অনলাইন রিপোর্টার
মধ্যপ্রাচ্যে চলমান উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল নাটকীয়ভাবে কমে গেছে। ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের আগ্রাসন শুরুর পর থেকে এই গুরুত্বপূর্ণ জলপথ দিয়ে জাহাজ চলাচল প্রায় ৯৪ শতাংশ কমে গেছে বলে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক তথ্যসূত্রে জানা গেছে। ফলে বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে বড় ধরনের অস্থিরতার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
হরমুজ প্রণালি বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথ। বৈশ্বিক তেলের চাহিদার প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এই প্রণালি দিয়ে পরিবহন করা হয়। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে এই জলপথ প্রায় অচল হয়ে পড়েছে বলে জানিয়েছে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা।
ইরানের তাসনিম নিউজ এজেন্সির এক প্রতিবেদনে লয়েড’স লিস্টসহ প্রধান বৈশ্বিক সামুদ্রিক তথ্য সংস্থাগুলোর তথ্য উল্লেখ করে বলা হয়েছে, ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ১৩৮টি জাহাজ এই প্রণালি দিয়ে চলাচল করত। কিন্তু সাম্প্রতিক পরিস্থিতিতে সেই সংখ্যা নাটকীয়ভাবে কমে গিয়ে ১০টিরও নিচে নেমে এসেছে।
আল জাজিরার বরাতে প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, বর্তমানে প্রায় ২ থেকে ৩ হাজার জাহাজ হরমুজ প্রণালির আশপাশে পার হওয়ার অপেক্ষায় আটকা পড়ে আছে। নিরাপত্তা ঝুঁকি ও বিধিনিষেধের কারণে এসব জাহাজ প্রণালি পার হতে পারছে না।
ইন্টারন্যাশনাল মেরিটাইম অর্গানাইজেশন জানিয়েছে, পারস্য উপসাগর অঞ্চলে প্রায় ৩ হাজার ২০০ জাহাজ আটকা পড়েছে। এর ফলে প্রায় ২০ হাজার নাবিক কার্যত কর্মহীন অবস্থায় পড়েছেন এবং দীর্ঘ সময় সমুদ্রে আটকে থাকার কারণে মানবিক উদ্বেগও বাড়ছে।
তাসনিম নিউজের তথ্যমতে, মার্চের শুরু থেকে এখন পর্যন্ত মাত্র ১৮১টি জাহাজ বা ট্যাংকার হরমুজ প্রণালি পার হতে সক্ষম হয়েছে। এর মধ্যে ১২৫টি জাহাজ ইরান বা তার মিত্রদের মালিকানাধীন। ফলে অন্য দেশের বেশিরভাগ জাহাজ এই জলপথ ব্যবহার করতে পারছে না।
তবে ইরান তাদের ঘনিষ্ঠ মিত্র ইরাককে এই বিধিনিষেধের বাইরে রেখেছে। এছাড়া চীন, ভারত, পাকিস্তান ও তুরস্ক ইরানের কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সরাসরি আলোচনা করে তাদের কিছু জাহাজ পার করতে সক্ষম হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত ১ মার্চ থেকে হরমুজ প্রণালি ও এর আশপাশের এলাকায় অন্তত ২৪টি বাণিজ্যিক জাহাজে হামলার ঘটনা ঘটেছে। এসব ঘটনায় অন্তত ৮ জন নিহত এবং ১০ জন আহত হয়েছেন বলে জানা গেছে।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের আগ্রাসন শুরুর কয়েক দিনের মধ্যেই ইরান হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচলে কঠোর বিধিনিষেধ আরোপ করে। তেহরান ঘোষণা দেয়, যারা হামলাকারীদের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট—তাদের কোনো জাহাজ এই জলপথ ব্যবহার করতে পারবে না।
এই পরিস্থিতির প্রভাব ইতোমধ্যে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে পড়তে শুরু করেছে। হরমুজ প্রণালি দিয়ে জ্বালানি সরবরাহ প্রায় বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বিশ্ববাজারে প্রতি ব্যারেল জ্বালানি তেলের দাম ১০০ ডলার ছাড়িয়ে গেছে।
এদিকে হরমুজ প্রণালি খুলে দিতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প গত কয়েক সপ্তাহে ইরানকে একাধিকবার আলটিমেটাম দিয়েছেন। তিনি সতর্ক করে বলেছেন, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে প্রণালি খুলে না দিলে ইরানের গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো লক্ষ্য করে হামলা চালানো হতে পারে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে রোববার ট্রাম্প ইরানের জন্য নতুন সময়সীমা নির্ধারণ করেন। সেখানে তিনি লিখেছেন, “মঙ্গলবার, পূর্ব উপকূলীয় সময় রাত ৮টা।” তেহরানের সময় অনুযায়ী যা বুধবার মধ্যরাত।
এর আগে ওয়াল স্ট্রিট জার্নালকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প বলেন, তার দেওয়া সময়সীমার মধ্যে ইরান কোনো পদক্ষেপ না নিলে দেশটির কোনো বিদ্যুৎকেন্দ্র বা সেতু অক্ষত থাকবে না।
ট্রাম্পের এই আলটিমেটাম নিয়ে রাশিয়া ও চীনসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশ উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। তারা উত্তেজনা কমাতে কূটনৈতিক সমাধানের ওপর জোর দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, হরমুজ প্রণালিতে এই অচলাবস্থা দীর্ঘস্থায়ী হলে তা শুধু জ্বালানি বাজার নয়, বরং বিশ্ব অর্থনীতিতেও বড় ধরনের চাপ তৈরি করতে পারে।
সূত্র: প্রেস টিভি