যুদ্ধ যদি শুক্রবার শেষ হয়ে যেত, তাহলে ডোনাল্ড ট্রাম্প নিজেকে বিজয়ী দাবি করার জন্য হাতে যা কিছু পেতেন তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিল আলি খামেনিকে হত্যা এবং ইরানের সামরিক-বেসামরিক স্থাপনা ধ্বংস। কিন্তু শনিবার পর্যন্ত পরিস্থিতি দেখালে, ট্রাম্পের হারানোর তালিকাটা আরও দীর্ঘ হতো। বিশেষ করে যুদ্ধবিমান বিধ্বস্ত ও ক্রু নিখোঁজ হওয়ার ঘটনা তাকে দমিয়ে দিতে পারতো। যদি নিখোঁজ ক্রুদের ছবি ইরান প্রকাশ করতো, তাহলে তা হতো ট্রাম্পের জন্য কলঙ্কজনক। অনেকটাই ১৯৮০ সালে জিমি কার্টারের ব্যর্থতার মতো একটি পরিস্থিতি তৈরি হতো।
জ্বালানির দাম বৃদ্ধি, হরমুজ প্রণালি খোলার জন্য মিত্রদের থেকে সাড়া না পাওয়া—এই পরিস্থিতিতে ট্রাম্প বারবার নীতি বদলাতে বাধ্য হচ্ছিলেন। এমন সময় ক্রু উদ্ধারের সফল অভিযান তাকে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলার সুযোগ দিয়েছে। ট্রুথ সোশ্যালেও তিনি উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেছেন, লিখেছেন, ‘উই গট হিম!’ বা ‘আমরা তাঁকে পেয়েছি!’ ইরানে সম্ভাব্য স্থল অভিযান শুরু হওয়ার আগে এমন সফলতা ট্রাম্পকে আত্মবিশ্বাসী করে তুলেছে।
ইতিহাসও ট্রাম্পের পাশে আছে। ক্রু উদ্ধার অভিযানের মাধ্যমে তার প্রশাসন যুক্তরাষ্ট্রের প্রায় ৪৫ বছর আগের একটি ব্যর্থতার লজ্জা কিছুটা ঘোচাতে পেরেছে। ১৯৮০ সালের এপ্রিল মাসে তেহরানে ৫৩ জন আমেরিকান জিম্মি উদ্ধারের জন্য ‘ঈগল ক্ল’ অভিযান ব্যর্থ হয়েছিল। সেই সময় ৩৪ বছর বয়সী ডোনাল্ড ট্রাম্প তৎকালীন প্রশাসনের সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিলেন।
মার্কিন সাংবাদিক রোনা ব্যারেটকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প বলেছিলেন, ‘তারা (ইরান) আমাদের লোকদের জিম্মি করেছে। এটি একেবারেই হাস্যকর। যুক্তরাষ্ট্র চুপচাপ বসে আছে এবং ইরানের মতো দেশকে আমেরিকান নাগরিকদের আটকে রাখার সুযোগ দিচ্ছে। এটি ভয়াবহ।’ জিম্মি সংকটের পর সেনা না পাঠানোর বিষয়েও তিনি আক্ষেপ প্রকাশ করেছিলেন।
১৯৭৯ সালের নভেম্বরে ইরানে ইসলামি বিপ্লবের পর সশস্ত্র ইরানিরা তেহরানে মার্কিন দূতাবাসে ৫৩ জন আমেরিকানকে জিম্মি করে। ১৯৮০ সালের ২৪ এপ্রিল যুক্তরাষ্ট্র ‘ঈগল ক্ল’ নামে উদ্ধার অভিযান শুরু করে। কিন্তু বৈরি আবহাওয়া ও হেলিকপ্টারের যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে অভিযান ব্যর্থ হয়। ফেরার সময় দুটি হেলিকপ্টার সংঘর্ষে আট সেনা নিহত হন। ইরান সরকার ওই ধ্বংসাবশেষ টেলিভিশনে প্রচার করে। তৎকালীন প্রেসিডেন্ট জিমি কার্টার মেয়াদে জিম্মিদের মুক্তির চেষ্টা চালিয়েছিলেন। ৪৪৪ দিন পর ১৯৮১ সালের জানুয়ারিতে জিম্মিদের মুক্তি দেওয়া হয়।
