আন্তর্জাতিক ডেস্ক
ইউরোপের উন্নত জীবনের স্বপ্ন দেখতে গিয়ে আবারও মর্মান্তিক নৌকাডুবি ঘটেছে ভূমধ্যসাগরে। লিবিয়ার উপকূলে অভিবাসনপ্রত্যাশীদের একটি জরাজীর্ণ কাঠের নৌকা ডুবে অন্তত ৭০ জন নিখোঁজ হয়েছেন। শনিবারের এই ঘটনায় ৩২ জনকে জীবিত উদ্ধার করা সম্ভব হলেও দুইজনের মরদেহ পাওয়া গেছে।
ইতালীয় কোস্টগার্ডের প্রাথমিক তথ্যে জানা গেছে, উদ্ধারকৃতদের মধ্যে পাকিস্তান, বাংলাদেশ এবং মিসরের নাগরিক রয়েছেন। আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থা (আইওএম) ও জাতিসংঘের শরণার্থী বিষয়ক সংস্থা (ইউএনএইচসিআর) রোববার জানিয়েছে, উদ্ধারকৃত ৩২ জনের ভাষ্যমতে ওই নৌকায় ১০০ থেকে ১২০ জন আরোহী ছিলেন।
নৌকাটি গত শুক্রবার গভীর রাতে লিবিয়ার তাজউরা বন্দর থেকে অজানার উদ্দেশে রওনা দিয়েছিল। সমুদ্রের আবহাওয়া ছিল অত্যন্ত বৈরী; কয়েকফুট উঁচু ঢেউয়ের আঘাতে মাত্র কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই নৌকায় পানি ঢুকতে শুরু করে। লিবীয় জলসীমার ভেতরেই নৌকাটি নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে উল্টে যায়। জীবন বাঁচাতে অনেকেই সাগরের হিমশীতল পানিতে ঝাঁপ দেন।
জার্মান উদ্ধারকারী সংস্থা ‘সি-ওয়াচ’ জানায়, তাদের একটি পর্যবেক্ষণকারী বিমান শনিবার সাগরে উল্টানো নৌকার ওপর অন্তত ১৫ জনকে মরিয়া হয়ে আটকে থাকতে দেখেছে। ভিডিও ফুটেজে দেখা গেছে, উত্তাল ঢেউয়ের মধ্যে বেঁচে থাকার লড়াই চালানো মানুষগুলো সাহায্যের আশায় হাত বাড়াচ্ছিলেন, আশপাশে ভাসছিল নিথর দেহ।
ইতালীয় কোস্টগার্ডের মুখপাত্র রবার্তো ডি’অ্যারিগো জানান, লিবীয় কর্তৃপক্ষের তদারকিতে একটি ইতালীয় মালবাহী জাহাজ এবং একটি লাইবেরীয় বাণিজ্যিক জাহাজ দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে উদ্ধার অভিযান শুরু করেছে। উদ্ধারকৃত ৩২ জনই পুরুষ, যার মধ্যে একজন কিশোর রয়েছে। তাদের ইতালির দক্ষিণ প্রান্তের দ্বীপ ল্যাম্পেদুসায় নিয়ে আসা হয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে এই দ্বীপটি উত্তর আফ্রিকা থেকে আসা হাজার হাজার শরণার্থী ও অভিবাসনপ্রত্যাশীদের জন্য ইউরোপের প্রধান প্রবেশদ্বার হিসেবে পরিচিত।
