তেহরান–ওয়াশিংটন যুদ্ধবিরতির কার্যকরের মাত্র ২৪ ঘণ্টা পার হওয়ার আগেই লেবাননে ভয়ংকর হামলা চালিয়েছে ইসরায়েল। বুধবার (৮ এপ্রিল) ইসরায়েলি বিমান ও স্থল বাহিনীর অভিযানে দেশটির রাজধানী বৈরুত ও অন্যান্য অঞ্চলে কমপক্ষে ২৫৪ জন প্রাণ হারিয়েছেন। আহত হয়েছেন ১ হাজার ১০০ জনেরও বেশি মানুষ। হতাহতের সংখ্যা আরও বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
ইসরায়েলের কর্মকর্তারা জানিয়েছে, তারা মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের প্রশাসনের সঙ্গে বোঝাপড়া করেই এই হামলা চালিয়েছে। এতে আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক আলোচনা ও তেহরান–ওয়াশিংটন যুদ্ধবিরতি চুক্তির ওপর বিরাট চাপ সৃষ্টি হয়েছে।
টানা ৩৮ দিনের সংঘাতের পর গত মঙ্গলবার (৭ এপ্রিল) ১৫ দিনের অস্থায়ী যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হয়েছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান। এই যুদ্ধবিরতিকে স্থায়ীভাবে বাস্তবায়নের লক্ষ্যে চলমান কূটনৈতিক প্রচেষ্টা চলাকালীনই বুধবার লেবাননে একযোগে শতাধিক বিমান হামলা পরিচালনা করে ইসরায়েলি বিমান বাহিনী।
ইসরায়েলের প্রতিরক্ষা বাহিনী (আইডিএফ) জানিয়েছে, এ অভিযানে অংশ নিয়েছে ৫০টি যুদ্ধবিমান। মাত্র ১০ মিনিটে লেবাননের বিভিন্ন এলাকায় ১০০ বারের বেশি বোমা ফেলা হয়েছে। অধিকাংশ বোমা ফেলা হয়েছে ঘনবসতিপূর্ণ আবাসিক এলাকায়। এতে ব্যাপক ধ্বংস এবং প্রাণহানির মাত্রা ছিল অত্যন্ত উচ্চ।
বার্তাসংস্থা এএফপির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কম সময়ে এত সংখ্যক হতাহত ও তাদের স্বজনদের সামলাতে রীতিমতো হিমশিম খাচ্ছে বৈরুত ও লেবাননের অন্যান্য শহর-গ্রামের হাসপাতাল। ধ্বংসস্তূপে আটকা পড়াদের উদ্ধারে বেগ পেতে হচ্ছে উদ্ধারকারী বাহিনীকে।
ইরানের সমর্থন ও মদতপুষ্ট হিজবুল্লাহ, যা লেবাননভিত্তিক সবচেয়ে বড় সশস্ত্র ইসলামি গোষ্ঠী, ইসরায়েলের প্রধান শত্রু। হিজবুল্লাহকে দমন করতে ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বর থেকে সামরিক অভিযান শুরু করে ইসরায়েল। পরে ২০২৫ সালের অক্টোবরে আন্তর্জাতিক চাপের মুখে লেবাননের সঙ্গে যুদ্ধবিরতি চুক্তি হয়।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে হামলা চালিয়ে মার্কিন ও ইসরায়েলি বাহিনী হত্যা করেছে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনিকে। প্রথম ধাক্কার প্রতিক্রিয়ায় ইরানও তৎপর হয়েছে। যুদ্ধ শুরুর তিনদিনের মধ্যে অর্থাৎ ২ মার্চ থেকে লেবাননেও অভিযান শুরু হয়। মার্চের মাঝামাঝি বিমান অভিযানের সঙ্গে যুক্ত হয় স্থল অভিযান।
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যুদ্ধবিরতি আলোচনায় লেবাননকে অন্তর্ভুক্ত করতে চাইছে ইরান। এ অবস্থায় বুধবার লেবাননে হামলা চালানোতে তেহরান চরমভাবে ক্ষুব্ধ হয়েছে। লেবাননে হামলা অব্যাহত থাকলে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যুদ্ধবিরতি থেকে বেরিয়ে যাওয়ার হুমকিও দিয়েছে তারা।
ইসরায়েলি হামলার তীব্র নিন্দা জানিয়েছে আন্তর্জাতিক মানবিক সংস্থা রেডক্রস সোসাইটি। বৈরুতসহ লেবাননের আবাসিক এলাকায় পূর্ব সতর্কতা ছাড়া ভারী বিস্ফোরক ব্যবহারের জন্য ইসরায়েলকে ‘গণহত্যা’ হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়েছে।
জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক হাইকমিশনার ভলকার টার্ক বলেছেন, হত্যাকাণ্ড ও ধ্বংসযজ্ঞের মাত্রা সত্যিই ভয়াবহ। ইরানের সঙ্গে যুদ্ধবিরতির কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই এমন রক্তপাত ভোলা যায় না। এটি শান্তি প্রক্রিয়ার ওপর গুরুতর চাপ সৃষ্টি করছে এবং সাধারণ মানুষের জন্য অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ।
তিনি আরও সতর্ক করে বলেছেন, হামলার ব্যাপকতা এবং ইসরায়েলি কর্মকর্তাদের কিছু বক্তব্য (দক্ষিণ লেবাননের অংশ দখল বা সংযুক্ত করার ইঙ্গিত) গভীর উদ্বেগজনক।