও বিনোদনের মাধ্যম হিসেবে গড়ে উঠেছিল। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে মেলা স্থানীয় অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডেরও অংশ হয়ে ওঠে।
স্থানীয়দের বক্তব্য, বর্তমান সময়ে মেলার জনপ্রিয়তা কমে গেলেও এটি এখনও গ্রামীণ সংস্কৃতির একটি গুরুত্বপূর্ণ চিহ্ন। মেলার মাধ্যমে নতুন প্রজন্মও গ্রামীণ জীবনধারা, ঐতিহ্য ও সম্প্রতির সঙ্গে পরিচিত হচ্ছে।
মেলার সাফল্য ধরে রাখার জন্য স্থানীয় প্রশাসন, সমাজসেবী প্রতিষ্ঠান ও ব্যবসায়ীদের অংশগ্রহণ প্রয়োজন। পৃষ্ঠপোষকতা ও সমন্বিত প্রচেষ্টার মাধ্যমে বারুহাস মেলার ঐতিহ্য ধরে রাখা সম্ভব।
উপসংহারে বলা যায়, বারুহাস মেলা শুধুমাত্র একটি লোকজ মেলা নয়, এটি গ্রামীণ সম্প্রতির মিলন, সামাজিক বন্ধন ও ঐতিহ্যের প্রতীক। এটি টিকিয়ে রাখার উদ্যোগ গ্রামীণ জীবনের ঐতিহ্য ও সংস্কৃতিকে সংরক্ষণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
আকাশজমিন / আরআর