আন্তর্জাতিক ডেস্ক
যুক্তরাষ্ট্রে মার্চ মাসে মূল্যস্ফীতি গত প্রায় দুই বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে। যুক্তরাষ্ট্রের শ্রম দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, মার্চে ভোক্তা মূল্যসূচক বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩ দশমিক ৩ শতাংশে, যা ফেব্রুয়ারিতে ছিল ২ দশমিক ৪ শতাংশ। অর্থনীতিবিদদের মতে, সাম্প্রতিক যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে জ্বালানির দাম বেড়ে যাওয়াই এই বৃদ্ধির প্রধান কারণ।
বিশ্লেষকদের ধারণা, যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল ও ইরানের মধ্যে চলমান সংঘাত বিশ্বব্যাপী জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থায় চাপ তৈরি করেছে। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালি দিয়ে তেল ও গ্যাস পরিবহনে অনিশ্চয়তা সৃষ্টি হওয়ায় আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম দ্রুত বৃদ্ধি পায়, যার প্রভাব সরাসরি যুক্তরাষ্ট্রের ভোক্তা বাজারে পড়ে।
মার্চ মাসে গ্যাসোলিনের দাম ফেব্রুয়ারির তুলনায় ২১ দশমিক ২ শতাংশ বেড়েছে, যা ১৯৬৭ সাল থেকে রেকর্ড রাখা শুরু হওয়ার পর সর্বোচ্চ মাসিক বৃদ্ধি। একই সময়ে ভারী জ্বালানি তেলের দাম ৩০ শতাংশেরও বেশি বেড়েছে, যা ২০০০ সালের পর সর্বোচ্চ।
ক্যালিফোর্নিয়ার মতো অঙ্গরাজ্যে এই প্রভাব আরও তীব্র। সেখানে প্রতি গ্যালন গ্যাসের গড় দাম দাঁড়িয়েছে ৫ দশমিক ৯৩ ডলারে, যেখানে জাতীয় গড় ৪ দশমিক ১৬ ডলার। ফলে সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন যাতায়াত ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে গেছে।
একজন তরুণ ট্রাকচালক জানান, আগে যেখানে ট্যাংক পূর্ণ করতে ৫০–৬০ ডলার লাগত, এখন সেখানে ৭০–৮০ ডলার ব্যয় হচ্ছে। অনেকেই খরচ কমাতে গাড়ি কম চালানোর চেষ্টা করছেন, তবে জীবিকার প্রয়োজনে বাড়তি ব্যয় মেনে নিতে বাধ্য হচ্ছেন।
অর্থনীতিবিদদের মতে, ফেব্রুয়ারি থেকে মার্চের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রে মূল্যস্ফীতি বৃদ্ধির প্রায় তিন-চতুর্থাংশই এসেছে জ্বালানির দাম বাড়ার কারণে। পাশাপাশি বিমানভাড়া ও পোশাকের দামও বেড়েছে, যা উচ্চ জ্বালানি খরচ ও সরবরাহ ব্যয়ের সঙ্গে সম্পর্কিত।
খাদ্যপণ্যের দাম আপাতত স্থিতিশীল থাকলেও বিশ্লেষকেরা সতর্ক করেছেন, পরিবহন ব্যয় ও সার উৎপাদন খরচ বাড়লে ভবিষ্যতে খাদ্যপণ্যের দামও বাড়তে পারে। ব্যবসায়িক বিশ্লেষকদের মতে, এটি মূলত “জ্বালানিনির্ভর মূল্যস্ফীতি”, যা ধীরে ধীরে পুরো অর্থনীতিতে ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি তৈরি করছে।
হরমুজ প্রণালি শুধু তেল নয়, প্রাকৃতিক গ্যাস, সার, অ্যালুমিনিয়াম ও হিলিয়াম পরিবহনের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ পথ। সাম্প্রতিক উত্তেজনার কারণে এই রুটে সরবরাহ ব্যাহত হওয়ায় বৈশ্বিক বাজারে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। যদিও যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে আলোচনায় প্রণালি পরিস্থিতি স্বাভাবিক করার ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে, তবে স্বাভাবিক সরবরাহ ফিরতে সময় লাগবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
এদিকে তেলের দাম কিছুটা কমলেও যুদ্ধ শুরুর আগের তুলনায় তা এখনো প্রায় ৩০ শতাংশ বেশি রয়েছে। এই পরিস্থিতির প্রভাব যুক্তরাষ্ট্রের ভোক্তা আস্থাতেও পড়েছে। সাম্প্রতিক জরিপে দেখা গেছে, ভোক্তা আস্থা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে, যা ভবিষ্যৎ অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির জন্য উদ্বেগ তৈরি করছে।
ভোক্তাদের অনেকে জানিয়েছেন, জ্বালানির দাম বৃদ্ধির কারণে তাদের মাসিক ব্যয় অনেক বেড়ে গেছে। কেউ কেউ আগের তুলনায় দ্বিগুণ খরচে গাড়িতে জ্বালানি নিচ্ছেন। এতে সাধারণ মানুষের মধ্যে প্রশ্ন উঠছে, এই যুদ্ধ পরিস্থিতির অর্থনৈতিক প্রয়োজনীয়তা কতটা যৌক্তিক।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রশাসন অবশ্য বলছে, মূল্যস্ফীতির এই বৃদ্ধি সাময়িক। তাদের দাবি, জ্বালানি উৎপাদন বৃদ্ধি, কর ছাড় এবং নিয়ন্ত্রণ শিথিলের নীতির কারণে অর্থনীতি এখনও স্থিতিশীল রয়েছে। তবে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নীতিনির্ধারকদের মতে, মূল্যস্ফীতির চাপ বিবেচনায় নিয়ে সুদের হার কমানোর সিদ্ধান্ত আরও বিলম্বিত হতে পারে।
বিশ্লেষকেরা মনে করছেন, পরিস্থিতি আপাতত নিয়ন্ত্রণে থাকলেও জ্বালানি বাজারের অস্থিরতা দীর্ঘমেয়াদে বৈশ্বিক অর্থনীতির জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে পারে।