আন্তর্জাতিক ডেস্ক
রাশিয়া ইউক্রেনের বিভিন্ন অঞ্চলে ব্যাপক হামলা চালিয়েছে। পূর্ব ইউরোপের এই দেশটির একাধিক শহর ও জনবসতিপূর্ণ এলাকায় চালানো হামলায় অন্তত ১৫ জন নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছেন আরও বহু মানুষ। ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলার ফলে নতুন করে প্রাণহানির ঘটনা যুদ্ধ পরিস্থিতিকে আরও উদ্বেগজনক করে তুলেছে। একই সঙ্গে যুদ্ধ বন্ধে চলমান কূটনৈতিক উদ্যোগও কার্যত স্থবির হয়ে আছে।
আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরা জানিয়েছে, গত ২৪ ঘণ্টায় রাশিয়ার একাধিক হামলায় ইউক্রেনে অন্তত ১৫ জন নিহত এবং অনেক মানুষ আহত হয়েছেন বলে দেশটির কর্মকর্তারা নিশ্চিত করেছেন। এদিকে একই সময়ে ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ানের সঙ্গে ইস্তাম্বুলে বৈঠক করেছেন।
ইউক্রেনের খারকিভ অঞ্চলের গভর্নর ওলেহ সিনিয়েহুবভ জানিয়েছেন, খারকিভ শহরসহ উত্তর-পূর্বাঞ্চলের অন্তত ১১টি শহর ও গ্রামে রাশিয়ার হামলা চালানো হয়েছে। এসব হামলায় অন্তত চারজন নিহত এবং ১১ জন আহত হয়েছেন। হামলার ফলে বেশ কয়েকটি ভবন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে।
অন্যদিকে সুমি অঞ্চলেও রাতের আঁধারে রুশ বাহিনীর ড্রোন হামলা চালানো হয়। এতে অন্তত ১১ জন আহত হয়েছেন। আহতদের মধ্যে একটি শিশুও রয়েছে বলে জানিয়েছেন স্থানীয় কর্মকর্তারা। হামলার পর জরুরি উদ্ধারকর্মীরা দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে আহতদের হাসপাতালে পাঠান।
দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের নিকোপোল শহরের একটি ব্যস্ত বাজারে ড্রোন হামলা চালানো হলে সেখানে অন্তত পাঁচজন নিহত হন এবং আরও ২৫ জন আহত হন। দিনিপ্রোপেত্রোভস্ক অঞ্চলের গভর্নর ওলেক্সান্দর গাঞ্জা এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন। বাজার এলাকায় হামলা হওয়ায় হতাহতের সংখ্যা বেশি হয়েছে বলে জানিয়েছেন স্থানীয় প্রশাসন।
এছাড়া পূর্বাঞ্চলের দোনেৎস্ক অঞ্চলেও গত ২৪ ঘণ্টায় সংঘর্ষ ও হামলার ঘটনায় ছয়জন নিহত এবং আরও ১০ জন আহত হয়েছেন বলে জানিয়েছেন গভর্নর ভাদিম ফিলাশকিন। যুদ্ধবিধ্বস্ত এই অঞ্চলে দীর্ঘদিন ধরেই তীব্র লড়াই চলছে।
ইউক্রেনের বিমান বাহিনী জানিয়েছে, রাশিয়ার ছোড়া ২৮৬টি ড্রোনের মধ্যে ২৬০টি ভূপাতিত বা নিষ্ক্রিয় করা হয়েছে। তাদের দাবি, ১১টি ড্রোন অন্তত ১০টি স্থানে আঘাত হানে এবং ভূপাতিত ড্রোনের ধ্বংসাবশেষ ছয়টি স্থানে পাওয়া গেছে।
এদিকে রাশিয়ার দক্ষিণাঞ্চলীয় রোস্তভ অঞ্চলও ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলার শিকার হয়েছে। স্থানীয় গভর্নর ইউরি স্লিউসার জানিয়েছেন, ইউক্রেন সীমান্তের কাছে অবস্থিত বন্দরনগরী তাগানরগে হামলায় অন্তত একজন নিহত এবং চারজন আহত হয়েছেন। আহতদের মধ্যে তিনজন রুশ নাগরিক এবং একজন বিদেশি নাগরিক রয়েছেন। তাদের সবার অবস্থা গুরুতর বলে জানিয়েছেন চিকিৎসকরা।
স্থানীয় কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, একটি বাণিজ্যিক স্থাপনায় ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত করলে সেখানে আগুন ধরে যায়। পরে জরুরি সেবাকর্মীরা ঘটনাস্থলে পৌঁছে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনেন এবং এলাকাটি নিরাপদ করেন।
আরেকটি ঘটনায় আজভ সাগরে একটি বিদেশি পতাকাবাহী কার্গো জাহাজে ড্রোনের ধ্বংসাবশেষ পড়ে আগুন ধরে যায়। তাগানরগ উপসাগরসহ বিভিন্ন এলাকায় ড্রোন ধ্বংস করা হয়েছে বলেও জানিয়েছেন গভর্নর ইউরি স্লিউসার। তবে হামলার উৎস সম্পর্কে তিনি স্পষ্ট করে কিছু জানাননি। আজভ সাগর শিল্পপণ্য পরিবহনের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি নৌপথ।
এদিকে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ বন্ধে আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক প্রচেষ্টা সাম্প্রতিক মাসগুলোতে প্রায় স্থবির হয়ে পড়েছে। চলতি বছর আবুধাবি ও জেনেভায় যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া ও ইউক্রেনের মধ্যে তিন দফা উচ্চপর্যায়ের বৈঠক অনুষ্ঠিত হলেও পূর্ব ইউক্রেনের ভূখণ্ড সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে কোনও অগ্রগতি হয়নি।
গত মাসে নির্ধারিত চতুর্থ দফার বৈঠক যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল ও ইরান সংঘাতের কারণে স্থগিত করা হয়। ফলে যুদ্ধবিরতির সম্ভাবনাও অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে।
এই পরিস্থিতির মধ্যেই শনিবার ইস্তাম্বুলে প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি ও প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ানের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকে যুদ্ধ বন্ধের উদ্যোগ, আঞ্চলিক নিরাপত্তা এবং কৃষ্ণসাগরের সামুদ্রিক নিরাপত্তা নিয়ে আলোচনা হয়েছে।
তুরস্কের প্রেসিডেন্ট কার্যালয় জানিয়েছে, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ বন্ধে আলোচনায় সহায়তা অব্যাহত রাখার আশ্বাস দিয়েছেন প্রেসিডেন্ট এরদোয়ান। পাশাপাশি কৃষ্ণসাগরে সামুদ্রিক নিরাপত্তা ও জ্বালানি সরবরাহের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
আকাশজমিন / আরআর