কক্সবাজার প্রতিনিধি
গ্যাস সংকট ও জ্বালানির উচ্চমূল্যকে পুঁজি করে কক্সবাজারের উখিয়া ও টেকনাফের রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোতে আবারও বন নিধনের প্রবণতা বেড়েছে। প্রায় প্রতিদিনই বিভিন্ন ক্যাম্পের রোহিঙ্গারা সংরক্ষিত বনাঞ্চলে গিয়ে জ্বালানি কাঠ সংগ্রহ করছে। এতে বনভূমি ক্রমেই উজাড় হয়ে যাচ্ছে এবং পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
কক্সবাজারের উখিয়া ও টেকনাফে বর্তমানে প্রায় ১৪ লাখ রোহিঙ্গা বসবাস করছে। ২০১৭ সালের রোহিঙ্গা ঢলের পর জ্বালানির চাহিদা মেটাতে ব্যাপকভাবে বন উজাড়ের ঘটনা ঘটে। পরে বন সংরক্ষণের অংশ হিসেবে ক্যাম্পগুলোতে গ্যাস সিলিন্ডার বিতরণের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। এতে কিছুটা স্বস্তি ফিরলেও বর্তমানে গ্যাস সরবরাহ কমে যাওয়ায় আবারও কাঠের ওপর নির্ভরতা বেড়েছে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, বর্তমানে যে গ্যাস সিলিন্ডার দেওয়া হচ্ছে, তা ৪৫ দিনের জন্য বরাদ্দ থাকলেও অনেক ক্ষেত্রে তা ১৫ থেকে ২০ দিনের মধ্যেই শেষ হয়ে যাচ্ছে। উখিয়া-টেকনাফ এলাকার স্থানীয় বাজারে একটি ১২ কেজি সিলিন্ডারের দাম ২ হাজার ২০০ টাকার বেশি, যা অধিকাংশ রোহিঙ্গার পক্ষে কেনা সম্ভব নয়। পাশাপাশি খাদ্যসহায়তাও কমে যাওয়ায় জীবনযাত্রার চাপ আরও বেড়েছে।
বালুখালী ক্যাম্পের বাসিন্দা আবুল আলী জানান, প্রতিটি পরিবারে দৈনিক প্রায় ৫ কেজি জ্বালানি কাঠ প্রয়োজন হয়। সেই হিসাবে ২০ দিনের জন্য প্রায় ১০০ কেজি কাঠ দরকার পড়ে। বর্তমানে উখিয়া ও টেকনাফের ৩৩টি ক্যাম্পে প্রায় ২ লাখ ৪৫ হাজার পরিবারের জন্য মাসে বিপুল পরিমাণ জ্বালানি কাঠের চাহিদা তৈরি হচ্ছে, যার পুরোটাই সংগ্রহ করা হচ্ছে সংরক্ষিত বনাঞ্চল থেকে।
কক্সবাজার দক্ষিণ বন বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা (ডিএফও) আবদুল্লাহ আল মামুন বলেন, গ্যাস সংকটের কারণে রোহিঙ্গারা আবারও বনাঞ্চল থেকে গাছ কেটে জ্বালানি সংগ্রহ করছে। তিনি জানান, ২০১৭ সালের আগে উখিয়া-টেকনাফে প্রায় ১০ হাজার একর বনায়ন করা হয়েছিল, যা রোহিঙ্গা আশ্রয় প্রক্রিয়ায় ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। পরে আরও ৭ হাজার একর এলাকায় বনায়ন করা হলেও বর্তমানে তা নতুন করে হুমকির মুখে পড়েছে।
শরণার্থী, ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার (আরআরআরসি) ও অতিরিক্ত সচিব মোহাম্মদ মিজানুর রহমান বলেন, তহবিল সংকটের কারণে আগে মাসিকভাবে যে গ্যাস সিলিন্ডার সরবরাহ করা হতো, এখন তা ৪৫ দিনের ব্যবধানে দিতে হচ্ছে। এতে ১০ থেকে ১৫ দিনের ঘাটতি তৈরি হচ্ছে, যা পূরণে অনেক রোহিঙ্গা বন থেকে কাঠ সংগ্রহ করছে।
সূত্র জানায়, ২০১৮ সালে নিরাপদ জ্বালানি নিশ্চিত করতে ক্যাম্প এলাকায় ‘সেফ প্লাস’ কর্মসূচির আওতায় এলপিজি বিতরণ শুরু হয়, যা বর্তমানে ‘সেফ প্লাস-টু’ নামে পরিচালিত হচ্ছে। জাতিসংঘের শরণার্থীবিষয়ক সংস্থা ইউএনএইচসিআর এবং আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থা (আইওএম) যৌথভাবে এই কর্মসূচি পরিচালনা করছে। এই উদ্যোগের ফলে বন উজাড় ও অগ্নিকাণ্ডের ঝুঁকি কিছুটা কমেছিল।
তবে বন বিভাগের কর্মকর্তারা সতর্ক করে বলেছেন, বর্তমান পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে উখিয়া-টেকনাফের সংরক্ষিত বনাঞ্চল মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। ২০১৭-১৮ সালে ক্যাম্প স্থাপনের সময় হাজার হাজার একর বন ধ্বংস হয়েছিল, যার ফলে পাহাড় ধস, হাতির বিচরণক্ষেত্র সংকুচিত হওয়া এবং প্রাণহানির ঘটনাও ঘটে।
পরিবেশবিদদের মতে, জ্বালানি সংকট, তহবিল ঘাটতি এবং বিকল্প ব্যবস্থার অভাবে এই সংকট দ্রুত সমাধান না হলে পুরো এলাকার পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য ভয়াবহ ঝুঁকির মুখে পড়বে।