আন্তর্জাতিক ডেস্ক
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সাম্প্রতিক যুদ্ধবিরতির ঘোষণার পর বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ হরমুজ প্রণালি খোলা নাকি এখনো বন্ধ—এ নিয়ে ভিন্ন ভিন্ন তথ্য পাওয়া যাচ্ছে। ফলে বিশ্ববাণিজ্য ও জ্বালানি বাজারে নতুন করে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
যুদ্ধ চলাকালে গত মার্চের শুরুর দিকে হরমুজ প্রণালি দিয়ে জ্বালানি ও পণ্যবাহী জাহাজ চলাচল পুরোপুরি বন্ধ করে দেয় ইরান। এর ফলে বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম দ্রুত বাড়তে শুরু করে এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে বড় ধরনের প্রভাব পড়ে।
গত বুধবার যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতির ঘোষণা আসার পর বিশ্ববাজারে কিছুটা স্বস্তি দেখা দেয়। অনেক বিশ্লেষক ধারণা করেছিলেন, যুদ্ধবিরতির অংশ হিসেবে হরমুজ প্রণালি আবার খুলে দেওয়া হতে পারে এবং জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক হবে। এতে জ্বালানির দামও কমতে পারে বলে আশা করা হচ্ছিল।
তবে বাস্তবে পরিস্থিতি কতটা স্বাভাবিক হয়েছে, তা নিয়ে এখনো স্পষ্ট ধারণা পাওয়া যাচ্ছে না। হরমুজ প্রণালি দিয়ে বর্তমানে ঠিক কত জাহাজ চলাচল করছে, সে বিষয়েও নির্ভরযোগ্য তথ্য পাওয়া যাচ্ছে না।
কারণ, ইরানঘেঁষা এই সংকীর্ণ সমুদ্রপথের ঠিক কতটা অংশ জাহাজ চলাচলের জন্য উন্মুক্ত রয়েছে, তা নিয়ে পরস্পরবিরোধী তথ্য সামনে আসছে।
ইরানের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হয়েছে এবং এতে ইসরায়েলও সমর্থন দিয়েছে। তবে তেহরানের দাবি, ইসরায়েল ইরানে হামলা বন্ধ রাখলেও লেবাননে তাদের সামরিক অভিযান অব্যাহত রয়েছে।
ইরানের মতে, লেবাননে হামলা চালিয়ে গেলে যুদ্ধবিরতি পুরোপুরি কার্যকর হতে পারে না। তাই লেবাননে মিত্রদের ওপর ইসরায়েলি হামলা অব্যাহত থাকায় ইরান এখনো হরমুজ প্রণালি পুরোপুরি খুলে দেয়নি।
বিবিসি জানিয়েছে, দুটি ইরানি সংবাদমাধ্যম জাহাজ চলাচল পর্যবেক্ষণকারী একটি ওয়েবসাইটের তথ্য উল্লেখ করেছে। সেই তথ্যে বলা হয়েছে, পানামার পতাকাবাহী একটি জাহাজ হরমুজ প্রণালির খুব কাছাকাছি পৌঁছেও আবার ফিরে গেছে।
এ ঘটনায় প্রকাশিত ছবির ক্যাপশনে লেখা ছিল, “হরমুজ প্রণালি পুরোপুরি বন্ধ রয়েছে। তেলবাহী ট্যাংকারগুলো ফিরে যেতে বাধ্য হচ্ছে।”
তবে এ বিষয়ে ভিন্ন দাবি করেছে যুক্তরাষ্ট্র। হোয়াইট হাউসের প্রেস সেক্রেটারি ক্যারোলাইন লেভিট সাংবাদিকদের ব্রিফিংয়ে বলেন, হরমুজ প্রণালি বন্ধ থাকার খবরটি সঠিক নয়। বরং ওই নৌপথ দিয়ে জাহাজ চলাচলের সংখ্যা বাড়ছে বলে দাবি করেন তিনি।
ক্যারোলাইন লেভিট আরও বলেন, হরমুজ প্রণালি বন্ধ থাকার বিষয়ে যে প্রতিবেদনগুলো প্রকাশিত হয়েছে, সেগুলো ‘অগ্রহণযোগ্য’ এবং বিভ্রান্তিকর। এ বিষয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প অবগত আছেন বলেও তিনি জানান।
এদিকে বাণিজ্যিক জাহাজবিষয়ক সেবাদাতা প্রতিষ্ঠান এসএসওয়াই জানিয়েছে, উপসাগরীয় অঞ্চলে অবস্থান করা জাহাজগুলো ইরানের বিপ্লবী গার্ড কোরের (আইআরজিসি) কাছ থেকে একটি বার্তা পেয়েছে। সেই বার্তায় বলা হয়েছে, হরমুজ প্রণালি এখনো বন্ধ রয়েছে এবং এটি পার হতে হলে আইআরজিসির অনুমতি নিতে হবে।
বার্তায় আরও বলা হয়েছে, অনুমতি ছাড়া কোনো জাহাজ প্রণালিতে প্রবেশ করার চেষ্টা করলে সেটিকে ধ্বংস করে দেওয়া হতে পারে।
এদিকে বার্তা সংস্থা এএফপি জানিয়েছে, হরমুজ প্রণালি দিয়ে চলাচলকারী জাহাজগুলোর জন্য বৃহস্পতিবার একটি বিকল্প রুট ঘোষণা করেছে আইআরজিসি। মূল সমুদ্রপথে থাকা মাইন এড়িয়ে নিরাপদে চলাচলের জন্য এই নতুন পথ নির্ধারণ করা হয়েছে।
আইআরজিসির বিবৃতিতে বলা হয়েছে, সামুদ্রিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এবং সমুদ্র মাইনের ঝুঁকি এড়াতে জাহাজগুলোকে বিকল্প রুট ব্যবহার করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
উল্লেখ্য, বিশ্বের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ জ্বালানি তেল হরমুজ প্রণালি দিয়ে পরিবহন করা হয়। তাই এই নৌপথ বন্ধ হয়ে গেলে বিশ্ববাণিজ্য ও জ্বালানি বাজারে বড় ধরনের প্রভাব পড়ে।
বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সম্ভাব্য শান্তি আলোচনার প্রস্তুতি চলছে। পাকিস্তানের ইসলামাবাদে দুই দেশের প্রতিনিধিদের মধ্যে আলোচনা হওয়ার কথা রয়েছে।
তথ্যসূত্র: বিবিসি, এএফপি