সিরাজগঞ্জ প্রতিনিধি / : 90
সিরাজগঞ্জের তাড়াশে বারুহাঁসের ভাদাই নাম খ্যাত প্রায় দেড়শ বছরের ঐতিহ্যবাহি বউ মেলা আজ শনিবার অনুষ্ঠিত হচ্ছে। মূল মেলার পরের দিন সকাল থেকে শুরু হওয়া এই বউ মেলা স্থানীয় নারী ও কিশোরীদের মধ্যে আনন্দ ও উৎসবের পরিবেশ সৃষ্টি করে। মেলায় মা, শাশুড়ী, জায়া, জননী মিলে প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র কেনাকাটায় মেতে উঠেন।
মেলা শুধু বারুহাঁস গ্রাম নয়, আশপাশের তাড়াশ, সিংড়া, গুরুদাসপুরসহ সীমান্ত ঘেষা গ্রামগুলো থেকেও নারী ও কিশোরীরা অংশ নিচ্ছেন। এই মেলাকে এলাকার লোকজন “বউ-শাশুড়ির মিলন মেলা” হিসাবেই অভিহিত করে থাকেন।
স্থানীয়দের তথ্য অনুযায়ী, শুক্রবার পূর্ণিমার রাতে বসেছিল বারুহাঁসের ভাদাই মেলা। মূল মেলা চলেছে সারা দিন, এরপর শনিবার সকাল থেকে শত শত নারী বউ মেলায় আসতে শুরু করেছেন। মেলায় দোকানগুলোতে নামী-দামী ব্র্যান্ডের কসমেটিক্সের সাথে কম দামের পণ্যও উপলব্ধ ছিল। কাঠের তৈরি আসবাবপত্র, নিত্যপ্রয়োজনীয় গৃহস্থালী সামগ্রী, মৃৎপাত্র, মিষ্টি ও অন্যান্য খাদ্যসামগ্রীও মেলায় ছিল।
নারীরা মেলার জাদু প্রদর্শন, নাগর দোলা, পতুল নাচসহ বিভিন্ন বিনোদনমূলক কার্যক্রম উপভোগ করেন। মেলার ভিড়ে সিংড়ার বিয়াস গ্রামের কিশোরী শীলা পারভীনসহ অনেক কিশোরী ও তরুণী অংশগ্রহণ করেছেন। বয়স্ক নারীদের দেখা গেছে বাঁশ, বেত ও কাঠের তৈরি আসবাবপত্র, দা-বটি ও অন্যান্য লৌহ্যজাত গৃহস্থালী জিনিস কিনতে।
মেলার আয়োজক কমিটির সদস্য মো. রফিকুল ইসলাম বলেন, “মেলার পরের দিন আশেপাশের প্রায় ২০ থেকে ২৫ গ্রামের কিশোরী, স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থী ও বয়স্ক নারীরা সাচ্ছন্দে কেনাকাটা করতে মেলায় আসেন। পাশাপাশি মেলায় রয়েছে হরেক রকম খাবার ও বিনোদনের ব্যবস্থা। নারীদের নিরাপত্তার জন্য আয়োজক কমিটি নজর রাখছেন।”
বারুহাঁস বউ মেলার ঐতিহ্য প্রায় দুইশ বছরের পুরনো। জমিদার আমলে এটি শুরু হয় এবং চলনবিল অঞ্চলের গ্রামীণ জীবনের অংশ হয়ে ওঠে। এক সময় এটি ২০–৩০ গ্রামের মানুষের জন্য সবচেয়ে বড় উৎসব ছিল। প্রস্তুতি শুরু হতো এক মাস আগে থেকেই। বাড়িতে লোক-জমায়েতের ব্যবস্থা, ঝি জামাই আনানো, বাড়ি লেপা, মুড়ি ভাজা ইত্যাদি কার্যক্রমের মধ্যে মেলার উত্তেজনা শুরু হতো। জামাইরা তখন বড় মাছ, মাংস ও মিষ্টি কিনে শশুরবাড়ি ফিরে যেতেন।
বর্তমানে মেলার জৌলুস ধীরে ধীরে কমেছে। এখন মূলত বারুহাঁস গ্রাম কেন্দ্রিক হয়ে গেছে। মেলার নির্ধারিত জায়গার সংকট, পৃষ্ঠপোষকতার অভাব ও বাজার ব্যবস্থার পরিবর্তনের কারণে গ্রামের ঐতিহ্যবাহী এই উৎসবের প্রভাব সীমিত হয়ে পড়েছে। সহজলভ্য বাজার ও শপিংমলে দেশ-বিদেশের আকর্ষণীয় পণ্যের কারণে গ্রামীণ মানুষ গ্রামীণ মেলার প্রতি আগ্রহ হারাচ্ছে।
মেলার সামাজিক ও সাংস্কৃতিক গুরুত্ব অপরিসীম। এটি নারীর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করে এবং পরিবারের মহিলাদের সামাজিক মিলনের সুযোগ দেয়। স্থানীয়রা মনে করেন, মেলার মাধ্যমে গ্রামীণ ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি সংরক্ষণ হয়। এই ধরনের মেলাকে টিকিয়ে রাখা সময়ের দাবি।
আকাশজমিন / আরআর