স্বপ্ন ছিল লিবিয়া হয়ে ইউরোপে পাড়ি দেওয়া, পরিবারকে আর্থিকভাবে সাহায্য করা। কিন্তু হবিগঞ্জের লুৎফুর রহমান ও জুনাইদ মিয়ার জন্য সেই স্বপ্ন হয়ে গেল মৃত্যুর পথে। ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে তারা হবিগঞ্জ সদর উপজেলার রিচি গ্রামের দালাল আবদুস সালামের মাধ্যমে ইতালির উদ্দেশ্যে লিবিয়ায় যান।
লুৎফুর রহমান (৪০) হবিগঞ্জ সদর উপজেলার সানাবই গ্রামের সিরাজুল ইসলামের ছেলে এবং জুনাইদ মিয়া (৪০) লাখাই উপজেলার সিংহগ্রামের বাসিন্দা। তারা ভায়রা ভাই। লিবিয়ার তোবরুক বন্দর থেকে ২১ মার্চ রাত ১০টায় ৪৩ জন যাত্রী নিয়ে গ্রিসের উদ্দেশ্যে একটি নৌকা রওনা দেয়। যাত্রীদের মধ্যে ৩৮ জনই সিলেট বিভাগের বাসিন্দা ছিলেন। নৌকার দুজন চালক ছিলেন সুদানি নাগরিক।
প্রথম দুই-তিন ঘণ্টায় সমুদ্রপথ পাড়ি দেওয়ার পরই চালক রাস্তা হারিয়ে ফেলেন। ছয় দিন ধরে সমুদ্রে ভাসতে থাকা যাত্রীদের মধ্যে খাবার ও পানির অভাব দেখা দেয়। প্রচণ্ড ক্ষুধা ও পানির অভাবে অনেকেই অসুস্থ হয়ে পড়েন। পানির সঙ্গে বিষাক্ত সমুদ্রের পানি পান করায় বমি শুরু হয় এবং মুখ দিয়ে রক্ত বের হতে থাকে। এর ফলে ১৭ জন মারা যান।
২৪ মার্চ লুৎফুর ও জুনাইদ মিয়া মারা যান। তাদের লাশ এক দিন নৌকায় রাখা হয়। আকমল মিয়া জানিয়েছেন, ‘আমরা লাশ সমুদ্রে ভাসাতে চাইনি। সীমান্তে নিরাপত্তারক্ষীদের কাছে পৌঁছে দেওয়ার চেষ্টা করেছি। কিন্তু দুর্গন্ধ ছড়িয়ে পড়ার কারণে ও চালকরা বিপদে পড়ার ভয়ে লাশগুলো সমুদ্রে ফেলে দেন।’
লুৎফুরের ছোট ভাই সাইফুল ইসলাম বলেন, ২১ মার্চ তার ভাই ফোন করে জানিয়েছিলেন, তারা গ্রিসের উদ্দেশ্যে রওনা দেবে। পরে কোনো খোঁজ মেলেনি। দুই দিন পর দালালের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে জানা যায়, তারা গ্রিসে পৌঁছেছেন—কিন্তু তা সত্যি ছিল না।
হবিগঞ্জের জেলা প্রশাসক ড. জি এম সরফরাজ বলেন, ‘আমি নতুন যোগদান করেছি। এমন ঘটনা শুনেছি, তবে এখনো বিষয়টি নিশ্চিত করতে যাচ্ছি। বিভিন্ন মাধ্যমে যোগাযোগ করে সত্যতা যাচাই করা হচ্ছে।’
এই ঘটনা আবারও প্রমাণ করলো, ভূমধ্যসাগরে অনুপ্রবেশের প্রচেষ্টা কতটা বিপজ্জনক। অভাব, দুর্বল নৌকা ও অনভিজ্ঞ চালকের কারণে জীবনহানি হচ্ছে। এই ধরনের মৃত্যু কেবল পরিবারকে নয়, পুরো সম্প্রদায়কে শোকাহত করছে।