আন্তর্জাতিক ডেস্ক
ইসলামাবাদে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে বহুল আলোচিত শান্তি আলোচনা শুরু হতে যাচ্ছে এমন এক সময়ে, যখন মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে যুদ্ধ, জ্বালানি সংকট ও ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা চরমে পৌঁছেছে। এই বৈঠককে ঘিরে যেমন আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক মহলে প্রবল আগ্রহ তৈরি হয়েছে, তেমনি একই সঙ্গে তৈরি হয়েছে গভীর অনিশ্চয়তা ও উদ্বেগও। কারণ এই আলোচনার ফলাফল শুধু দুই দেশের সম্পর্ক নয়, বরং পুরো বৈশ্বিক নিরাপত্তা ও অর্থনীতির ভবিষ্যৎকেও প্রভাবিত করতে পারে বলে বিশ্লেষকদের ধারণা।
পাকিস্তানের রাজধানী ইসলামাবাদ এখন কার্যত এক কঠোর নিঠোর নিরাপত্তা বলয়ে আবদ্ধ শহর। রাস্তাঘাটে নজরদারি জোরদার করা হয়েছে, গুরুত্বপূর্ণ এলাকা রেড জোনে প্রবেশ সম্পূর্ণভাবে সীমিত করা হয়েছে এবং শহরের বিভিন্ন প্রবেশপথে কড়া তল্লাশি চলছে। ইতোমধ্যে ইরানি প্রতিনিধি দল ইসলামাবাদে পৌঁছেছে এবং মার্কিন প্রতিনিধি দলও সেখানে পৌঁছানোর পথে রয়েছে। দুই পক্ষকে ঘিরে পাকিস্তান সরকার সর্বোচ্চ সতর্কতা জারি করেছে। আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমও এই বৈঠককেরাপত্তা বলয়ে আবদ্ধ শহর। রাস্তাঘাটে নজরদারি জোরদার করা হয়েছে, গুরুত্বপূর্ণ এলাকা রেড জোনে প্রবেশ সম্পূর্ণভাবে সীমিত করা হয়েছে এবং শহরের বিভিন্ন প্রবেশপথে কড়া তল্লাশি চলছে। ইতোমধ্যে ইরানি প্রতিনিধি দল ইসলামাবাদে পৌঁছেছে এবং মার্কিন প্রতিনিধি দলও সেখানে পৌঁছানোর পথে রয়েছে। দুই পক্ষকে ঘিরে পাকিস্তান সরকার সর্বোচ্চ সতর্কতা জারি করেছে। আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমও এই বৈঠককে কেন্দ্র করে ব্যাপক প্রস্তুতি নিয়েছে, কারণ এটি হতে যাচ্ছে সাম্প্রতিক সময়ের সবচেয়ে সংবেদনশীল কূটনৈতিক উদ্যোগগুলোর একটি।
এই সংকটের পটভূমি শুরু হয় প্রায় ছয় সপ্তাহ আগে, যখন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যৌথভাবে ইরানে সামরিক অভিযান শুরু করে। ওই হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির নিহত হওয়ার খবর আন্তর্জাতিকভাবে ব্যাপক আলোড়ন তোলে এবং মধ্যপ্রাচ্যে পূর্ণমাত্রার যুদ্ধ পরিস্থিতি তৈরি হয়। এরপর একাধিক দেশ এতে জড়িয়ে পড়ে এবং সহিংসতা ছড়িয়ে যায় বিস্তৃত অঞ্চলে। এই সংঘাতে হাজার হাজার মানুষের প্রাণহানি ঘটে এবং বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পথ হরমুজ প্রণালি কার্যত অচল হয়ে পড়ে। এর ফলে বিশ্ববাজারে তেলের দাম দ্রুত বেড়ে যায় এবং অর্থনৈতিক অস্থিরতা ছড়িয়ে পড়ে।
এই অস্থির পরিস্থিতির মধ্যেই পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হয়। তবে সেই যুদ্ধবিরতি টেকসই হয়নি, কারণ উভয় পক্ষই শর্ত ও ব্যাখ্যা নিয়ে একে অপরের বিরুদ্ধে অবস্থান নেয়। একই সময়ে লেবাননে ইসরায়েলের নতুন করে বোমা হামলা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে। ফলে শান্তি প্রক্রিয়া শুরুর আগেই তা আবার নতুন চাপের মুখে পড়ে।
ইরান যুদ্ধ শুরুর পর কৌশলগতভাবে হরমুজ প্রণালি আংশিকভাবে নিয়ন্ত্রণে নেয়, যা দিয়ে বিশ্বের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ তেল ও গ্যাস পরিবহন হয়। এই সিদ্ধান্ত বিশ্ববাজারে সরাসরি প্রভাব ফেলে এবং জ্বালানির দাম রেকর্ড পর্যায়ে পৌঁছে যায়। বর্তমানে ইরান কেবল সেইসব দেশের জাহাজ চলাচলের অনুমতি দিচ্ছে, যাদের সঙ্গে তাদের আলাদা চুক্তি রয়েছে। এতে আন্তর্জাতিক সরবরাহ ব্যবস্থায় বড় ধরনের সংকট তৈরি হয়েছে।
ইসলামাবাদে অনুষ্ঠিতব্য এই আলোচনার সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো—এটি আদৌ কোনো স্থায়ী সমাধান আনতে পারবে কি না। পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ এই উদ্যোগের মধ্যস্থতাকারী হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছেন। ধারণা করা হচ্ছে, তিনি দুই পক্ষের সঙ্গে পৃথকভাবে প্রাথমিক আলোচনা করবেন। আলোচনায় পাকিস্তানের ভূমিকা কেবল মধ্যস্থতা নয়, বরং “শাটল ডিপ্লোমেসি” বা এক পক্ষের বার্তা অন্য পক্ষের কাছে পৌঁছে দেওয়ার মাধ্যম হিসেবেও কাজ করবে।