ইউএনএইচসিআর-এর মুখপাত্র ফিলিপ্পো উঙ্গারো এই যাত্রাকে ‘আত্মঘাতী’ আখ্যা দিয়ে বলেন, “অভিবাসনপ্রত্যাশীরা এমন একটি হালকা ও জরাজীর্ণ নৌকায় ভূমধ্যসাগর পাড়ি দেওয়ার ঝুঁকি নিয়েছিল, যা উত্তাল সমুদ্রের জন্য মোটেও উপযুক্ত ছিল না।” নিখোঁজ ৭০ জনের সন্ধান এখনো চলছে, তবে সময় গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে বেঁচে থাকার আশা ক্ষীণ হয়ে আসছে।
যদি নিখোঁজদের সংখ্যা নিশ্চিত হয়, এটি ভূমধ্যসাগরের সাম্প্রতিক সময়ে অন্যতম বড় ট্র্যাজেডি হবে। সাবেক পোপ ফ্রান্সিস একবার ভূমধ্যসাগরকে ‘ইউরোপের বৃহত্তম কবরস্থান’ হিসেবে বর্ণনা করেছিলেন। তাঁর সেই উক্তির ভয়াবহতা এই ঘটনায় আবারও প্রমাণিত হলো। উল্লেখ্য, পোপ ফ্রান্সিস প্রয়াত হয়েছেন; তাঁর উত্তরসূরি পোপ লিও চতুর্দশ আগামী ৪ জুলাই ল্যাম্পেদুসা সফরের পরিকল্পনা করছেন।
আইওএম-এর ‘মিসিং মাইগ্রেন্টস প্রজেক্ট’-এর তথ্যমতে, ২০১৪ সাল থেকে এখন পর্যন্ত ৩৩,৪৫০ জনের বেশি মানুষ ভূমধ্যসাগরে প্রাণ হারিয়েছেন। অধিকাংশ মৃত্যু লিবিয়া থেকে ইতালি বা মাল্টা যাওয়ার পথে ঘটেছে।
ঘটনার পর মানবাধিকার ও উদ্ধারকারী সংস্থা ‘মেডিটেরানিয়া সেভিং হিউম্যানস’ ইউরোপীয় দেশগুলোর কঠোর সমালোচনা করেছে। তারা জানিয়েছে, “এই নৌকাডুবি কোনো দুর্ঘটনা নয়, বরং ইউরোপীয় নীতির সরাসরি ফল। নিরাপদ এবং আইনি প্রবেশের পথ বন্ধ থাকায় মানুষ নিরুপায় হয়ে মৃত্যুফাঁদ বেছে নিচ্ছে।”
চলতি বছরই কেবল কেন্দ্রীয় ভূমধ্যসাগরে অন্তত ৭২৫ জন নিখোঁজ হয়েছেন। গত সপ্তাহেও ল্যাম্পেদুসা থেকে ৮০ নটিক্যাল মাইল দূরে একটি ডিঙি নৌকা থেকে ১৯টি মৃতদেহ উদ্ধার করা হয়; তাদের মধ্যে অন্তত ১০ জন ছিলেন সুনামগঞ্জ জেলার।
বিশ্লেষকরা বলছেন, ইউরোপের অভিবাসন নীতি পরিবর্তন না করলে এই ধরনের মানবিক ট্র্যাজেডি চলতেই থাকবে। নিখোঁজদের উদ্ধারে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা জোরদার করতে হবে।
উদ্ধারকৃতরা ইতালি পৌঁছানোর পর স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবক ও মানবিক সংগঠন তাদের তাত্ক্ষণিক চিকিৎসা ও খাদ্য সরবরাহ করছে। ইতালি সরকারের কর্মকর্তারা জানিয়েছে, তারা দুর্ঘটনাগ্রস্ত এলাকার পর্যবেক্ষণ আরও বাড়াবে এবং ভবিষ্যতে অনিয়মিত নৌযাত্রা প্রতিরোধের পদক্ষেপ নেবে।
নিখোঁজদের পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা চলছে। আইওএম ও ইউএনএইচসিআর এই ধরনের বিপজ্জনক যাত্রাকে “অপ্রীতিকর বাস্তবতার প্রতিফলন” বলে উল্লেখ করেছে। তারা ইউরোপীয় দেশগুলোর কাছে নিরাপদ এবং আইনি অভিবাসনের ব্যবস্থা করার আহ্বান জানিয়েছে।