ইরান যুদ্ধের মধ্যেই ৯ মার্চ ট্রাম্প ৪৫ বছর আগের ঘটনাকে ‘মার্কিন জিম্মি ও অন্যায়ভাবে আটক দিবস’ হিসেবে ঘোষণা করেন। ক্রু উদ্ধারের ঘটনা তার জন্য ইতিহাসের ব্যর্থতার লজ্জা কিছুটা মুছে দিয়েছে।
গত ৪৮ ঘণ্টায় ট্রাম্প এক কঠিন পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছিলেন। মিত্রদের সাড়া না পাওয়া, অভ্যন্তরীণ বাজারে গ্যাসোলিনের দাম বৃদ্ধি, এবং যুদ্ধবিমান বিধ্বস্ত—এ সবই প্রশাসন ও জনগণের মধ্যে হতাশা সৃষ্টি করেছিল। বিবিসি সাংবাদিক জো ইনউড লিখেছেন, ইরানিরা যখন মার্কিন ক্রু খুঁজছিল, তখন আশঙ্কা ছিল তাদের ছবি প্রকাশ করা হবে। সামাজিক মাধ্যমে এআই দিয়ে তৈরি ক্রু বন্দির ছবি ছড়ানো হয়েছিল।
যুদ্ধবিমান বিধ্বস্তের কয়েকদিন আগেও ট্রাম্প প্রশাসন বলেছিল, ইরানের আকাশ প্রতিরক্ষা ধ্বংস হয়েছে। কিন্তু যুদ্ধবিমান ভূপাতিত হওয়ার পর ওয়াশিংটনের ঘোষণা কিছুটা হাস্যকর মনে হয়েছে। অনেকেই মনে করেছিলেন যুদ্ধের নিয়ন্ত্রণ ধীরে ধীরে ট্রাম্পের হাতের বাইরে চলে যাচ্ছে। তবে সফল ও বিপজ্জনক উদ্ধার অভিযান তাকে যুদ্ধের মোড় নিজের দিকে ফেরানোর সুযোগ দিয়েছে।
এএফপির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ক্রু উদ্ধারের পর ট্রাম্প ট্রুথ সোশ্যাল পোস্টে আরও জোরালো হুমকি দেন। লিখেছেন, ‘একটি চুক্তিতে পৌঁছানো অথবা হরমুজ প্রণালি খুলে দিতে ইরানকে দশদিন সময় দিয়েছি। সময় ফুরিয়ে আসছে। মাত্র ৪৮ ঘণ্টা বাকি। এরপর নরক নেমে আসবে।’
ইরানও নিজেদের সফলতার দাবি করছে। রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমে বলা হয়েছে, ‘ক্রু উদ্ধার অভিযানে তিনটি যুদ্ধবিমান ধ্বংস হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের অভিযানও ব্যর্থ হয়েছে।’ একমাসের বেশি সময় ধরে উভয়পক্ষই প্রোপাগান্ডা ছড়াচ্ছে। উদ্ধার অভিযানের সুনির্দিষ্ট স্থানও এখনও প্রকাশ করা হয়নি।
উল্লেখযোগ্যভাবে, ক্রু উদ্ধার অভিযান ট্রাম্পকে কূটনৈতিক ও রাজনৈতিকভাবে শক্ত অবস্থানে ফিরিয়েছে। এটি তাকে অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিকভাবে আত্মবিশ্বাসী করতে সাহায্য করেছে। যদিও যুদ্ধ এখনও চলমান, ক্রু উদ্ধারের ঘটনা যুদ্ধের মোড় পরিবর্তনের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ চিহ্ন হিসেবে ধরা হচ্ছে।
আকাশজমিন / আরআর