মার্কিন প্রতিনিধি দলের নেতৃত্ব দিচ্ছেন ভাইস প্রেসিডেন্ট জে ডি ভ্যান্স। তাঁর সঙ্গে রয়েছেন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ এবং ট্রাম্পের জামাতা জ্যারেড কুশনার। অন্যদিকে ইরানের প্রতিনিধি দলের নেতৃত্ব দিচ্ছেন পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ এবং পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি। ইরানের পক্ষ থেকে আরও কয়েকজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা উপস্থিত থাকলেও ইসলামিক রেভোল্যুশনারি গার্ড কোর (আইআরজিসি)-এর প্রতিনিধি থাকবেন কি না তা এখনো নিশ্চিত নয়।
আলোচনার অন্যতম কেন্দ্রীয় বিষয় হলো ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি, বিশেষ করে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ। যুক্তরাষ্ট্র দাবি করছে, ইরানকে তাদের ইউরেনিয়াম মজুত কমাতে বা সীমিত করতে হবে, যা তারা “অপরিবর্তনযোগ্য শর্ত” হিসেবে উল্লেখ করেছে। অন্যদিকে ইরান বলছে, তারা নিরাপত্তা ও সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে কোনো ধরনের একতরফা চাপ মেনে নেবে না। ফলে দুই পক্ষের অবস্থান এখনো অনেক দূরে অবস্থান করছে।
এর পাশাপাশি আরও কয়েকটি বড় ইস্যু আলোচনায় রয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ, মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন সামরিক উপস্থিতি হ্রাস, এবং ইরানের মিত্র সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান বন্ধের দাবি। ইরান তাদের ১০ দফা প্রস্তাবে এই বিষয়গুলো স্পষ্টভাবে তুলে ধরেছে। যুক্তরাষ্ট্র যদিও আনুষ্ঠানিকভাবে সব শর্ত মেনে নেয়নি, তবে কিছু ক্ষেত্রে নমনীয় অবস্থান দেখানোর ইঙ্গিত দিয়েছে।
এই আলোচনায় আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো লেবাননের পরিস্থিতি। সাম্প্রতিক ইসরায়েলি হামলায় সেখানে ব্যাপক প্রাণহানির পর ইরান কড়া প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে এবং বলেছে, হামলা অব্যাহত থাকলে তারা যুদ্ধবিরতি চুক্তি থেকে সরে আসতে পারে। এই ইস্যুটি এখন আলোচনার অন্যতম প্রধান জটিলতা হিসেবে দেখা হচ্ছে।
আলোচনার পরিবেশ অত্যন্ত স্পর্শকাতর হলেও কিছু পর্যবেক্ষক মনে করছেন, দুই পক্ষই দীর্ঘ যুদ্ধ থেকে ক্লান্ত এবং অন্তত সাময়িক বিরতির জন্য একটি সমঝোতায় পৌঁছানোর চেষ্টা করতে পারে। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালি ও ইউরেনিয়াম ইস্যুতে সীমিত একটি সমঝোতা হওয়ার সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না। তবে বিশ্লেষকরা একমত যে, গভীর অবিশ্বাস এবং রাজনৈতিক চাপের কারণে পূর্ণাঙ্গ শান্তিচুক্তি এখনই সম্ভব নয়।
পাকিস্তানের ভূমিকা এই পুরো প্রক্রিয়ায় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র উভয়ের সঙ্গেই তাদের কূটনৈতিক সম্পর্ক তুলনামূলকভাবে ভালো অবস্থায় রয়েছে। পাকিস্তানের ভৌগোলিক অবস্থান, সীমান্ত সংযোগ এবং আঞ্চলিক প্রভাব এই আলোচনাকে একটি নিরপেক্ষ প্ল্যাটফর্ম দিয়েছে। পাশাপাশি মুসলিম বিশ্বে তাদের অবস্থানও এই মধ্যস্থতাকে গ্রহণযোগ্যতা দিয়েছে।
তবে এই বৈঠকের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো ইসরায়েলের ভূমিকা। ইসরায়েল এই আলোচনায় সরাসরি অংশ না থাকলেও যুদ্ধ পরিস্থিতির অন্যতম প্রধান অংশীদার হওয়ায় তাদের অবস্থান পুরো প্রক্রিয়াকে প্রভাবিত করছে। বিশেষ করে লেবাননে চলমান হামলা শান্তি আলোচনার ওপর নতুন চাপ তৈরি করেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, এই আলোচনার সবচেয়ে বাস্তবসম্মত ফল হতে পারে একটি আংশিক সমঝোতা বা অস্থায়ী যুদ্ধবিরতি, যেখানে বড় ইস্যুগুলো পরবর্তী ধাপে সমাধানের জন্য রাখা হবে। তবে স্থায়ী শান্তি অর্জন করতে হলে আঞ্চলিক শক্তিগুলোর সমন্বিত ভূমিকা এবং পারস্পরিক আস্থা তৈরি করা জরুরি, যা বর্তমানে অনুপস্থিত।
সব মিলিয়ে ইসলামাবাদের এই বৈঠক এখন শুধু একটি কূটনৈতিক আলোচনা নয়, বরং এটি হয়ে উঠেছে বৈশ্বিক শক্তির ভারসাম্য, মধ্যপ্রাচ্যের ভবিষ্যৎ এবং বিশ্ব অর্থনীতির স্থিতিশীলতার একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা।